দিকপাল

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জনস্বস্তি নিশ্চিত করতে হবে


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬ | ০৮:১৩ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জনস্বস্তি নিশ্চিত করতে হবে

টানা ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি, দেশের আর্থিক খাতের চরম নাজুক দশা এবং বৈশ্বিক নানা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনীতিকে টেনে তোলা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় পর একটি প্রকৃত নির্বাচিত সরকারের হাত ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু হওয়ায় এই মুহূর্তে প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার পারদ আকাশচুম্বী। এই অবস্থায় সরকারি রাজস্বের পরিধি বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তরুণদের জন্য বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমানের এই কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতগুলো নিরাময় করতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে; আর এই দুইয়ের মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখেই আগামী দিনের বাজেট প্রণয়ন করা আবশ্যক।

রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে প্রথম আলোর বিশেষ উদ্যোগে আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক নীতি নির্ধারণী গোলটেবিল বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা এই সব গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী নিজের অনড় অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, বিগত দিনে দেশের অর্থনীতি গুটিকয়েক সুবিধাভোগী বা অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল এবং সেখানে একটি বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। বর্তমান সরকার সেই বৃত্ত থেকে বের হয়ে এসে এমন একটি জনবান্ধব অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যার সুফল দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিক ভোগ করতে পারবেন। সরকার এমন সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ করবে যা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।

উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধান অন্তরায় হলো নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়া, যার ফলে প্রকল্পের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে এখন থেকে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। একই সাথে আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশের সব ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নিয়মকানুন সহজীকরণ করা হবে। ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমিয়ে আনা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও হয়রানি চিরতরে বন্ধ করতে সরকার অত্যন্ত কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছে।

বৈঠকে রেস্তোরাঁ খাতের এক শীর্ষ ব্যবসায়ীর ভোগান্তির কথা টেনে অর্থমন্ত্রী আশ্বাস দেন যে, ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তেরোটি ভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন যেন একটি মাত্র নির্দিষ্ট স্থান বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার থেকে পাওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা হবে। পাশাপাশি, কর আদায়ের নামে রেস্তোরাঁ মালিকরা যাতে কোনো ধরনের অসাধু কর্মকর্তাদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য করের একটি যৌক্তিক ও নির্দিষ্ট পরিমাণ আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।

ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের বিকল্প হিসেবে দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করার বিষয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি ঘোষণা দেন, আগামীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে বেশি মূলধন থাকা বড় কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করা হবে। কর ফাঁকি দেওয়ার মহোৎসব বন্ধ করতে এখন থেকে বাজারে কার কতটুকু অংশ রয়েছে এবং সেই অনুপাতে কে কত টাকা কর দিচ্ছে, তা কড়া নজরদারির মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

অনুষ্ঠানে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং মুদ্রার বিনিময় হারকে তিনটি মূল ধ্রুবতারা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি পরামর্শ দেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রধান এবং একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া মূল্যস্ফীতিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে হলে প্রভাবশালী খাতগুলোকে দেওয়া অপ্রয়োজনীয় করছাড় অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আবার সমৃদ্ধির পথে ফেরাতে হলে একটি শক্তিশালী নোঙর বা ভিত্তির প্রয়োজন উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এই মুহূর্তে সরকারের বাজেট ঘাটতি কোনো অবস্থাতেই দেশের মোট জিডিপির চার শতাংশের ওপরে যাওয়া সমীচীন হবে না। প্রতি বছর যে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা মেটানোই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কর ও জিডিপির অনুপাত আট শতাংশে উন্নীত করার যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নির্ধারণ করেছে, তা অর্জন করতে হলে নতুন নতুন খাতকে করের আওতায় আনা এবং সামগ্রিক কর ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সমাজে চরম রূপ নেওয়া অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে তিনি সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার করের মতো প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা চালুর পক্ষে জোরালো মত দেন।

পিপিআরসির চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে আর্থিক সংকট এবং নিম্ন রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি আমরা জ্বালানি খাতের একটি বড় সংকট প্রত্যক্ষ করছি। তবে এই সব সংকটের চেয়েও বড় সংকট হলো প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট। সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক ও সংস্কারমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে গতি আনতে তিনি সব পক্ষকে সাথে নিয়ে একটি দুই বছর মেয়াদী বিশেষ অ্যাকশন ফ্রেমওয়ার্ক বা কর্মপরিকল্পনা তৈরির তাগিদ দেন।

দেশের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা এখন ১৯৭৪ সালের সেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতিতে নেই যে মানুষ খাবার পাচ্ছে না। তবে বিশ্ববাজার ও দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের হিসাব কোনোভাবেই মিলছে না। দেশে মূলত সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, স্বার্থান্বেষী নীতি প্রণয়ন, কর ফাঁকি এবং নানামুখী প্রশাসনিক হয়রানির মাধ্যমে দুর্নীতি শিকড় গেড়েছে, যা অনতিবিলম্বে উপড়ে ফেলতে হবে।

বিআইজিডির প্রফেসরিয়াল ফেলো ড. সেলিম জাহান তার বক্তব্যে বলেন, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হওয়া উচিত মানুষকে একটু স্বস্তি দেওয়া। তবে স্বস্তি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে সরকারকে একটি বিশাল অঙ্কের অবাস্তব বাজেট ঘোষণা করতে হবে; বরং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেবামূলক কাজে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার কতটা সহজ ও সাশ্রয়ী করা যাচ্ছে, সেটাই বড় বিষয়।

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, আমাদের অর্থনীতি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রথম কাজ হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও এর সহনশীলতা বাড়ানো। বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে পাঁচ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করার জন্যও আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

ব্যবসায়ী নেতাদের পক্ষে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নতুন কোনো বন্ধ কারখানা সচল করার চেয়ে বর্তমানে যে সব সচল কারখানা টিকে আছে, সেগুলো যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়ে যায়, বাজেটে সেই দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সরকার ব্যবসায়ীদের মুনাফা নিশ্চিত করতে না পারলেও অগ্রিম কর বা আগাম ভ্যাট কেটে নিয়ে যাচ্ছে, যা পরবর্তীতে আর কখনোই সঠিকভাবে সমন্বয় করা হয় না।

ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান বলেন, দেশের করের পরিধি বা করজাল ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে, তবে তা করতে হবে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে। দেশের আর্থিক খাতের এই ক্রান্তিলগ্নে সংস্কারের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা কোনো অবস্থাতেই থামানো যাবে না।

প্রথম আলোর অনলাইন প্রধান শওকত হোসেনের অত্যন্ত চমৎকার ও প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় এই গোলটেবিল বৈঠকে আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উর রহমান, টিকে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার, মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাউলা এবং বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬


অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জনস্বস্তি নিশ্চিত করতে হবে

প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

featured Image

টানা ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি, দেশের আর্থিক খাতের চরম নাজুক দশা এবং বৈশ্বিক নানা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনীতিকে টেনে তোলা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় পর একটি প্রকৃত নির্বাচিত সরকারের হাত ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু হওয়ায় এই মুহূর্তে প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার পারদ আকাশচুম্বী। এই অবস্থায় সরকারি রাজস্বের পরিধি বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তরুণদের জন্য বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমানের এই কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতগুলো নিরাময় করতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে; আর এই দুইয়ের মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখেই আগামী দিনের বাজেট প্রণয়ন করা আবশ্যক।

রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে প্রথম আলোর বিশেষ উদ্যোগে আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক নীতি নির্ধারণী গোলটেবিল বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা এই সব গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী নিজের অনড় অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, বিগত দিনে দেশের অর্থনীতি গুটিকয়েক সুবিধাভোগী বা অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল এবং সেখানে একটি বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। বর্তমান সরকার সেই বৃত্ত থেকে বের হয়ে এসে এমন একটি জনবান্ধব অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যার সুফল দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিক ভোগ করতে পারবেন। সরকার এমন সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ করবে যা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।

উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধান অন্তরায় হলো নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়া, যার ফলে প্রকল্পের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে এখন থেকে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। একই সাথে আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশের সব ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নিয়মকানুন সহজীকরণ করা হবে। ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমিয়ে আনা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও হয়রানি চিরতরে বন্ধ করতে সরকার অত্যন্ত কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছে।

বৈঠকে রেস্তোরাঁ খাতের এক শীর্ষ ব্যবসায়ীর ভোগান্তির কথা টেনে অর্থমন্ত্রী আশ্বাস দেন যে, ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তেরোটি ভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন যেন একটি মাত্র নির্দিষ্ট স্থান বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার থেকে পাওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা হবে। পাশাপাশি, কর আদায়ের নামে রেস্তোরাঁ মালিকরা যাতে কোনো ধরনের অসাধু কর্মকর্তাদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য করের একটি যৌক্তিক ও নির্দিষ্ট পরিমাণ আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।

ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের বিকল্প হিসেবে দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করার বিষয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি ঘোষণা দেন, আগামীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে বেশি মূলধন থাকা বড় কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করা হবে। কর ফাঁকি দেওয়ার মহোৎসব বন্ধ করতে এখন থেকে বাজারে কার কতটুকু অংশ রয়েছে এবং সেই অনুপাতে কে কত টাকা কর দিচ্ছে, তা কড়া নজরদারির মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

অনুষ্ঠানে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং মুদ্রার বিনিময় হারকে তিনটি মূল ধ্রুবতারা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি পরামর্শ দেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রধান এবং একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া মূল্যস্ফীতিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে হলে প্রভাবশালী খাতগুলোকে দেওয়া অপ্রয়োজনীয় করছাড় অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আবার সমৃদ্ধির পথে ফেরাতে হলে একটি শক্তিশালী নোঙর বা ভিত্তির প্রয়োজন উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এই মুহূর্তে সরকারের বাজেট ঘাটতি কোনো অবস্থাতেই দেশের মোট জিডিপির চার শতাংশের ওপরে যাওয়া সমীচীন হবে না। প্রতি বছর যে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা মেটানোই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কর ও জিডিপির অনুপাত আট শতাংশে উন্নীত করার যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নির্ধারণ করেছে, তা অর্জন করতে হলে নতুন নতুন খাতকে করের আওতায় আনা এবং সামগ্রিক কর ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সমাজে চরম রূপ নেওয়া অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে তিনি সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার করের মতো প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা চালুর পক্ষে জোরালো মত দেন।

পিপিআরসির চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে আর্থিক সংকট এবং নিম্ন রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি আমরা জ্বালানি খাতের একটি বড় সংকট প্রত্যক্ষ করছি। তবে এই সব সংকটের চেয়েও বড় সংকট হলো প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট। সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক ও সংস্কারমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে গতি আনতে তিনি সব পক্ষকে সাথে নিয়ে একটি দুই বছর মেয়াদী বিশেষ অ্যাকশন ফ্রেমওয়ার্ক বা কর্মপরিকল্পনা তৈরির তাগিদ দেন।

দেশের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা এখন ১৯৭৪ সালের সেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতিতে নেই যে মানুষ খাবার পাচ্ছে না। তবে বিশ্ববাজার ও দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের হিসাব কোনোভাবেই মিলছে না। দেশে মূলত সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, স্বার্থান্বেষী নীতি প্রণয়ন, কর ফাঁকি এবং নানামুখী প্রশাসনিক হয়রানির মাধ্যমে দুর্নীতি শিকড় গেড়েছে, যা অনতিবিলম্বে উপড়ে ফেলতে হবে।

বিআইজিডির প্রফেসরিয়াল ফেলো ড. সেলিম জাহান তার বক্তব্যে বলেন, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হওয়া উচিত মানুষকে একটু স্বস্তি দেওয়া। তবে স্বস্তি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে সরকারকে একটি বিশাল অঙ্কের অবাস্তব বাজেট ঘোষণা করতে হবে; বরং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেবামূলক কাজে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার কতটা সহজ ও সাশ্রয়ী করা যাচ্ছে, সেটাই বড় বিষয়।

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, আমাদের অর্থনীতি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রথম কাজ হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও এর সহনশীলতা বাড়ানো। বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে পাঁচ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করার জন্যও আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

ব্যবসায়ী নেতাদের পক্ষে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নতুন কোনো বন্ধ কারখানা সচল করার চেয়ে বর্তমানে যে সব সচল কারখানা টিকে আছে, সেগুলো যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়ে যায়, বাজেটে সেই দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সরকার ব্যবসায়ীদের মুনাফা নিশ্চিত করতে না পারলেও অগ্রিম কর বা আগাম ভ্যাট কেটে নিয়ে যাচ্ছে, যা পরবর্তীতে আর কখনোই সঠিকভাবে সমন্বয় করা হয় না।

ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান বলেন, দেশের করের পরিধি বা করজাল ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে, তবে তা করতে হবে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে। দেশের আর্থিক খাতের এই ক্রান্তিলগ্নে সংস্কারের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা কোনো অবস্থাতেই থামানো যাবে না।

প্রথম আলোর অনলাইন প্রধান শওকত হোসেনের অত্যন্ত চমৎকার ও প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় এই গোলটেবিল বৈঠকে আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উর রহমান, টিকে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার, মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাউলা এবং বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল