দিকপাল

ই-লোন কী, কীভাবে পাওয়া যায়?


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ | ০২:১৮ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ই-লোন কী, কীভাবে পাওয়া যায়?

ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কথা ভাবলেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়ার ছবি। ব্যাংকের শাখায় যাওয়া, জটিল সব আবেদনপত্র পূরণ করা, নথিপত্র জমা দেওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা এবং সবশেষে ঋণের টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার আশায় অধীর আগ্রহে দিন গোনা—এটাই ছিল চিরচেনা রূপ। তবে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এবং সময়ের আবর্তনে এই সনাতন চিত্রে এখন এক বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে মাত্র কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমেই এখন ঋণের আবেদন করা যাচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে গ্রাহকের যোগ্যতা যাচাই-বাছাই এবং কোনো রকম শারীরিক উপস্থিতি ছাড়াই ঘরে বসে ঋণের টাকা সরাসরি নিজের অ্যাকাউন্টে চলে আসছে। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার এই অভাবনীয় ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়াটিকেই বলা হচ্ছে ডিজিটাল ঋণ। বাংলাদেশের আর্থিক খাতেও ব্যাংক এবং বিভিন্ন অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এই আধুনিক সেবাটির পরিধি দিন দিন বৃদ্ধি করছে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১১ মে ব্যাংক-কোম্পানি আইনের বিশেষ ধারার আওতায় এই সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী নীতিমালা জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নতুন পদক্ষেপের পর স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন জাগছে যে, এই ডিজিটাল ঋণ আসলে কীভাবে পরিচালিত হয়, কারা এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য এবং এর মাঝে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা বা সম্ভাব্য ঝুঁকি লুকিয়ে রয়েছে।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ডিজিটাল ঋণ হলো সম্পূর্ণ প্রযুক্তিভিত্তিক একটি ঋণসেবা, যার আবেদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত অনুমোদন এবং অর্থ বিতরণ—সবকিছুই অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এই প্রক্রিয়ায় গ্রাহককে ঋণের জন্য ব্যাংকের কোনো শাখায় সশরীরে উপস্থিত হতে হয় না। গ্রাহক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, ওয়েবসাইট বা যেকোনো অনুমোদিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজের প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরিচয়পত্র আপলোড করে ঋণের জন্য আবেদন করতে পারেন। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে গ্রাহকের পূর্বের আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস, নিয়মিত আয়-ব্যয় এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় সময় ও শ্রম বিপুল পরিমাণে বেঁচে গেলেও গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঋণের শর্তাবলী ভালোভাবে বুঝে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ডিজিটাল ঋণের এই ধারণাটি কি আমাদের দেশে একদমই নতুন? এর উত্তর হচ্ছে, না। বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গত কয়েক বছর ধরেই পরীক্ষামূলকভাবে এবং সফলতার সাথে এই ধরনের ডিজিটাল ঋণ সেবা দিয়ে আসছে। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এবং খাত সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের মতে, এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণা নয়। এর আগে দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংক ও একটি মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে গ্রাহকদের এই সেবা দেওয়া হতো, যার সর্বোচ্চ সীমা ছিল প্রথমে বিশ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সার্কুলারের বিশেষ গুরুত্ব হলো, এর ফলে এখন দেশের যেকোনো তফসিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই সেবাটি নিজস্ব উদ্যোগে দিতে পারবে। আগে যেখানে এটি কেবল দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে সীমিত পরিসরে চলত, এখন তা সারা দেশের সব ব্যাংকের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এটি আসলে ঋণের নতুন কোনো ধরন বা শ্রেণীবিভাগ নয়, বরং ঋণ প্রদানের একটি আধুনিক ও উন্নত ডিজিটাল প্রক্রিয়া মাত্র। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতের ঋণের পরিধির মাঝেই এই ডিজিটাল ঋণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনলাইন মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এই সেবার আনুষ্ঠানিক নাম হবে ই-লোন এবং এর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনার আওতায় একজন গ্রাহক ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। তবে এই ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর বা বারো মাস, যার মধ্যেই সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। সুদের হারের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সাধারণত বাজারভিত্তিক সুদহার কার্যকর হলেও কোনো ব্যাংক যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় এই ঋণ বিতরণ করে, তবে গ্রাহক পর্যায়ে সুদের সর্বোচ্চ হার হবে নয় শতাংশ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ ও প্রান্তিক গ্রাহকদের কম সুদে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। এই প্রক্রিয়ায় গ্রাহককে কোনো কাগজের দলিলে সশরীরে স্বাক্ষর করতে হবে না। এর পরিবর্তে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রাহকের হাতের আঙুলের ছাপ বা চোখের মণির মতো বায়োমেট্রিক তথ্য এবং দুই স্তরের যাচাইকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে গ্রাহকের চূড়ান্ত সম্মতি নেওয়া হবে। ঋণ অনুমোদনের ঠিক আগেই ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকের পূর্বের ঋণের রেকর্ড বা ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর প্রতিবেদন পরীক্ষা করে দেখবে, তবে এই বিশেষ অনুসন্ধানের জন্য গ্রাহক বা ব্যাংকের ওপর বাড়তি কোনো ফি বা চার্জ ধার্য করা হবে না। দেশের কোনো চিহ্নিত ঋণখেলাপি ব্যক্তি এই আধুনিক ডিজিটাল ঋণ সুবিধার আওতাভুক্ত হতে পারবেন না এবং ব্যাংকগুলোকে এই বিষয়ে কঠোরভাবে নিয়ম মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিমাণের দিক থেকে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা খুব বেশি মনে না হলেও দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর জন্য এটি অত্যন্ত কল্যাণকর হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে যারা সাধারণত প্রথাগত ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকেন বা নানা জটিলতার কারণে ব্যাংকে যেতে পারেন না, তাদের দেশের মূল অর্থনৈতিক ধারার সাথে যুক্ত করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। এনজিও বা অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে চড়া সুদে সাপ্তাহিক কিস্তিতে ঋণ নেওয়ার চেয়ে এই ডিজিটাল ঋণের বার্ষিক খরচ অনেক কম এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী কিংবা প্রান্তিক চাষীরা এই টাকা দিয়ে তাদের জরুরি আর্থিক সংকট মোকাবিলা করতে পারবেন বা ছোট কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা এবং ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত করার মাধ্যমে একটি নগদবিহীন সমাজ গঠনে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে এই সম্ভাবনাময় সেবার পেছনে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাতের বোদ্ধারা। যেহেতু এটি সম্পূর্ণ জামানতবিহীন একটি ঋণ ব্যবস্থা, তাই সুদের হার যদি নয় শতাংশের মধ্যে কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে অনেক ব্যাংক এই ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে। কারণ ছোট অংকের এই ঋণগুলো আদায়ের জন্য ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হয়। তাছাড়া জামানত না থাকায় যদি কিছু গ্রাহক সময়মতো টাকা ফেরত না দেন, তবে ব্যাংকের জন্য সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই ধরনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও ছোট অংকের ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার কিছুটা বেশি রাখা হয়, যাতে দুই-একজনের খেলাপি ঋণের ক্ষতি অন্য সফল লেনদেন থেকে সমন্বয় করা যায়। তবে গ্রাহকের দিক থেকে এখানে ঝুঁকির পরিমাণ নেই বললেই চলে। সাময়িক কিছু ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে এবং আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসারে এই ধরনের উদ্ভাবনী পদক্ষেপের দিকেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬


ই-লোন কী, কীভাবে পাওয়া যায়?

প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬

featured Image

ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কথা ভাবলেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়ার ছবি। ব্যাংকের শাখায় যাওয়া, জটিল সব আবেদনপত্র পূরণ করা, নথিপত্র জমা দেওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা এবং সবশেষে ঋণের টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার আশায় অধীর আগ্রহে দিন গোনা—এটাই ছিল চিরচেনা রূপ। তবে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এবং সময়ের আবর্তনে এই সনাতন চিত্রে এখন এক বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে মাত্র কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমেই এখন ঋণের আবেদন করা যাচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে গ্রাহকের যোগ্যতা যাচাই-বাছাই এবং কোনো রকম শারীরিক উপস্থিতি ছাড়াই ঘরে বসে ঋণের টাকা সরাসরি নিজের অ্যাকাউন্টে চলে আসছে। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার এই অভাবনীয় ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়াটিকেই বলা হচ্ছে ডিজিটাল ঋণ। বাংলাদেশের আর্থিক খাতেও ব্যাংক এবং বিভিন্ন অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এই আধুনিক সেবাটির পরিধি দিন দিন বৃদ্ধি করছে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১১ মে ব্যাংক-কোম্পানি আইনের বিশেষ ধারার আওতায় এই সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী নীতিমালা জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নতুন পদক্ষেপের পর স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন জাগছে যে, এই ডিজিটাল ঋণ আসলে কীভাবে পরিচালিত হয়, কারা এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য এবং এর মাঝে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা বা সম্ভাব্য ঝুঁকি লুকিয়ে রয়েছে।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ডিজিটাল ঋণ হলো সম্পূর্ণ প্রযুক্তিভিত্তিক একটি ঋণসেবা, যার আবেদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত অনুমোদন এবং অর্থ বিতরণ—সবকিছুই অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এই প্রক্রিয়ায় গ্রাহককে ঋণের জন্য ব্যাংকের কোনো শাখায় সশরীরে উপস্থিত হতে হয় না। গ্রাহক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, ওয়েবসাইট বা যেকোনো অনুমোদিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজের প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরিচয়পত্র আপলোড করে ঋণের জন্য আবেদন করতে পারেন। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে গ্রাহকের পূর্বের আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস, নিয়মিত আয়-ব্যয় এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় সময় ও শ্রম বিপুল পরিমাণে বেঁচে গেলেও গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঋণের শর্তাবলী ভালোভাবে বুঝে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ডিজিটাল ঋণের এই ধারণাটি কি আমাদের দেশে একদমই নতুন? এর উত্তর হচ্ছে, না। বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গত কয়েক বছর ধরেই পরীক্ষামূলকভাবে এবং সফলতার সাথে এই ধরনের ডিজিটাল ঋণ সেবা দিয়ে আসছে। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এবং খাত সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের মতে, এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণা নয়। এর আগে দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংক ও একটি মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে গ্রাহকদের এই সেবা দেওয়া হতো, যার সর্বোচ্চ সীমা ছিল প্রথমে বিশ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সার্কুলারের বিশেষ গুরুত্ব হলো, এর ফলে এখন দেশের যেকোনো তফসিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই সেবাটি নিজস্ব উদ্যোগে দিতে পারবে। আগে যেখানে এটি কেবল দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে সীমিত পরিসরে চলত, এখন তা সারা দেশের সব ব্যাংকের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এটি আসলে ঋণের নতুন কোনো ধরন বা শ্রেণীবিভাগ নয়, বরং ঋণ প্রদানের একটি আধুনিক ও উন্নত ডিজিটাল প্রক্রিয়া মাত্র। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতের ঋণের পরিধির মাঝেই এই ডিজিটাল ঋণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনলাইন মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এই সেবার আনুষ্ঠানিক নাম হবে ই-লোন এবং এর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনার আওতায় একজন গ্রাহক ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। তবে এই ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর বা বারো মাস, যার মধ্যেই সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। সুদের হারের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সাধারণত বাজারভিত্তিক সুদহার কার্যকর হলেও কোনো ব্যাংক যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় এই ঋণ বিতরণ করে, তবে গ্রাহক পর্যায়ে সুদের সর্বোচ্চ হার হবে নয় শতাংশ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ ও প্রান্তিক গ্রাহকদের কম সুদে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। এই প্রক্রিয়ায় গ্রাহককে কোনো কাগজের দলিলে সশরীরে স্বাক্ষর করতে হবে না। এর পরিবর্তে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রাহকের হাতের আঙুলের ছাপ বা চোখের মণির মতো বায়োমেট্রিক তথ্য এবং দুই স্তরের যাচাইকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে গ্রাহকের চূড়ান্ত সম্মতি নেওয়া হবে। ঋণ অনুমোদনের ঠিক আগেই ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকের পূর্বের ঋণের রেকর্ড বা ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর প্রতিবেদন পরীক্ষা করে দেখবে, তবে এই বিশেষ অনুসন্ধানের জন্য গ্রাহক বা ব্যাংকের ওপর বাড়তি কোনো ফি বা চার্জ ধার্য করা হবে না। দেশের কোনো চিহ্নিত ঋণখেলাপি ব্যক্তি এই আধুনিক ডিজিটাল ঋণ সুবিধার আওতাভুক্ত হতে পারবেন না এবং ব্যাংকগুলোকে এই বিষয়ে কঠোরভাবে নিয়ম মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিমাণের দিক থেকে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা খুব বেশি মনে না হলেও দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর জন্য এটি অত্যন্ত কল্যাণকর হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে যারা সাধারণত প্রথাগত ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকেন বা নানা জটিলতার কারণে ব্যাংকে যেতে পারেন না, তাদের দেশের মূল অর্থনৈতিক ধারার সাথে যুক্ত করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। এনজিও বা অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে চড়া সুদে সাপ্তাহিক কিস্তিতে ঋণ নেওয়ার চেয়ে এই ডিজিটাল ঋণের বার্ষিক খরচ অনেক কম এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী কিংবা প্রান্তিক চাষীরা এই টাকা দিয়ে তাদের জরুরি আর্থিক সংকট মোকাবিলা করতে পারবেন বা ছোট কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা এবং ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত করার মাধ্যমে একটি নগদবিহীন সমাজ গঠনে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে এই সম্ভাবনাময় সেবার পেছনে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাতের বোদ্ধারা। যেহেতু এটি সম্পূর্ণ জামানতবিহীন একটি ঋণ ব্যবস্থা, তাই সুদের হার যদি নয় শতাংশের মধ্যে কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে অনেক ব্যাংক এই ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে। কারণ ছোট অংকের এই ঋণগুলো আদায়ের জন্য ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হয়। তাছাড়া জামানত না থাকায় যদি কিছু গ্রাহক সময়মতো টাকা ফেরত না দেন, তবে ব্যাংকের জন্য সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই ধরনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও ছোট অংকের ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার কিছুটা বেশি রাখা হয়, যাতে দুই-একজনের খেলাপি ঋণের ক্ষতি অন্য সফল লেনদেন থেকে সমন্বয় করা যায়। তবে গ্রাহকের দিক থেকে এখানে ঝুঁকির পরিমাণ নেই বললেই চলে। সাময়িক কিছু ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে এবং আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসারে এই ধরনের উদ্ভাবনী পদক্ষেপের দিকেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল