দিকপাল

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস জনজীবনে


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:৪১ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস জনজীবনে

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা হাবিবুর রহমান একটি বেসরকারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। মাসে তার আয় ৫৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাড়িভাড়া, দুই সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতে খরচ হয় প্রায় ৩৮-৩৯ হাজার টাকা। গ্রামের বাড়িতে থাকা বৃদ্ধ মা–বাবার জন্য নিয়মিত পাঠান ১০ হাজার টাকা। বাকি ৯-১০ হাজার টাকা দিয়ে চালাতে হয় মাসের বাজার।

কয়েক মাস আগেও এই আয় দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে সংসার চললেও সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। খরচ কমাতে পরিবারে গরুর মাংস ও ফল খাওয়া কমানো হয়েছে। ছুটির দিনে বাইরে ঘোরাঘুরিও বন্ধ। তবুও ব্যয় সামাল দিতে না পেরে এখন প্রায়ই ঋণ নিতে হচ্ছে।

হাবিবুরের ভাষ্য, বাজারে সবকিছুর দামই বেড়েছে—সবজি, পোশাক থেকে শুরু করে ওষুধ পর্যন্ত। আগে ৬-৭ হাজার টাকায় মাসের বাজার হলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯-১০ হাজার টাকায়। সম্প্রতি ডিম, চিনি, বেগুন, পটোলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। সোনালি মুরগির কেজিও ৩৫০ টাকার ওপরে, যা তার মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিক্রেতারা জানান, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এরপর দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবেও নতুন করে বাজারে মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে চাল, আটা, ময়দা ও সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। এছাড়া সুগন্ধি চাল, ডিটারজেন্ট, সাবানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় আরও কিছু পণ্যের দাম গত এক-দুই মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাছ-মাংসের দামও তুলনামূলক বেশি।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সম্প্রতি গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। চলতি মাসে দুই দফায় এলপিজির দাম বাড়ায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকায়, যা আগের তুলনায় প্রায় ৬০০ টাকা বেশি। বাজারে অনেক সময় আরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

একই সঙ্গে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদন ও বাজারদরে।

আদাবর এলাকার গৃহকর্মী লাইজু বেগম জানান, ভাড়া বাসায় থাকায় তিনি সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করেন। হঠাৎ গ্যাসের দাম বাড়ায় তার সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়ে যাওয়ায় খরচ সামলানো দুষ্কর হয়ে উঠেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় সোনালি মুরগির দাম ৪৫ শতাংশ এবং ব্রয়লারের দাম ৭ শতাংশ বেড়েছে। গত দুই সপ্তাহে ডিমের দাম ডজনে প্রায় ২০ টাকা বেড়ে এখন ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে সোনালি মুরগির কেজি ৩৫০ টাকার কাছাকাছি, আর ব্রয়লার ১৮০-১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারেও দাম চড়া—ছোট রুই ২৮০-৩৫০ টাকা, তেলাপিয়া ও পাঙাশ ২০০-২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। আলু ছাড়া ৫০ টাকার নিচে সবজি পাওয়া কঠিন। অধিকাংশ সবজির দাম ৬০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে, কিছু ক্ষেত্রে তারও বেশি। সরবরাহ বাড়লেও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দাম কমছে না বলে জানান বিক্রেতারা।

চিনি, চালসহ অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়েছে। মাঝারি চাল এখন ৫৫-৬০ টাকা এবং মোটা চাল ৫০-৫৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাসে এসব চালের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

অন্যদিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক দোকান ঘুরেও ক্রেতারা তেল পাচ্ছেন না। উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলেও এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না থাকায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

বিক্রেতাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ ঘাটতি এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি—এই তিন কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। আয় বাড়ার তুলনায় ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। টানা কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব দেশের সাধারণ মানুষের ওপর স্পষ্টভাবে পড়ছে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬


নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস জনজীবনে

প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা হাবিবুর রহমান একটি বেসরকারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। মাসে তার আয় ৫৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাড়িভাড়া, দুই সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতে খরচ হয় প্রায় ৩৮-৩৯ হাজার টাকা। গ্রামের বাড়িতে থাকা বৃদ্ধ মা–বাবার জন্য নিয়মিত পাঠান ১০ হাজার টাকা। বাকি ৯-১০ হাজার টাকা দিয়ে চালাতে হয় মাসের বাজার।

কয়েক মাস আগেও এই আয় দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে সংসার চললেও সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। খরচ কমাতে পরিবারে গরুর মাংস ও ফল খাওয়া কমানো হয়েছে। ছুটির দিনে বাইরে ঘোরাঘুরিও বন্ধ। তবুও ব্যয় সামাল দিতে না পেরে এখন প্রায়ই ঋণ নিতে হচ্ছে।

হাবিবুরের ভাষ্য, বাজারে সবকিছুর দামই বেড়েছে—সবজি, পোশাক থেকে শুরু করে ওষুধ পর্যন্ত। আগে ৬-৭ হাজার টাকায় মাসের বাজার হলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯-১০ হাজার টাকায়। সম্প্রতি ডিম, চিনি, বেগুন, পটোলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। সোনালি মুরগির কেজিও ৩৫০ টাকার ওপরে, যা তার মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিক্রেতারা জানান, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এরপর দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের প্রভাবেও নতুন করে বাজারে মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে চাল, আটা, ময়দা ও সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। এছাড়া সুগন্ধি চাল, ডিটারজেন্ট, সাবানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় আরও কিছু পণ্যের দাম গত এক-দুই মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাছ-মাংসের দামও তুলনামূলক বেশি।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সম্প্রতি গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। চলতি মাসে দুই দফায় এলপিজির দাম বাড়ায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকায়, যা আগের তুলনায় প্রায় ৬০০ টাকা বেশি। বাজারে অনেক সময় আরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

একই সঙ্গে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদন ও বাজারদরে।

আদাবর এলাকার গৃহকর্মী লাইজু বেগম জানান, ভাড়া বাসায় থাকায় তিনি সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করেন। হঠাৎ গ্যাসের দাম বাড়ায় তার সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়ে যাওয়ায় খরচ সামলানো দুষ্কর হয়ে উঠেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় সোনালি মুরগির দাম ৪৫ শতাংশ এবং ব্রয়লারের দাম ৭ শতাংশ বেড়েছে। গত দুই সপ্তাহে ডিমের দাম ডজনে প্রায় ২০ টাকা বেড়ে এখন ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে সোনালি মুরগির কেজি ৩৫০ টাকার কাছাকাছি, আর ব্রয়লার ১৮০-১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারেও দাম চড়া—ছোট রুই ২৮০-৩৫০ টাকা, তেলাপিয়া ও পাঙাশ ২০০-২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। আলু ছাড়া ৫০ টাকার নিচে সবজি পাওয়া কঠিন। অধিকাংশ সবজির দাম ৬০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে, কিছু ক্ষেত্রে তারও বেশি। সরবরাহ বাড়লেও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দাম কমছে না বলে জানান বিক্রেতারা।

চিনি, চালসহ অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়েছে। মাঝারি চাল এখন ৫৫-৬০ টাকা এবং মোটা চাল ৫০-৫৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাসে এসব চালের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

অন্যদিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক দোকান ঘুরেও ক্রেতারা তেল পাচ্ছেন না। উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলেও এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না থাকায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

বিক্রেতাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ ঘাটতি এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি—এই তিন কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। আয় বাড়ার তুলনায় ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। টানা কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব দেশের সাধারণ মানুষের ওপর স্পষ্টভাবে পড়ছে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল