দিকপাল

হরমুজ প্রণালিতে আটকা হাজারো নাবিক ফুরিয়ে আসছে খাদ্য ও রসদ


শামিমা লিয়া
শামিমা লিয়া আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০১:০০ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

হরমুজ প্রণালিতে আটকা হাজারো নাবিক ফুরিয়ে আসছে খাদ্য ও রসদ

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে এক মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্যাংকার মালিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ইন্টারট্যাংকো’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০৫টিরও বেশি ট্যাংকারে প্রায় দুই হাজার ৪০০ নাবিক এখন মাঝ সমুদ্রে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। একদিকে ফুরিয়ে আসা খাদ্য ও পানির সংকট, অন্যদিকে মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন—সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছে তাদের। ঘরে ফেরার আকুতি জানালেও অনিশ্চয়তার মেঘ যেন কাটছেই না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নাবিকের ভাষায়, তারা এখন সমুদ্রের মাঝখানে এক ভাসমান কারাগারে বন্দি, যেখান থেকে মুক্তির কোনো পথ তাদের জানা নেই।

ইরান এই অচলাবস্থার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনকে দায়ী করছে। বিশ্ববাজারের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় এই সরু জলপথ দিয়ে, ফলে এর অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে ইন্টারট্যাংকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিম উইলকিন্স উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজে আটকে থাকায় নাবিকদের মধ্যে চরম মানসিক চাপ, ক্লান্তি ও উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে। এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মৌলিক রসদ সরবরাহের মতো বিষয়গুলোও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক নাবিক জানান, ৫০ দিন ধরে এই মৃত্যুপুরীতে আটকে থেকে তারা এখন এতটাই আতঙ্কিত যে, জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না তা নিয়ে সন্দিহান। তাদের চোখের সামনেই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জাহাজ বিধ্বস্ত হতে দেখার অভিজ্ঞতা এই আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (আইটিএফ) জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে নাবিকদের কাছ থেকে দেশে ফেরার এবং রসদ সরবরাহের প্রায় ১৯০০টি জরুরি অনুরোধ পেয়েছে। এর মধ্যে ৪৫০ জন নাবিককে কোনোমতে উদ্ধার করে দেশে পাঠানো সম্ভব হলেও বাকিরা এখনো চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরান সম্প্রতি একটি নতুন প্রস্তাব পেশ করেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’। এই প্রস্তাবে পারমাণবিক ইস্যুর আলোচনা পরের ধাপের জন্য স্থগিত রেখে প্রাথমিকভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদি এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হয়, তবেই হয়তো গভীর সমুদ্রে মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা হাজারো নাবিকের ঘরে ফেরার স্বপ্ন পূরণ হবে।

তথ্যের উৎস: বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (আইটিএফ)।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬


হরমুজ প্রণালিতে আটকা হাজারো নাবিক ফুরিয়ে আসছে খাদ্য ও রসদ

প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে এক মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্যাংকার মালিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ইন্টারট্যাংকো’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০৫টিরও বেশি ট্যাংকারে প্রায় দুই হাজার ৪০০ নাবিক এখন মাঝ সমুদ্রে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। একদিকে ফুরিয়ে আসা খাদ্য ও পানির সংকট, অন্যদিকে মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন—সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছে তাদের। ঘরে ফেরার আকুতি জানালেও অনিশ্চয়তার মেঘ যেন কাটছেই না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নাবিকের ভাষায়, তারা এখন সমুদ্রের মাঝখানে এক ভাসমান কারাগারে বন্দি, যেখান থেকে মুক্তির কোনো পথ তাদের জানা নেই।

ইরান এই অচলাবস্থার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনকে দায়ী করছে। বিশ্ববাজারের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় এই সরু জলপথ দিয়ে, ফলে এর অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে ইন্টারট্যাংকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিম উইলকিন্স উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজে আটকে থাকায় নাবিকদের মধ্যে চরম মানসিক চাপ, ক্লান্তি ও উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে। এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মৌলিক রসদ সরবরাহের মতো বিষয়গুলোও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক নাবিক জানান, ৫০ দিন ধরে এই মৃত্যুপুরীতে আটকে থেকে তারা এখন এতটাই আতঙ্কিত যে, জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না তা নিয়ে সন্দিহান। তাদের চোখের সামনেই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জাহাজ বিধ্বস্ত হতে দেখার অভিজ্ঞতা এই আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (আইটিএফ) জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে নাবিকদের কাছ থেকে দেশে ফেরার এবং রসদ সরবরাহের প্রায় ১৯০০টি জরুরি অনুরোধ পেয়েছে। এর মধ্যে ৪৫০ জন নাবিককে কোনোমতে উদ্ধার করে দেশে পাঠানো সম্ভব হলেও বাকিরা এখনো চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরান সম্প্রতি একটি নতুন প্রস্তাব পেশ করেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’। এই প্রস্তাবে পারমাণবিক ইস্যুর আলোচনা পরের ধাপের জন্য স্থগিত রেখে প্রাথমিকভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদি এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হয়, তবেই হয়তো গভীর সমুদ্রে মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা হাজারো নাবিকের ঘরে ফেরার স্বপ্ন পূরণ হবে।

তথ্যের উৎস: বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (আইটিএফ)।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল