মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে শান্তি ফেরাতে মার্কিন প্রশাসনের কাছে একটি নতুন কূটনৈতিক প্রস্তাব পেশ করেছে ইরান। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো এই প্রস্তাবে সংঘাত নিরসন ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তিন স্তরের একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালেস এই আলোচনার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করলেও স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল এমন একটি চুক্তিতেই সই করবে যা মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করবে এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখবে। প্রস্তাবের প্রথম পর্যায়ে তেহরান যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং ইরান ও লেবাননে আর কোনো আগ্রাসী হামলা হবে না—এমন নিশ্চয়তা দাবি করেছে। এই শর্ত পূরণ হলে দ্বিতীয় ধাপে হরমুজ প্রণালী পরিচালনা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা এবং চূড়ান্ত ধাপে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্থবির হয়ে থাকা সংলাপ পুনরায় শুরুর আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বর্তমানে এই প্রস্তাবের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর ওমান সফর শেষ করে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছেছেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। আরাকচি মনে করেন, ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার এই সন্ধিক্ষণে ক্রেমলিনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন তেহরানের জন্য একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে এই সমন্বয় কেবল সামরিক বা গোয়েন্দা সহযোগিতার জন্য নয়, বরং পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি সুকৌশলী পদক্ষেপ।
এদিকে আলোচনার টেবিলে কূটনীতি চললেও তেহরানের সুর বেশ কঠোর। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন যে আধিপত্যের কথা বলছে তা বাস্তবসম্মত নয় এবং ইরানের হাতে এখনো বেশ কিছু শক্তিশালী ‘কার্ড’ বা বিকল্প ব্যবস্থা অব্যবহৃত রয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছেড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তবে ইরানও হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন নেটওয়ার্কগুলো অকেজো করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমে জ্বালানির বাড়তি চাহিদাকে সামনে রেখে ইরান বিশ্ববাজারের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে ফেলতে পারে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
শান্তি প্রস্তাবের সমান্তরালে ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সাকাব ইসফাহানি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোকে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, যদি ইরানের কোনো তেল শোধনাগার বা অবকাঠামো আক্রান্ত হয়, তবে আক্রমণকারীদের সমর্থন দেওয়া দেশগুলোতে পাল্টা ‘চার গুণ’ আঘাত হানা হবে। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই ইরানের এই কঠোর অবস্থান। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরানের অর্থনীতি ধসে পড়ছে এবং তারা অর্থের জন্য হাহাকার করছে। এই পাল্টাপাল্টি হুমকি আর কূটনৈতিক প্রস্তাবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।
তথ্যের উৎস: গালফ নিউজ, তাসনিম নিউজ এজেন্সি, অ্যাক্সিওস এবং রয়টার্স।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে শান্তি ফেরাতে মার্কিন প্রশাসনের কাছে একটি নতুন কূটনৈতিক প্রস্তাব পেশ করেছে ইরান। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো এই প্রস্তাবে সংঘাত নিরসন ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তিন স্তরের একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালেস এই আলোচনার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করলেও স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল এমন একটি চুক্তিতেই সই করবে যা মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করবে এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখবে। প্রস্তাবের প্রথম পর্যায়ে তেহরান যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং ইরান ও লেবাননে আর কোনো আগ্রাসী হামলা হবে না—এমন নিশ্চয়তা দাবি করেছে। এই শর্ত পূরণ হলে দ্বিতীয় ধাপে হরমুজ প্রণালী পরিচালনা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা এবং চূড়ান্ত ধাপে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্থবির হয়ে থাকা সংলাপ পুনরায় শুরুর আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বর্তমানে এই প্রস্তাবের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর ওমান সফর শেষ করে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছেছেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। আরাকচি মনে করেন, ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার এই সন্ধিক্ষণে ক্রেমলিনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন তেহরানের জন্য একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে এই সমন্বয় কেবল সামরিক বা গোয়েন্দা সহযোগিতার জন্য নয়, বরং পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি সুকৌশলী পদক্ষেপ।
এদিকে আলোচনার টেবিলে কূটনীতি চললেও তেহরানের সুর বেশ কঠোর। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন যে আধিপত্যের কথা বলছে তা বাস্তবসম্মত নয় এবং ইরানের হাতে এখনো বেশ কিছু শক্তিশালী ‘কার্ড’ বা বিকল্প ব্যবস্থা অব্যবহৃত রয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছেড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তবে ইরানও হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন নেটওয়ার্কগুলো অকেজো করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমে জ্বালানির বাড়তি চাহিদাকে সামনে রেখে ইরান বিশ্ববাজারের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে ফেলতে পারে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
শান্তি প্রস্তাবের সমান্তরালে ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সাকাব ইসফাহানি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোকে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, যদি ইরানের কোনো তেল শোধনাগার বা অবকাঠামো আক্রান্ত হয়, তবে আক্রমণকারীদের সমর্থন দেওয়া দেশগুলোতে পাল্টা ‘চার গুণ’ আঘাত হানা হবে। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই ইরানের এই কঠোর অবস্থান। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরানের অর্থনীতি ধসে পড়ছে এবং তারা অর্থের জন্য হাহাকার করছে। এই পাল্টাপাল্টি হুমকি আর কূটনৈতিক প্রস্তাবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।
তথ্যের উৎস: গালফ নিউজ, তাসনিম নিউজ এজেন্সি, অ্যাক্সিওস এবং রয়টার্স।

আপনার মতামত লিখুন