আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার তালিকায় এক অভাবনীয় পরিবর্তনের আভাস মিলেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন দর্শনে নতুন এক মোড় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। অর্থ বিভাগের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবার দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে ভৌত অবকাঠামোর চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে অবহেলিত থাকা স্বাস্থ্যসেবা খাতকে শক্তিশালী করতে এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনতে সরকার এই সাহসী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, এতদিন বাজেটে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাওয়া বিদ্যুৎ খাতে এবার উন্নয়ন বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মূলত বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ঋণের শর্ত অনুযায়ী ভর্তুকির চাপ কমানোর লক্ষ্যেই এই কৌশলগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ বর্তমানের ১২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বৃদ্ধির পেছনে সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য কাজ করছে, যার মূল ভিত্তি হলো 'ই-হেলথ কার্ড' এবং 'জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা' চালুর উদ্যোগ। এই ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসার জন্য পকেট থেকে অতিরিক্ত খরচ কমানোর পথ প্রশস্ত হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে স্বাস্থ্য খাতে জনগণের ব্যক্তিগত ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ, সেখানে এই বরাদ্দ বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক সংকেত। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়, বরং এই অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং স্বাস্থ্য খাতের চিরচেনা দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করাই হবে সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এদিকে, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন বরাদ্দ কমানোর বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতের বরাদ্দ ১৯ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ হাজার ৯৮ কোটি টাকা কম। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত চাহিদা এর অর্ধেক, অর্থাৎ ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের আশেপাশে সীমাবদ্ধ। ফলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চেয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সুষমভাবে বণ্টনের জন্য সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নেই এখন বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণ এবং ডলার সংকটের কারণে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করাও এই বরাদ্দ হ্রাসের অন্যতম কারণ।
সার্বিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেটের শীর্ষ ১০টি খাতের জন্য মোট ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা বরাদ্দের একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষা খাতের আওতাভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা পেতে যাচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার, প্রতিরক্ষা, কৃষি এবং সড়ক পরিবহন খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতেও ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবকাঠামো কেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি থেকে সরে এসে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মানবসম্পদ উন্নয়নমুখী ব্যয়ে সরকারের এই মনোযোগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করবে। তবে বরাদ্দের এই সুফল যেন প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, সেজন্য কঠোর তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার তালিকায় এক অভাবনীয় পরিবর্তনের আভাস মিলেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন দর্শনে নতুন এক মোড় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। অর্থ বিভাগের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবার দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে ভৌত অবকাঠামোর চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে অবহেলিত থাকা স্বাস্থ্যসেবা খাতকে শক্তিশালী করতে এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনতে সরকার এই সাহসী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, এতদিন বাজেটে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাওয়া বিদ্যুৎ খাতে এবার উন্নয়ন বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মূলত বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ঋণের শর্ত অনুযায়ী ভর্তুকির চাপ কমানোর লক্ষ্যেই এই কৌশলগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ বর্তমানের ১২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বৃদ্ধির পেছনে সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য কাজ করছে, যার মূল ভিত্তি হলো 'ই-হেলথ কার্ড' এবং 'জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা' চালুর উদ্যোগ। এই ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসার জন্য পকেট থেকে অতিরিক্ত খরচ কমানোর পথ প্রশস্ত হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে স্বাস্থ্য খাতে জনগণের ব্যক্তিগত ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ, সেখানে এই বরাদ্দ বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক সংকেত। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়, বরং এই অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং স্বাস্থ্য খাতের চিরচেনা দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করাই হবে সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এদিকে, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন বরাদ্দ কমানোর বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতের বরাদ্দ ১৯ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ হাজার ৯৮ কোটি টাকা কম। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত চাহিদা এর অর্ধেক, অর্থাৎ ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের আশেপাশে সীমাবদ্ধ। ফলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চেয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সুষমভাবে বণ্টনের জন্য সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নেই এখন বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণ এবং ডলার সংকটের কারণে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করাও এই বরাদ্দ হ্রাসের অন্যতম কারণ।
সার্বিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেটের শীর্ষ ১০টি খাতের জন্য মোট ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা বরাদ্দের একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষা খাতের আওতাভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা পেতে যাচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার, প্রতিরক্ষা, কৃষি এবং সড়ক পরিবহন খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতেও ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবকাঠামো কেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি থেকে সরে এসে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মানবসম্পদ উন্নয়নমুখী ব্যয়ে সরকারের এই মনোযোগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করবে। তবে বরাদ্দের এই সুফল যেন প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, সেজন্য কঠোর তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

আপনার মতামত লিখুন