দিকপাল

সংকটে ব্যবসায়িক খাত, ব্যয়ভারে পিষ্ট সাধারণ ভোক্তা



সংকটে ব্যবসায়িক খাত, ব্যয়ভারে পিষ্ট সাধারণ ভোক্তা

দেশের বর্তমান অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এক গভীর ও বহুমুখী সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে, যা দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে। উচ্চ সুদের হারের কারণে বিনিয়োগের পরিবেশ স্থবির হয়ে পড়েছে, যার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ঋণের সুদহার বর্তমানে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশের ঘরে পৌঁছানোয় ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার খরচ বা 'কস্ট অব ডুইং বিজনেস' এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশীয় পণ্যগুলো এখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে। এই উচ্চ সুদের বোঝা টানতে গিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি শোচনীয়। একদিকে বেসরকারি খাত ঋণ পাচ্ছে না, অন্যদিকে সরকার তার অভ্যন্তরীণ ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করছে, যা বাজারে এক ধরণের তারল্য সংকট ও ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।

জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এই সংকটকে আরও উসকে দিয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের দাম যে হারে বাড়ানো হয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি এসে পড়েছে শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন খাতে। শিল্প-কারখানার উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় গত এক বছরে গড়ে ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্পেও এর বড় আঘাত লেগেছে, যেখানে উৎপাদন খরচ বেড়েছে অন্তত ২০ শতাংশ। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে অনেক বড় কারখানাও এখন তাদের পূর্ণ সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে যেমন বাড়ছে বেকারত্ব, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও রুদ্ধ হয়ে পড়ছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরাসরি খুচরা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে। শুধু জ্বালানি তেল নয়, গত তিন মাসে রান্নার কাজে ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে এক অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে ডিম, চাল, তেল এবং শাকসবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা; সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি এখন ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এখন সংসার চালানোই যেখানে দায় হয়ে পড়েছে, সেখানে বিলাসিতা এখন কেবল স্বপ্ন মাত্র।

সরকার যখন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদের হার বাড়াচ্ছে, অর্থনীতিবিদদের মতে তার প্রভাব সরাসরি উৎপাদনশীল খাতের ওপর পড়ছে। যখন ঋণের কিস্তি পরিশোধের খরচ মুনাফাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন উদ্যোক্তারা অনিচ্ছাকৃতভাবেই ঋণখেলাপিতে পরিণত হন। এর ফলে যেমন ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা বাড়ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি অর্জন নিয়ে বড় ধরণের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমনকি সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল দেওয়ার ঘোষণা থাকলেও বিশাল রাজস্ব ঘাটতি ও তহবিল সংকটের কারণে সরকার তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ঘাটতি থাকায় সরকার এখন উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ে নিত্যদিনের খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে।

ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, নীতি-সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবান্ধব নীতির অভাব এবং বিলাসদ্রব্য ও অপ্রয়োজনীয় বৃহৎ প্রকল্পের ব্যয়ের বোঝা অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্পের প্রসারে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। বর্তমানে উদ্যোক্তারা নতুন কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে টিকে থাকার লড়াইয়েই বেশি ব্যস্ত। সব মিলিয়ে উচ্চ সুদের হার, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির এই ত্রিমুখী চাপে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপন এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

রোববার, ১০ মে ২০২৬


সংকটে ব্যবসায়িক খাত, ব্যয়ভারে পিষ্ট সাধারণ ভোক্তা

প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬

featured Image

দেশের বর্তমান অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এক গভীর ও বহুমুখী সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে, যা দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে। উচ্চ সুদের হারের কারণে বিনিয়োগের পরিবেশ স্থবির হয়ে পড়েছে, যার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ঋণের সুদহার বর্তমানে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশের ঘরে পৌঁছানোয় ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার খরচ বা 'কস্ট অব ডুইং বিজনেস' এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশীয় পণ্যগুলো এখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে। এই উচ্চ সুদের বোঝা টানতে গিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি শোচনীয়। একদিকে বেসরকারি খাত ঋণ পাচ্ছে না, অন্যদিকে সরকার তার অভ্যন্তরীণ ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করছে, যা বাজারে এক ধরণের তারল্য সংকট ও ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।

জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এই সংকটকে আরও উসকে দিয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের দাম যে হারে বাড়ানো হয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি এসে পড়েছে শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন খাতে। শিল্প-কারখানার উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় গত এক বছরে গড়ে ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্পেও এর বড় আঘাত লেগেছে, যেখানে উৎপাদন খরচ বেড়েছে অন্তত ২০ শতাংশ। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে অনেক বড় কারখানাও এখন তাদের পূর্ণ সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে যেমন বাড়ছে বেকারত্ব, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও রুদ্ধ হয়ে পড়ছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরাসরি খুচরা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে। শুধু জ্বালানি তেল নয়, গত তিন মাসে রান্নার কাজে ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে এক অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে ডিম, চাল, তেল এবং শাকসবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা; সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি এখন ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এখন সংসার চালানোই যেখানে দায় হয়ে পড়েছে, সেখানে বিলাসিতা এখন কেবল স্বপ্ন মাত্র।

সরকার যখন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদের হার বাড়াচ্ছে, অর্থনীতিবিদদের মতে তার প্রভাব সরাসরি উৎপাদনশীল খাতের ওপর পড়ছে। যখন ঋণের কিস্তি পরিশোধের খরচ মুনাফাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন উদ্যোক্তারা অনিচ্ছাকৃতভাবেই ঋণখেলাপিতে পরিণত হন। এর ফলে যেমন ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা বাড়ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি অর্জন নিয়ে বড় ধরণের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমনকি সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল দেওয়ার ঘোষণা থাকলেও বিশাল রাজস্ব ঘাটতি ও তহবিল সংকটের কারণে সরকার তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ঘাটতি থাকায় সরকার এখন উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ে নিত্যদিনের খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে।

ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, নীতি-সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবান্ধব নীতির অভাব এবং বিলাসদ্রব্য ও অপ্রয়োজনীয় বৃহৎ প্রকল্পের ব্যয়ের বোঝা অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্পের প্রসারে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। বর্তমানে উদ্যোক্তারা নতুন কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে টিকে থাকার লড়াইয়েই বেশি ব্যস্ত। সব মিলিয়ে উচ্চ সুদের হার, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির এই ত্রিমুখী চাপে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপন এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।




দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল