দিকপাল

শরীরে এই লক্ষণগুলো দেখলেই সতর্ক হন, হতে পারে কিডনির সমস্যা



শরীরে এই লক্ষণগুলো দেখলেই সতর্ক হন, হতে পারে কিডনির সমস্যা

বর্তমান সময়ে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণে বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে কিডনি রোগীর সংখ্যা। চিকিৎসকদের মতে, কিডনি রোগের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগ অনেকটাই নীরবে শরীরে বাসা বাঁধে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে অনেকেই বুঝে ওঠার আগেই কিডনির বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন।

মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি। এটি মূলত রক্ত পরিশোধনের কাজ করে এবং শরীরের ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ যেমন ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন প্রস্রাবের মাধ্যমে বাইরে বের করে দেয়। শুধু তাই নয়, শরীরের পানি ও খনিজের ভারসাম্য রক্ষা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, হরমোন উৎপাদন এবং হাড় সুস্থ রাখতেও কিডনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই কিডনি ঠিকভাবে কাজ না করলে পুরো শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে শুরু করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শুরুতে কিছু ছোট ছোট উপসর্গ দেখা দেয়, যেগুলো অনেকেই সাধারণ শারীরিক দুর্বলতা বা অন্য রোগের লক্ষণ ভেবে এড়িয়ে যান। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা। শরীরে বিষাক্ত বর্জ্য জমতে শুরু করলে মানুষ অস্বাভাবিক দুর্বলতা অনুভব করতে পারে। অনেক সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও ক্লান্তি কাটে না।

এছাড়া পা, গোড়ালি কিংবা চোখের নিচে ফোলা দেখা দেওয়া কিডনি সমস্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। কিডনি ঠিকভাবে কাজ না করলে শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে গিয়ে এমন ফোলা ভাব তৈরি হয়। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া অথবা প্রস্রাবের রঙে পরিবর্তনও কিডনি জটিলতার ইঙ্গিত দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে প্রস্রাব ফেনাযুক্ত হয়ে যায়, যা প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন থাকার লক্ষণ হতে পারে।

ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া কিংবা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও কিডনি রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। চিকিৎসকরা বলছেন, শরীরে বিষাক্ত উপাদান জমতে থাকলে হজম প্রক্রিয়ায়ও প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত চুলকানিও কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে।

অনেক রোগী রাতে পেশিতে টান ধরা, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যার কথাও জানান। গুরুতর ক্ষেত্রে জ্বর, ঠান্ডা লাগা এবং কোমর বা পিঠের ব্যথাও দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনির ব্যথা সাধারণ কোমর ব্যথার মতো হলেও এর কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সাধারণত পিঠের নিচের অংশে বা কোমরের দুই পাশে, পাঁজরের নিচের দিকে এই ব্যথা অনুভূত হয়। অনেক সময় এটি গভীর চাপধরনের ব্যথা হয়ে থাকে এবং নিচের পেট, কুঁচকি বা উরু পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।

কিডনিতে পাথর হলে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হতে পারে, যা অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে কিডনিতে সংক্রমণ হলে ব্যথা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং সঙ্গে জ্বর বা প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

প্রস্রাবের পরিবর্তনও কিডনি রোগের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া, দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া কিংবা প্রস্রাবের রঙ লালচে বা ঘোলা হয়ে যাওয়া—এসব লক্ষণকে অবহেলা না করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি রোগ প্রতিরোধে সচেতন জীবনযাপনের বিকল্প নেই। পর্যাপ্ত পানি পান, অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা, ধূমপান ও মদ্যপান থেকে দূরে থাকা, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তারা আরও বলছেন, যদি কোমর বা পিঠের ব্যথা এক থেকে দুই দিনের বেশি স্থায়ী হয়, প্রস্রাবে রক্ত দেখা যায়, জ্বর বা ঠান্ডা লাগে কিংবা প্রস্রাবের স্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই কিডনি জটিলতা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

রোববার, ১০ মে ২০২৬


শরীরে এই লক্ষণগুলো দেখলেই সতর্ক হন, হতে পারে কিডনির সমস্যা

প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬

featured Image

বর্তমান সময়ে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণে বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে কিডনি রোগীর সংখ্যা। চিকিৎসকদের মতে, কিডনি রোগের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগ অনেকটাই নীরবে শরীরে বাসা বাঁধে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে অনেকেই বুঝে ওঠার আগেই কিডনির বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন।

মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি। এটি মূলত রক্ত পরিশোধনের কাজ করে এবং শরীরের ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ যেমন ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন প্রস্রাবের মাধ্যমে বাইরে বের করে দেয়। শুধু তাই নয়, শরীরের পানি ও খনিজের ভারসাম্য রক্ষা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, হরমোন উৎপাদন এবং হাড় সুস্থ রাখতেও কিডনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই কিডনি ঠিকভাবে কাজ না করলে পুরো শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে শুরু করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শুরুতে কিছু ছোট ছোট উপসর্গ দেখা দেয়, যেগুলো অনেকেই সাধারণ শারীরিক দুর্বলতা বা অন্য রোগের লক্ষণ ভেবে এড়িয়ে যান। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা। শরীরে বিষাক্ত বর্জ্য জমতে শুরু করলে মানুষ অস্বাভাবিক দুর্বলতা অনুভব করতে পারে। অনেক সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও ক্লান্তি কাটে না।

এছাড়া পা, গোড়ালি কিংবা চোখের নিচে ফোলা দেখা দেওয়া কিডনি সমস্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। কিডনি ঠিকভাবে কাজ না করলে শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে গিয়ে এমন ফোলা ভাব তৈরি হয়। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া অথবা প্রস্রাবের রঙে পরিবর্তনও কিডনি জটিলতার ইঙ্গিত দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে প্রস্রাব ফেনাযুক্ত হয়ে যায়, যা প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন থাকার লক্ষণ হতে পারে।

ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া কিংবা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও কিডনি রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। চিকিৎসকরা বলছেন, শরীরে বিষাক্ত উপাদান জমতে থাকলে হজম প্রক্রিয়ায়ও প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত চুলকানিও কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে।

অনেক রোগী রাতে পেশিতে টান ধরা, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যার কথাও জানান। গুরুতর ক্ষেত্রে জ্বর, ঠান্ডা লাগা এবং কোমর বা পিঠের ব্যথাও দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনির ব্যথা সাধারণ কোমর ব্যথার মতো হলেও এর কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সাধারণত পিঠের নিচের অংশে বা কোমরের দুই পাশে, পাঁজরের নিচের দিকে এই ব্যথা অনুভূত হয়। অনেক সময় এটি গভীর চাপধরনের ব্যথা হয়ে থাকে এবং নিচের পেট, কুঁচকি বা উরু পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।

কিডনিতে পাথর হলে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হতে পারে, যা অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে কিডনিতে সংক্রমণ হলে ব্যথা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং সঙ্গে জ্বর বা প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

প্রস্রাবের পরিবর্তনও কিডনি রোগের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া, দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া কিংবা প্রস্রাবের রঙ লালচে বা ঘোলা হয়ে যাওয়া—এসব লক্ষণকে অবহেলা না করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি রোগ প্রতিরোধে সচেতন জীবনযাপনের বিকল্প নেই। পর্যাপ্ত পানি পান, অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা, ধূমপান ও মদ্যপান থেকে দূরে থাকা, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তারা আরও বলছেন, যদি কোমর বা পিঠের ব্যথা এক থেকে দুই দিনের বেশি স্থায়ী হয়, প্রস্রাবে রক্ত দেখা যায়, জ্বর বা ঠান্ডা লাগে কিংবা প্রস্রাবের স্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই কিডনি জটিলতা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।




দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল