দেশের ব্যবসায়িক খাতে চলমান আর্থিক সংকট মোকাবিলা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে এক বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিদ্যমান বিশেষ নীতি সহায়তার মেয়াদ আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৭ মে) কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে এই নতুন নির্দেশনা প্রদান করা হয়, যা মূলত ২০২৫ সালে প্রবর্তিত বিশেষ নীতি সহায়তা কাঠামোরই একটি বর্ধিত ও সংশোধিত রূপ।
নতুন এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, যেসব ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তারা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত তাদের ঋণ পুনর্গঠন কিংবা বিশেষ নীতি সহায়তার জন্য ব্যাংকের কাছে আবেদন করার সুযোগ পাবেন। এর পাশাপাশি বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। তবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, যারা ইতোমধ্যে একবার এই সুবিধা গ্রহণ করেছেন কিংবা ব্যবসায়িক ও আর্থিক পুনর্গঠন কমিটির (বিআরসি) সহায়তা পেয়েছেন, তারা দ্বিতীয়বার আবেদনের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, যেসব ঋণ এখনো নিয়মিত আছে বা খেলাপি হয়নি, সেগুলো ৩০ জুনের মধ্যে বিশেষ সুবিধায় পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, যারা ইতোমধ্যে মন্দ বা খেলাপি ঋণের তালিকায় পড়েছেন, তাদের জন্য চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা রাখা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, গ্রাহকের আবেদন পাওয়ার সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে এই সময়সীমা গণনা শুরু হবে ডাউন পেমেন্টের চেক নগদায়ন বা প্রয়োজনীয় পেমেন্ট ইনস্ট্রুমেন্ট আদায়ের পর থেকে। অর্থাৎ, ডাউন পেমেন্ট জমা না দেওয়া পর্যন্ত কোনো আবেদনই কার্যকর বলে গণ্য হবে না।
বিশেষ 'এক্সিট' সুবিধা গ্রহণকারী ঋণ হিসাবগুলোর ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর তদারকির নির্দেশ দিয়েছে। এসব হিসাবকে আলাদাভাবে 'এক্সিট অ্যাকাউন্ট' হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে এবং প্রচলিত নিয়ম মেনে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত পাওনা অর্থ প্রকৃতপক্ষে আদায় না হচ্ছে, ততক্ষণ ব্যাংকগুলো আগের সংরক্ষিত প্রভিশনকে আয় হিসেবে দেখাতে পারবে না। এছাড়া শর্ত দেওয়া হয়েছে যে, ঋণের পুরো অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ঋণসীমার বাইরে নতুন করে কোনো ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে না।
আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে বড় অংকের ঋণের ক্ষেত্রে। এখন থেকে ৩০০ কোটি টাকা বা তার বেশি অংকের ঋণের নীতি সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিলেকশন কমিটির আগাম অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। ব্যাংকগুলো এখন থেকে নিজস্ব পর্যালোচনার ভিত্তিতেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, যা ঋণ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে উদ্বেগের বিষয় হলো, খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণের প্রায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। মূলত এই বিশাল অংকের খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে এবং ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিশেষ নীতি সহায়তার পথ বেছে নিয়েছে।

শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬
দেশের ব্যবসায়িক খাতে চলমান আর্থিক সংকট মোকাবিলা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে এক বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিদ্যমান বিশেষ নীতি সহায়তার মেয়াদ আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৭ মে) কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে এই নতুন নির্দেশনা প্রদান করা হয়, যা মূলত ২০২৫ সালে প্রবর্তিত বিশেষ নীতি সহায়তা কাঠামোরই একটি বর্ধিত ও সংশোধিত রূপ।
নতুন এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, যেসব ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তারা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত তাদের ঋণ পুনর্গঠন কিংবা বিশেষ নীতি সহায়তার জন্য ব্যাংকের কাছে আবেদন করার সুযোগ পাবেন। এর পাশাপাশি বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। তবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, যারা ইতোমধ্যে একবার এই সুবিধা গ্রহণ করেছেন কিংবা ব্যবসায়িক ও আর্থিক পুনর্গঠন কমিটির (বিআরসি) সহায়তা পেয়েছেন, তারা দ্বিতীয়বার আবেদনের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, যেসব ঋণ এখনো নিয়মিত আছে বা খেলাপি হয়নি, সেগুলো ৩০ জুনের মধ্যে বিশেষ সুবিধায় পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, যারা ইতোমধ্যে মন্দ বা খেলাপি ঋণের তালিকায় পড়েছেন, তাদের জন্য চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা রাখা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, গ্রাহকের আবেদন পাওয়ার সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে এই সময়সীমা গণনা শুরু হবে ডাউন পেমেন্টের চেক নগদায়ন বা প্রয়োজনীয় পেমেন্ট ইনস্ট্রুমেন্ট আদায়ের পর থেকে। অর্থাৎ, ডাউন পেমেন্ট জমা না দেওয়া পর্যন্ত কোনো আবেদনই কার্যকর বলে গণ্য হবে না।
বিশেষ 'এক্সিট' সুবিধা গ্রহণকারী ঋণ হিসাবগুলোর ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর তদারকির নির্দেশ দিয়েছে। এসব হিসাবকে আলাদাভাবে 'এক্সিট অ্যাকাউন্ট' হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে এবং প্রচলিত নিয়ম মেনে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত পাওনা অর্থ প্রকৃতপক্ষে আদায় না হচ্ছে, ততক্ষণ ব্যাংকগুলো আগের সংরক্ষিত প্রভিশনকে আয় হিসেবে দেখাতে পারবে না। এছাড়া শর্ত দেওয়া হয়েছে যে, ঋণের পুরো অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ঋণসীমার বাইরে নতুন করে কোনো ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে না।
আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে বড় অংকের ঋণের ক্ষেত্রে। এখন থেকে ৩০০ কোটি টাকা বা তার বেশি অংকের ঋণের নীতি সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিলেকশন কমিটির আগাম অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। ব্যাংকগুলো এখন থেকে নিজস্ব পর্যালোচনার ভিত্তিতেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, যা ঋণ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে উদ্বেগের বিষয় হলো, খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণের প্রায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। মূলত এই বিশাল অংকের খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে এবং ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিশেষ নীতি সহায়তার পথ বেছে নিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন