দিকপাল

বিশ্বসেরা ব্র্যান্ডগুলোর নজর কাড়তে বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে বিশাল ‘গার্মেন্টস জোন’



বিশ্বসেরা ব্র্যান্ডগুলোর নজর কাড়তে বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে বিশাল ‘গার্মেন্টস জোন’

আন্তর্জাতিক বাজারে হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার এবং বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর বড় অর্ডার আবারও বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন বহুতল ভবনভিত্তিক গার্মেন্টস জোন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রাথমিকভাবে অন্তত ২৫টি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স বা নিরাপত্তা ও মানসংক্রান্ত কঠোর শর্ত পূরণ করতেই এই বিশেষ জোন তৈরি করা হবে। নতুন প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ভবনে থাকবে পর্যাপ্ত ফ্লোর স্পেস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, গ্যাস সংযোগ, জেনারেটর সুবিধা, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা অবকাঠামো। ইতোমধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাছে জমি বরাদ্দ চেয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদনও করা হয়েছে।

জানা গেছে, মুরাদপুর, বায়েজিদ, বহদ্দারহাট ও আগ্রাবাদ এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এই গার্মেন্টস জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি বহুতল ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে একটি করে কারখানা পরিচালিত হবে। মূল লক্ষ্য হলো ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের একই অবকাঠামোর মধ্যে এনে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে বড় বড় বিদেশি ব্র্যান্ড সহজেই বাংলাদেশে অর্ডার দিতে আগ্রহী হয়।

বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, ভবনগুলো বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণ করে নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি কারখানার জন্য আলাদা করে বিদ্যুৎ বা জেনারেটর স্থাপন করতে হবে না; বরং সব কমন সুবিধার ব্যয় অংশীদার ভিত্তিতে বহন করা হবে। এতে উদ্যোক্তাদের খরচ অনেক কমে আসবে। বর্তমানে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ বছরের সফট লোনের ব্যবস্থাও করা হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক যুক্ত হলে ঋণের মেয়াদ ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তারা কারখানা পরিচালনার পাশাপাশি ধীরে ধীরে ভবনের মালিকানাও অর্জন করতে পারবেন। ভাড়ার অর্থ ডাউন পেমেন্টের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্দিষ্ট সময় পর ভবনের ফ্লোর উদ্যোক্তার নিজস্ব সম্পদে পরিণত হবে। এতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য শিল্পে প্রবেশের পথ সহজ হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ছয়তলা ভবনে কমপক্ষে ৩০ হাজার বর্গফুট কর্মপরিসর থাকবে। প্রতিটি কারখানায় ৬০০ থেকে ১ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিজিএমইএ বলছে, প্রতিটি জোনের জন্য ৩ থেকে ৫ একর জমি প্রয়োজন হবে এবং সেই হিসেবেই জমি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মো. রফিক চৌধুরী বলেন, বর্তমানে অনেক ছোট কারখানা আন্তর্জাতিক বড় ব্র্যান্ডের কাজ পাওয়ার মতো সক্ষমতা রাখে না। কিন্তু একই অবকাঠামোর মধ্যে পাঁচ থেকে সাতটি কারখানা একত্রিত হলে উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। এতে বড় অর্ডার নেওয়া সহজ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সুযোগও বাড়বে। তিনি জানান, বর্তমানে যেখানে ৩০০ কারখানা সক্রিয় রয়েছে, ভবিষ্যতে তা ৫০০ থেকে ৭০০ কারখানায় উন্নীত করা সম্ভব হতে পারে।

একসময় দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মূল কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। স্বাধীনতার পর এখান থেকেই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু নানা সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগের অভাবে গত চার দশকে চট্টগ্রামের অংশীদারিত্ব ৪০ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে প্রায় ২০০ কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, যা এই শিল্পখাতের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।

বিজিএমইএর পরিচালক এমডি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক হওয়ায় রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এটি এখনও দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অঞ্চল। বর্তমানে দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ১০ থেকে ১২ শতাংশ আসে চট্টগ্রাম থেকে। সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এই অংশীদারিত্ব আবারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

বর্তমানে চট্টগ্রামে দুটি ইপিজেডসহ বিভিন্ন এলাকায় চার শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় সরাসরি প্রায় আট লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় চট্টগ্রাম থেকে। নতুন গার্মেন্টস জোন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এই খাত আবারও দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

রোববার, ১০ মে ২০২৬


বিশ্বসেরা ব্র্যান্ডগুলোর নজর কাড়তে বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে বিশাল ‘গার্মেন্টস জোন’

প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬

featured Image

আন্তর্জাতিক বাজারে হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার এবং বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর বড় অর্ডার আবারও বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন বহুতল ভবনভিত্তিক গার্মেন্টস জোন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রাথমিকভাবে অন্তত ২৫টি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স বা নিরাপত্তা ও মানসংক্রান্ত কঠোর শর্ত পূরণ করতেই এই বিশেষ জোন তৈরি করা হবে। নতুন প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ভবনে থাকবে পর্যাপ্ত ফ্লোর স্পেস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, গ্যাস সংযোগ, জেনারেটর সুবিধা, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা অবকাঠামো। ইতোমধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাছে জমি বরাদ্দ চেয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদনও করা হয়েছে।

জানা গেছে, মুরাদপুর, বায়েজিদ, বহদ্দারহাট ও আগ্রাবাদ এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এই গার্মেন্টস জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি বহুতল ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে একটি করে কারখানা পরিচালিত হবে। মূল লক্ষ্য হলো ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের একই অবকাঠামোর মধ্যে এনে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে বড় বড় বিদেশি ব্র্যান্ড সহজেই বাংলাদেশে অর্ডার দিতে আগ্রহী হয়।

বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, ভবনগুলো বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণ করে নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি কারখানার জন্য আলাদা করে বিদ্যুৎ বা জেনারেটর স্থাপন করতে হবে না; বরং সব কমন সুবিধার ব্যয় অংশীদার ভিত্তিতে বহন করা হবে। এতে উদ্যোক্তাদের খরচ অনেক কমে আসবে। বর্তমানে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ বছরের সফট লোনের ব্যবস্থাও করা হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক যুক্ত হলে ঋণের মেয়াদ ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তারা কারখানা পরিচালনার পাশাপাশি ধীরে ধীরে ভবনের মালিকানাও অর্জন করতে পারবেন। ভাড়ার অর্থ ডাউন পেমেন্টের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্দিষ্ট সময় পর ভবনের ফ্লোর উদ্যোক্তার নিজস্ব সম্পদে পরিণত হবে। এতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য শিল্পে প্রবেশের পথ সহজ হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ছয়তলা ভবনে কমপক্ষে ৩০ হাজার বর্গফুট কর্মপরিসর থাকবে। প্রতিটি কারখানায় ৬০০ থেকে ১ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিজিএমইএ বলছে, প্রতিটি জোনের জন্য ৩ থেকে ৫ একর জমি প্রয়োজন হবে এবং সেই হিসেবেই জমি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মো. রফিক চৌধুরী বলেন, বর্তমানে অনেক ছোট কারখানা আন্তর্জাতিক বড় ব্র্যান্ডের কাজ পাওয়ার মতো সক্ষমতা রাখে না। কিন্তু একই অবকাঠামোর মধ্যে পাঁচ থেকে সাতটি কারখানা একত্রিত হলে উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। এতে বড় অর্ডার নেওয়া সহজ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সুযোগও বাড়বে। তিনি জানান, বর্তমানে যেখানে ৩০০ কারখানা সক্রিয় রয়েছে, ভবিষ্যতে তা ৫০০ থেকে ৭০০ কারখানায় উন্নীত করা সম্ভব হতে পারে।

একসময় দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মূল কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। স্বাধীনতার পর এখান থেকেই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু নানা সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগের অভাবে গত চার দশকে চট্টগ্রামের অংশীদারিত্ব ৪০ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে প্রায় ২০০ কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, যা এই শিল্পখাতের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।

বিজিএমইএর পরিচালক এমডি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক হওয়ায় রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এটি এখনও দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অঞ্চল। বর্তমানে দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ১০ থেকে ১২ শতাংশ আসে চট্টগ্রাম থেকে। সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এই অংশীদারিত্ব আবারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

বর্তমানে চট্টগ্রামে দুটি ইপিজেডসহ বিভিন্ন এলাকায় চার শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় সরাসরি প্রায় আট লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় চট্টগ্রাম থেকে। নতুন গার্মেন্টস জোন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এই খাত আবারও দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।




দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল