প্রকৃতি ও পর্যটনের সেতুবন্ধন হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি এখন সাধারণ যাত্রী ও চালকদের কাছে এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা আর পরিকল্পনার অভাবে এই সড়কটি এখন কার্যত এক ‘মরণ ফাঁদে’ রূপ নিয়েছে। গত এক বছরে এই রুটে সড়ক দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যা এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার এক করুণ চিত্র তুলে ধরে। সবশেষ গত শনিবার লোহাগাড়ার ‘ফোর সিজন’ রেস্টুরেন্টের সামনে দুটি বাসের ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫ জন নিহিত এবং অন্তত ২৫ জন যাত্রী গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাটি এই মহাসড়কের নিরাপত্তাহীনতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
সড়কটির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাই এখানে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। দুই লেনের এই সরু মহাসড়কে নেই কোনো বিভাজক, তার ওপর যোগ হয়েছে অর্ধশতাধিক বিপদজনক ও খাড়া বাঁক। বিশেষ করে কর্ণফুলী সেতু থেকে চন্দনাইশের দোহাজারী পর্যন্ত মাত্র ৪৫ কিলোমিটার পথেই রয়েছে প্রায় ৫০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। পুলিশের তথ্যমতে, চুনতি থেকে চকরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ১১৫ কিলোমিটারের অংশটি সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ। ঐতিহাসিক এক ট্র্যাজেডিও এই জনপদে মিশে আছে; চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া কলেজের কাছের একটি বাঁকেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের সহধর্মিণী জাহানারা কাঞ্চন, যার স্মরণে পরবর্তীতে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন গড়ে ওঠে। অথচ এত বছর পার হলেও পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
দুর্ঘটনার নেপথ্যে কেবল সড়কের বাঁকগুলোই দায়ী নয়; বরং প্রশিক্ষণহীন চালক, ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন, বেপরোয়া গতিতে ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতাও এখানে সমানভাবে দায়ী। পটিয়া মইজ্জার টেক থেকে শুরু করে চন্দনাইশ ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন পয়েন্ট যেমন—মনসার টেক, আমজুরহাট, কমলমুন্সির হাট ও চুনতি এলাকায় প্রায়শই রক্তের দাগ লাগছে। গত বছরের এপ্রিলে চুনতি এলাকায় একই পরিবারের পাঁচজনসহ ১২ জন নিহতের ঘটনাটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি। চলতি বছরের শুরু থেকেই এই মৃত্যুমিছিল যেন আরও দীর্ঘ হচ্ছে। পটিয়া ও সাতকানিয়া অংশেও একের পর এক দুর্ঘটনায় দম্পতি থেকে শুরু করে মোটরসাইকেল আরোহী—সবাইকে অকালে প্রাণ দিতে হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণ ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা এই মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এই দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে। সড়ক বিভাগ কয়েক বছর আগে বাঁক সোজাকরণের একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠালেও সেটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে একদিকে যেমন পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সড়কে লাশের সারি দীর্ঘতর হচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সড়কটি কেবল পর্যটকদের নয়, বরং পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর জন্যই স্থায়ী এক বিভীষিকা হয়ে থাকবে।

সোমবার, ১১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬
প্রকৃতি ও পর্যটনের সেতুবন্ধন হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি এখন সাধারণ যাত্রী ও চালকদের কাছে এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা আর পরিকল্পনার অভাবে এই সড়কটি এখন কার্যত এক ‘মরণ ফাঁদে’ রূপ নিয়েছে। গত এক বছরে এই রুটে সড়ক দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যা এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার এক করুণ চিত্র তুলে ধরে। সবশেষ গত শনিবার লোহাগাড়ার ‘ফোর সিজন’ রেস্টুরেন্টের সামনে দুটি বাসের ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫ জন নিহিত এবং অন্তত ২৫ জন যাত্রী গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাটি এই মহাসড়কের নিরাপত্তাহীনতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
সড়কটির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাই এখানে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। দুই লেনের এই সরু মহাসড়কে নেই কোনো বিভাজক, তার ওপর যোগ হয়েছে অর্ধশতাধিক বিপদজনক ও খাড়া বাঁক। বিশেষ করে কর্ণফুলী সেতু থেকে চন্দনাইশের দোহাজারী পর্যন্ত মাত্র ৪৫ কিলোমিটার পথেই রয়েছে প্রায় ৫০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। পুলিশের তথ্যমতে, চুনতি থেকে চকরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ১১৫ কিলোমিটারের অংশটি সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ। ঐতিহাসিক এক ট্র্যাজেডিও এই জনপদে মিশে আছে; চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া কলেজের কাছের একটি বাঁকেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের সহধর্মিণী জাহানারা কাঞ্চন, যার স্মরণে পরবর্তীতে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন গড়ে ওঠে। অথচ এত বছর পার হলেও পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
দুর্ঘটনার নেপথ্যে কেবল সড়কের বাঁকগুলোই দায়ী নয়; বরং প্রশিক্ষণহীন চালক, ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন, বেপরোয়া গতিতে ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতাও এখানে সমানভাবে দায়ী। পটিয়া মইজ্জার টেক থেকে শুরু করে চন্দনাইশ ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন পয়েন্ট যেমন—মনসার টেক, আমজুরহাট, কমলমুন্সির হাট ও চুনতি এলাকায় প্রায়শই রক্তের দাগ লাগছে। গত বছরের এপ্রিলে চুনতি এলাকায় একই পরিবারের পাঁচজনসহ ১২ জন নিহতের ঘটনাটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি। চলতি বছরের শুরু থেকেই এই মৃত্যুমিছিল যেন আরও দীর্ঘ হচ্ছে। পটিয়া ও সাতকানিয়া অংশেও একের পর এক দুর্ঘটনায় দম্পতি থেকে শুরু করে মোটরসাইকেল আরোহী—সবাইকে অকালে প্রাণ দিতে হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণ ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা এই মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এই দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে। সড়ক বিভাগ কয়েক বছর আগে বাঁক সোজাকরণের একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠালেও সেটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে একদিকে যেমন পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সড়কে লাশের সারি দীর্ঘতর হচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সড়কটি কেবল পর্যটকদের নয়, বরং পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর জন্যই স্থায়ী এক বিভীষিকা হয়ে থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন