দিকপাল

সেবা সংস্থার সমন্বয়হীনতা অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়িতে স্থবির জনজীবন


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ১১ মে ২০২৬ | ১২:২৬ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

সেবা সংস্থার সমন্বয়হীনতা অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়িতে স্থবির জনজীবন

রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেদিকেই চোখ যায়, নাগরিক জীবনের এক চরম দুর্বিষহ চিত্র ফুটে ওঠে। কোথাও উন্নয়নের দোহাই দিয়ে মাসের পর মাস রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও সড়কের অর্ধেকটা দখল করে স্তূপ করে রাখা হয়েছে মাটি, বালু আর ভারী নির্মাণসামগ্রী। শুষ্ক মৌসুমে ধুলোর আস্তরণে ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ, আর সামান্য বৃষ্টিতেই সেই সড়কগুলো হয়ে উঠছে কর্দমাক্ত মরণফাঁদ। ঢাকার ধানমণ্ডি, উত্তরা, বারিধারা থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুর ও বসিলার মতো এলাকাগুলোতে অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন এই খোঁড়াখুঁড়ি এখন নগরবাসীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে। যানজট এখন আর কেবল মূল সড়কেই সীমাবদ্ধ নেই, অলিগলি পর্যন্ত বিস্তৃত এই স্থবিরতা মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ভোগান্তি নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, উত্তরা ও ধানমণ্ডির মতো অভিজাত এলাকাগুলোতেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। কোথাও ড্রেনেজ লাইন, কোথাও ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল আবার কোথাও মেটোররেলের দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের কাজ চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, সিটি করপোরেশনকে বারবার তাগাদা দিয়েও ভাঙাচোরা রাস্তা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ পাওয়া যায়নি। বরং সড়কের দুই পাশে অবৈধ পার্কিং আর যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা স্থবির হয়ে পড়ছে। ১৩ ও ১৭ নম্বর সেক্টরের অবস্থাও তথৈবচ; সেখানে ড্রেনের ঢাকনা না থাকা এবং সড়কবাতির অভাবে অপরাধীদের আনাগোনা বাড়ছে বলে স্থানীয়রা আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন।

বারিধারা ও নতুনবাজার এলাকায় এমআরটি লাইন-১ এবং লাইন-৫-এর কাজ একসঙ্গে চলায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো এখন চলাচলের অনুপযোগী। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রাস্তা কাটার ফলে কাস্টমারদের গাড়ি দাঁড়ানোর জায়গা নেই, যার ফলে ব্যবসা এখন লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছে। ড্রেনেজ পাইপ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ লাইন স্থানান্তরের দীর্ঘসূত্রতাকে এর জন্য দায়ী করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ ও বসিলার মতো ক্রমবর্ধমান এলাকাগুলোতে গত চার-পাঁচ মাস ধরে রাস্তা খুঁড়ে রাখায় প্রবীণ ও শিশুদের চলাচলের কোনো উপায় নেই। বাসিন্দারা নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স দিলেও নাগরিক সেবা না পাওয়ার কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক সোসাইটিগুলোই নিজেদের উদ্যোগে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যা মূলত সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ছিল।

ধানমণ্ডি সোসাইটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, একাধিকবার সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত কোনো অগ্রগতি হয়নি। সড়ক কাটার পর তা যথাযথভাবে সংস্কার না করায় এবং এক সংস্থা কাজ শেষ করার পরপরই আরেক সংস্থা নতুন করে মাটি খুঁড়তে আসায় সরকারি অর্থের অপচয় যেমন হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। এই সমন্বয়হীনতাকে ‘উন্নয়নের অভিশাপ’ হিসেবে দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান এই ভোগান্তির কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, তিতাস, ওয়াসা বা ডিপিডিসির মতো সেবা সংস্থাগুলোর বড় প্রকল্পের কারণেই মূলত এই জটিলতা তৈরি হয়। তবে রাজস্বের সীমাবদ্ধতার কারণে সব এলাকায় একসাথে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এখন থেকে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে রাস্তা কাটার অনুমতি দেওয়া এবং ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’-এর মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট কাটছে না। ঢাকার রাজপথ থেকে অলিগলি পর্যন্ত বিস্তৃত এই খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব কবে থামবে, সেই উত্তর এখন কোটি নগরবাসীর মুখে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১১ মে ২০২৬


সেবা সংস্থার সমন্বয়হীনতা অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়িতে স্থবির জনজীবন

প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬

featured Image

রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেদিকেই চোখ যায়, নাগরিক জীবনের এক চরম দুর্বিষহ চিত্র ফুটে ওঠে। কোথাও উন্নয়নের দোহাই দিয়ে মাসের পর মাস রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও সড়কের অর্ধেকটা দখল করে স্তূপ করে রাখা হয়েছে মাটি, বালু আর ভারী নির্মাণসামগ্রী। শুষ্ক মৌসুমে ধুলোর আস্তরণে ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ, আর সামান্য বৃষ্টিতেই সেই সড়কগুলো হয়ে উঠছে কর্দমাক্ত মরণফাঁদ। ঢাকার ধানমণ্ডি, উত্তরা, বারিধারা থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুর ও বসিলার মতো এলাকাগুলোতে অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন এই খোঁড়াখুঁড়ি এখন নগরবাসীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে। যানজট এখন আর কেবল মূল সড়কেই সীমাবদ্ধ নেই, অলিগলি পর্যন্ত বিস্তৃত এই স্থবিরতা মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ভোগান্তি নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, উত্তরা ও ধানমণ্ডির মতো অভিজাত এলাকাগুলোতেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। কোথাও ড্রেনেজ লাইন, কোথাও ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল আবার কোথাও মেটোররেলের দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের কাজ চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, সিটি করপোরেশনকে বারবার তাগাদা দিয়েও ভাঙাচোরা রাস্তা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ পাওয়া যায়নি। বরং সড়কের দুই পাশে অবৈধ পার্কিং আর যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা স্থবির হয়ে পড়ছে। ১৩ ও ১৭ নম্বর সেক্টরের অবস্থাও তথৈবচ; সেখানে ড্রেনের ঢাকনা না থাকা এবং সড়কবাতির অভাবে অপরাধীদের আনাগোনা বাড়ছে বলে স্থানীয়রা আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন।

বারিধারা ও নতুনবাজার এলাকায় এমআরটি লাইন-১ এবং লাইন-৫-এর কাজ একসঙ্গে চলায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো এখন চলাচলের অনুপযোগী। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রাস্তা কাটার ফলে কাস্টমারদের গাড়ি দাঁড়ানোর জায়গা নেই, যার ফলে ব্যবসা এখন লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছে। ড্রেনেজ পাইপ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ লাইন স্থানান্তরের দীর্ঘসূত্রতাকে এর জন্য দায়ী করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ ও বসিলার মতো ক্রমবর্ধমান এলাকাগুলোতে গত চার-পাঁচ মাস ধরে রাস্তা খুঁড়ে রাখায় প্রবীণ ও শিশুদের চলাচলের কোনো উপায় নেই। বাসিন্দারা নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স দিলেও নাগরিক সেবা না পাওয়ার কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক সোসাইটিগুলোই নিজেদের উদ্যোগে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যা মূলত সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ছিল।

ধানমণ্ডি সোসাইটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, একাধিকবার সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত কোনো অগ্রগতি হয়নি। সড়ক কাটার পর তা যথাযথভাবে সংস্কার না করায় এবং এক সংস্থা কাজ শেষ করার পরপরই আরেক সংস্থা নতুন করে মাটি খুঁড়তে আসায় সরকারি অর্থের অপচয় যেমন হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। এই সমন্বয়হীনতাকে ‘উন্নয়নের অভিশাপ’ হিসেবে দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান এই ভোগান্তির কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, তিতাস, ওয়াসা বা ডিপিডিসির মতো সেবা সংস্থাগুলোর বড় প্রকল্পের কারণেই মূলত এই জটিলতা তৈরি হয়। তবে রাজস্বের সীমাবদ্ধতার কারণে সব এলাকায় একসাথে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এখন থেকে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে রাস্তা কাটার অনুমতি দেওয়া এবং ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’-এর মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট কাটছে না। ঢাকার রাজপথ থেকে অলিগলি পর্যন্ত বিস্তৃত এই খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব কবে থামবে, সেই উত্তর এখন কোটি নগরবাসীর মুখে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল