মার্কিন বাজারে দুর্বল রপ্তানি, চাপ বাড়ছে পোশাক শিল্পে
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের আধিপত্যে বড় ধরনের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক বাণিজ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। এর পেছনে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘রিসিপ্রোকাল’ বা পারস্পরিক শুল্কনীতিকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে শুল্কনীতির বাইরেও মার্কিন বাজারে ভোক্তাদের চাহিদা কমে যাওয়া, উচ্চ সুদের হার এবং বিশ্ব অর্থনীতির নানামুখী অস্থিরতা এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।উদ্বেগের বিষয় হলো, যখন ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো মার্কিন বাজারে তাদের প্রবৃদ্ধির ধারা কমবেশি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে, তখন বাংলাদেশের রপ্তানি পরিস্থিতি নিম্নমুখী। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের টেক্সটাইল ও পোশাক দপ্তরের (অটেক্সা) তথ্যমতে, কেবল রপ্তানির পরিমাণই কমেনি, বরং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন বাংলাদেশি পোশাকের জন্য আগের চেয়ে কম দাম দিচ্ছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.০৮ শতাংশ কমে ৬৬ কোটি ৪৯ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিকভাবে বছরের প্রথম তিন মাসে এই পতনের হার ৮.৩৮ শতাংশ।[TECHTARANGA-POST:531]বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এই পরিস্থিতির গভীরতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান যে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে এখন এক ধরনের চরম অনিশ্চয়তা কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা, জ্বালানি সংকট এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে রপ্তানি খাতের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ক্রেতারা এখন দীর্ঘমেয়াদি বড় অর্ডারের বদলে ছোট ও স্বল্পমেয়াদি অর্ডারের দিকে ঝুঁকছেন, যা বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ভিয়েতনাম প্রথম প্রান্তিকে ২.৭৭ শতাংশ এবং কম্বোডিয়া ১৭.৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অথচ একই সময়ে বাংলাদেশের গড় ইউনিট মূল্য বা প্রতিটি পোশাকের দাম প্রায় ২.৫৬ শতাংশ কমে গেছে। রপ্তানি ভলিউমের দিক থেকেও বাংলাদেশ প্রায় ৫.৯৭ শতাংশ পিছিয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও ভারতও বড় ধরনের পতনের মুখে থাকলেও ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য সতর্কসংকেত।[TECHTARANGA-POST:555]শিল্পোদ্যোক্তারা মনে করছেন, টিকে থাকতে হলে এখন শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, বরং উচ্চমূল্যের ফ্যাশন এবং টেকনিক্যাল টেক্সটাইল খাতে প্রবেশ করা জরুরি। বিজিএমইএ-র প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান মনে করেন, এলডিসি-পরবর্তী উত্তরণ এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি ও বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি বিজিএমইএ-র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, চীন বাজার থেকে সরে যাওয়ায় যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য আনয়ন এখন সময়ের দাবি।যদিও ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ৩০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তবে বিশেষজ্ঞরা একে কৃত্রিম মনে করছেন। কারণ ২০২৫ সালের এপ্রিলে ঈদুল ফিতর এবং নতুন শুল্কনীতির কারণে রপ্তানি অস্বাভাবিকভাবে কম ছিল, যার ফলে এবারে তুলনামূলকভাবে বড় প্রবৃদ্ধি দৃশ্যমান হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটিয়ে উঠতে বন্দর সক্ষমতা বাড়ানো, লিড টাইম কমানো এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। সর্বোপরি, এককভাবে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভর না করে মধ্যপ্রাচ্য, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো নতুন বাজারগুলোতে মনোযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ মহল।