আইএমএফের শর্তের বিপরীতে ভর্তুকিতে ঝুঁকছে সরকার
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পক্ষ থেকে ভর্তুকি কমিয়ে আনার বিষয়ে তীব্র চাপ থাকা সত্ত্বেও, বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনার বোঝা আরও বাড়ানোর পথে হাঁটছে সরকার। ২০২৩ সালের শুরুতে যখন আইএমএফের কাছ থেকে বড় অংকের ঋণচুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি ক্রমান্বয়ে শূন্যে নামিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা; প্রতিবছরই এই খাতে বরাদ্দের পরিমাণ কমবেশি বেড়েই চলেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের একটি প্রাথমিক খসড়া তৈরি করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।[TECHTARANGA-POST:558]অর্থ বিভাগের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার ফলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে যে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, তা সামাল দিতে হলে বাড়তি ভর্তুকি দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। বিশেষ করে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় থাকা ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগগুলো সচল রাখতেও বড় অংকের অর্থের প্রয়োজন। যদিও ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী এভাবে ঢালাও ভর্তুকি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, তবুও সরকার বর্তমানে জনস্বার্থ ও খাদ্য নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। উল্লেখ্য যে, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে।আইএমএফের সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার থাকলেও সরকার কেবল জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি চালু করতে পেরেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা; উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্রিডে যুক্ত হওয়ার ফলে এ খাতে ভর্তুকির চাপ কমাতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আগামী বাজেটেও বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় অংকের অর্থাৎ ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির আকাশচুম্বী দামের কারণে স্পট মার্কেট থেকে চড়া মূল্যে গ্যাস কিনতে গিয়ে সরকারকে বিশাল অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে, যা সামাল দিতে আগামী বাজেটে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা রাখা হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:494]কৃষি খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার আমদানিতেও সরকার বিশাল অংকের ভর্তুকি অব্যাহত রাখছে। আগামী অর্থবছরে সারের জন্য মোট ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে কৃষকের ওপর বাড়তি দামের বোঝা চেপে না বসে। এছাড়া নিচু আয়ের মানুষের জন্য ওএমএস এবং টিসিবির খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম বছরজুড়ে সচল রাখতে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। রপ্তানি ধরে রাখা এবং প্রবাসীদের রেমিট্যান্স উৎসাহিত করতেও কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হতে পারে।এই সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকি কমানো অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলেও বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠবে। তার মতে, আইএমএফের শর্তের চেয়ে বর্তমানের জনকল্যাণ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের মতে, ভর্তুকি বাড়ানোর চেয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা, সিস্টেম লস ও দুর্নীতি বন্ধ করা বেশি জরুরি। এই খাতের অনিয়ম রোধ করতে পারলে ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশেই কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।