আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া। একসময় শিশুদের হাতে যেখানে রঙিন গল্পের বই শোভা পেত, আজ সেখানে জায়গা করে নিয়েছে স্মার্ট ডিভাইস। অনেক অভিভাবক নিজেদের ব্যস্ততা এড়াতে বা শিশুকে শান্ত রাখতে স্মার্টফোন হাতে তুলে দিচ্ছেন, যা পরবর্তীকালে এক প্রাণঘাতী আসক্তিতে রূপ নিচ্ছে। এই ডিজিটাল আসক্তি কেবল শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা দিচ্ছে না, বরং তাদের ঠেলে দিচ্ছে শারীরিক জটিলতা, অনিদ্রা এবং চরম বিষণ্নতার দিকে। কিশোর বয়সে এই আসক্তি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে; অশ্লীল কনটেন্ট এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার তাদের ইভ টিজিং, সহিংসতা এবং কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধের পথে পরিচালিত করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ‘কিশোর গ্যাং’ কালচারের মূলে রয়েছে এই তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার। পুলিশি তথ্য এবং গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেসবুক, মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ খুলে মুহূর্তের মধ্যে সংবদ্ধ হয়ে হামলা, ভাঙচুর ও খুনের মতো নৃশংস ঘটনা ঘটাচ্ছে কিশোররা। গত এক বছরে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে অন্তত ২০৯টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে, যা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার ভঙ্গুর দশাকেই ফুটিয়ে তোলে। এছাড়া গবেষণায় উঠে এসেছে যে, অনলাইনে কিশোরীদের যৌন নিপীড়ন, ব্ল্যাকমেইল এবং বাল্যবিবাহ বৃদ্ধির পেছনেও এই অনিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্মগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে।
এই সমস্যাটি এখন আর কেবল বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে এক মহামারীর আকার ধারণ করেছে। এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বিশ্বের অনেক দেশই শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ডেনমার্কও একই ধরণের পদক্ষেপ নেওয়ার পথে রয়েছে। অন্যদিকে চীন শিশুদের স্ক্রিন টাইম দৈনিক মাত্র ৪০ মিনিটে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে এবং রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ডিজিটাল এক্সেস সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও মেটা, টিকটক ও ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় যুদ্ধকালীন তৎপরতা চালাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের উদাসীনতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ট্রিলিয়ন ডলারের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে যেসব টেক কোম্পানি শিশুদের মনোযোগ আটকে রেখে মুনাফা লুটছে, তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার সময় এসেছে। শুধু মা-বাবার তদারকির ওপর ভরসা করে বসে থাকলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়; কারণ একটি সাধারণ পরিবারের পক্ষে জটিল অ্যালগরিদমের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া অসম্ভব। তাই এক মুহূর্ত দেরি না করে এখনই সোশ্যাল মিডিয়াকে একটি সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। আমাদের শিশু-কিশোরদের জীবনী শক্তি আর সুন্দর ভবিষ্যৎ রক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় আমরা এক মেধাহীন ও লক্ষ্যভ্রষ্ট প্রজন্মের দিকে ধাবিত হব।

রোববার, ০৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬
আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া। একসময় শিশুদের হাতে যেখানে রঙিন গল্পের বই শোভা পেত, আজ সেখানে জায়গা করে নিয়েছে স্মার্ট ডিভাইস। অনেক অভিভাবক নিজেদের ব্যস্ততা এড়াতে বা শিশুকে শান্ত রাখতে স্মার্টফোন হাতে তুলে দিচ্ছেন, যা পরবর্তীকালে এক প্রাণঘাতী আসক্তিতে রূপ নিচ্ছে। এই ডিজিটাল আসক্তি কেবল শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা দিচ্ছে না, বরং তাদের ঠেলে দিচ্ছে শারীরিক জটিলতা, অনিদ্রা এবং চরম বিষণ্নতার দিকে। কিশোর বয়সে এই আসক্তি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে; অশ্লীল কনটেন্ট এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার তাদের ইভ টিজিং, সহিংসতা এবং কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধের পথে পরিচালিত করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ‘কিশোর গ্যাং’ কালচারের মূলে রয়েছে এই তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার। পুলিশি তথ্য এবং গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফেসবুক, মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ খুলে মুহূর্তের মধ্যে সংবদ্ধ হয়ে হামলা, ভাঙচুর ও খুনের মতো নৃশংস ঘটনা ঘটাচ্ছে কিশোররা। গত এক বছরে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে অন্তত ২০৯টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে, যা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার ভঙ্গুর দশাকেই ফুটিয়ে তোলে। এছাড়া গবেষণায় উঠে এসেছে যে, অনলাইনে কিশোরীদের যৌন নিপীড়ন, ব্ল্যাকমেইল এবং বাল্যবিবাহ বৃদ্ধির পেছনেও এই অনিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্মগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে।
এই সমস্যাটি এখন আর কেবল বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে এক মহামারীর আকার ধারণ করেছে। এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বিশ্বের অনেক দেশই শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ডেনমার্কও একই ধরণের পদক্ষেপ নেওয়ার পথে রয়েছে। অন্যদিকে চীন শিশুদের স্ক্রিন টাইম দৈনিক মাত্র ৪০ মিনিটে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে এবং রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ডিজিটাল এক্সেস সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও মেটা, টিকটক ও ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় যুদ্ধকালীন তৎপরতা চালাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের উদাসীনতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ট্রিলিয়ন ডলারের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে যেসব টেক কোম্পানি শিশুদের মনোযোগ আটকে রেখে মুনাফা লুটছে, তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার সময় এসেছে। শুধু মা-বাবার তদারকির ওপর ভরসা করে বসে থাকলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়; কারণ একটি সাধারণ পরিবারের পক্ষে জটিল অ্যালগরিদমের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া অসম্ভব। তাই এক মুহূর্ত দেরি না করে এখনই সোশ্যাল মিডিয়াকে একটি সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। আমাদের শিশু-কিশোরদের জীবনী শক্তি আর সুন্দর ভবিষ্যৎ রক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় আমরা এক মেধাহীন ও লক্ষ্যভ্রষ্ট প্রজন্মের দিকে ধাবিত হব।

আপনার মতামত লিখুন