দিকপাল

রক্তাক্ত শাপলা চত্বর অবশেষে মিলল ৩২ জন নিহতের চাঞ্চল্যকর প্রমাণ



রক্তাক্ত শাপলা চত্বর অবশেষে মিলল ৩২ জন নিহতের চাঞ্চল্যকর প্রমাণ

২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী অভিযানের স্মৃতি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অমীমাংসিত অধ্যায় হয়ে ছিল। দীর্ঘ ১৩ বছর পর সেই ঘটনার তদন্তে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর সব নতুন তথ্য। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম (বা সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউশন সূত্র) জানিয়েছেন, তদন্তের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র ঢাকাতেই ৩২ জনকে হত্যার সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ পাওয়া গেছে। রোববার (৩ মে) সকালে নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আলাপকালে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা জানান।

ঘটনার প্রেক্ষাপট স্মরণ করলে দেখা যায়, তৎকালীন সময়ে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এবং বিতর্কিত নারী নীতিসহ ১৩ দফা দাবিতে ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছিল। ৫ মে দিনভর চলা উত্তেজনা ও ব্যাপক সহিংসতার পর রাতে পুলিশ, র‍্যাব ও তৎকালীন বিজিবির সমন্বয়ে পরিচালিত এক যৌথ অভিযানে শাপলা চত্বর থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই রাতের অভিযান নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা বিতর্ক ও নিহতের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও বর্তমানে নতুন করে শুরু হওয়া তদন্তে সেই সত্যগুলো বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

চিফ প্রসিকিউটরের দেওয়া তথ্যমতে, শাপলা চত্বরের সেই অভিযানে যে ৩২ জন প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রসিকিউশন টিম সংগ্রহ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই নিহতের সংখ্যা শুধুমাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক। এর বাইরেও চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে একই সময়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দালিলিক প্রমাণ তাদের হাতে এসেছে। মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, তদন্তের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজটুকুও দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য কাজ চলছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন হাতে আসার পর সেটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আকারে দাখিল করা হবে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই মামলার তদন্তে কেবল মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরই নয়, বরং নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের ব্যক্তিদেরও আওতায় আনা হচ্ছে। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, সে সময়ের সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং যারা এই অভিযানে অর্থের জোগান দিয়েছিলেন, তাদের প্রত্যেককেই আইনের মুখোমুখি করা হবে। ইতিমধ্যে এই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক ও বেনজীর আহমেদ, র‍্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান এবং ডিএমপির সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদসহ বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।

বর্তমানে এই মামলার সাথে সংশ্লিষ্ট ছয়জন আসামি কারাগারে আটক রয়েছেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক এবং শাহরিয়ার কবিরের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। গত ৫ এপ্রিল তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল এবং আগামী ৭ জুন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল। দীর্ঘ সময় পর শুরু হওয়া এই আইনি প্রক্রিয়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মনে ন্যায়বিচারের আশা নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

রোববার, ০৩ মে ২০২৬


রক্তাক্ত শাপলা চত্বর অবশেষে মিলল ৩২ জন নিহতের চাঞ্চল্যকর প্রমাণ

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬

featured Image

২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী অভিযানের স্মৃতি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অমীমাংসিত অধ্যায় হয়ে ছিল। দীর্ঘ ১৩ বছর পর সেই ঘটনার তদন্তে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর সব নতুন তথ্য। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম (বা সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউশন সূত্র) জানিয়েছেন, তদন্তের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র ঢাকাতেই ৩২ জনকে হত্যার সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ পাওয়া গেছে। রোববার (৩ মে) সকালে নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আলাপকালে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা জানান।

ঘটনার প্রেক্ষাপট স্মরণ করলে দেখা যায়, তৎকালীন সময়ে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এবং বিতর্কিত নারী নীতিসহ ১৩ দফা দাবিতে ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছিল। ৫ মে দিনভর চলা উত্তেজনা ও ব্যাপক সহিংসতার পর রাতে পুলিশ, র‍্যাব ও তৎকালীন বিজিবির সমন্বয়ে পরিচালিত এক যৌথ অভিযানে শাপলা চত্বর থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই রাতের অভিযান নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা বিতর্ক ও নিহতের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও বর্তমানে নতুন করে শুরু হওয়া তদন্তে সেই সত্যগুলো বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

চিফ প্রসিকিউটরের দেওয়া তথ্যমতে, শাপলা চত্বরের সেই অভিযানে যে ৩২ জন প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রসিকিউশন টিম সংগ্রহ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই নিহতের সংখ্যা শুধুমাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক। এর বাইরেও চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে একই সময়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দালিলিক প্রমাণ তাদের হাতে এসেছে। মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, তদন্তের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজটুকুও দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য কাজ চলছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন হাতে আসার পর সেটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আকারে দাখিল করা হবে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই মামলার তদন্তে কেবল মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরই নয়, বরং নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের ব্যক্তিদেরও আওতায় আনা হচ্ছে। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, সে সময়ের সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং যারা এই অভিযানে অর্থের জোগান দিয়েছিলেন, তাদের প্রত্যেককেই আইনের মুখোমুখি করা হবে। ইতিমধ্যে এই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক ও বেনজীর আহমেদ, র‍্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান এবং ডিএমপির সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদসহ বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।

বর্তমানে এই মামলার সাথে সংশ্লিষ্ট ছয়জন আসামি কারাগারে আটক রয়েছেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক এবং শাহরিয়ার কবিরের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। গত ৫ এপ্রিল তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল এবং আগামী ৭ জুন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল। দীর্ঘ সময় পর শুরু হওয়া এই আইনি প্রক্রিয়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মনে ন্যায়বিচারের আশা নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল