দিকপাল

সাইবার দুনিয়ায় অপরাধীদের জন্য যম হয়ে দাঁড়াচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬ | ১২:৫৭ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

সাইবার দুনিয়ায় অপরাধীদের জন্য যম হয়ে দাঁড়াচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর জয়জয়কার চললেও, সাইবার অপরাধীদের জন্য এই প্রযুক্তি আশীর্বাদের চেয়ে বরং বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে হ্যাকাররা এআই ব্যবহারের আপ্রাণ চেষ্টা করলেও প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা ও সম্পদের অভাবে তারা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ছে। মূলত চ্যাটজিপিটির মতো উন্নত প্রযুক্তির টুলগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করার মতো সক্ষমতা অধিকাংশ হ্যাকারের নেই।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরা, ইউনিভার্সিটি অফ স্ট্র্যাথক্লাইড এবং ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজের গবেষকরা যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। তারা 'ক্রাইমবিবি' নামক একটি বিশাল ডেটাবেইস থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড ও ডার্ক ওয়েবের প্রায় ১০ কোটি পোস্ট বিশ্লেষণ করেছেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি উন্মোচনের পর থেকে সাইবার অপরাধীরা কীভাবে এটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, তা খুঁজে বের করতে গবেষকরা মেশিন লার্নিং টুল এবং ম্যানুয়াল স্যাম্পলিং পদ্ধতির সাহায্য নিয়েছেন।

গবেষণার ফলাফল বলছে, এআই কোডিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বা সহায়তাকারী টুলগুলো অপেশাদার বা অদক্ষ হ্যাকারদের খুব একটা উপকারে আসছে না। উল্টো যারা আগে থেকেই দক্ষ হ্যাকার, তারাই এই প্রযুক্তির সুবিধা বেশি নিতে পারছেন। কারণ, এআই-এর মাধ্যমে জটিল ম্যালওয়্যার তৈরি বা সিকিউরিটি ব্রিজ করার জন্য উচ্চতর কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন হয়, যা সাধারণ সাইবার অপরাধীদের আয়ত্তের বাইরে। তবে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এআই সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে; যেমন— সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীবিদ্বেষী হয়রানি চালানো, বট পরিচালনার মাধ্যমে জালিয়াতি এবং সাইবার নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে নিজেদের প্যাটার্ন লুকিয়ে রাখা।

ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরার ডিজিটাল মেথডস-এর সিনিয়র লেকচারার ড. বেন কোলিয়ার এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত এআই নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও তা তাদের অপরাধের মূল ধারায় খুব একটা সুবিধা দিতে পারছে না। এর অন্যতম কারণ হলো উন্নত চ্যাটবটগুলোতে থাকা শক্তিশালী 'গার্ডরেইল' বা নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা, যা ক্ষতিকর নির্দেশ পালনে বাধা দেয়। তবে ড. কোলিয়ার একটি আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বিপদটা হ্যাকারদের চেয়ে সাধারণ মানুষ ও কোম্পানিগুলোর দিক থেকেই বেশি। অনেক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার এআই সিস্টেম গ্রহণ করছে, যা সামান্য পরিশ্রমে হ্যাক করা সম্ভব।

গবেষণায় আরেকটি সামাজিক উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে। অনেক সাইবার অপরাধী এখন আতঙ্কিত যে, মূলধারার আইটি শিল্পে এআই-এর প্রভাব বাড়লে তারা তাদের নিয়মিত চাকরি হারাতে পারেন। এই বেকারত্বের ভয় অনেক দক্ষ কর্মীকে অপরাধ জগতের দিকে ধাবিত করতে পারে বলে গবেষকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। এছাড়া 'এজেন্টিক এআই' বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম সিস্টেমগুলোর অনিরাপদ ব্যবহার ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে 'ভাইবকোডেড' বা এআই দিয়ে লেখা কোড সংবলিত সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

এই গবেষণার বিস্তারিত এবং পিয়ার রিভিউড ফলাফলগুলো আগামী জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলেতে অনুষ্ঠিতব্য ‘ওয়ার্কশপ অন দ্য ইকোনমিক্স অফ ইনফরমেশন সিকিউরিটি’-তে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে।

 সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬


সাইবার দুনিয়ায় অপরাধীদের জন্য যম হয়ে দাঁড়াচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬

featured Image

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর জয়জয়কার চললেও, সাইবার অপরাধীদের জন্য এই প্রযুক্তি আশীর্বাদের চেয়ে বরং বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে হ্যাকাররা এআই ব্যবহারের আপ্রাণ চেষ্টা করলেও প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা ও সম্পদের অভাবে তারা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ছে। মূলত চ্যাটজিপিটির মতো উন্নত প্রযুক্তির টুলগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করার মতো সক্ষমতা অধিকাংশ হ্যাকারের নেই।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরা, ইউনিভার্সিটি অফ স্ট্র্যাথক্লাইড এবং ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজের গবেষকরা যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। তারা 'ক্রাইমবিবি' নামক একটি বিশাল ডেটাবেইস থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড ও ডার্ক ওয়েবের প্রায় ১০ কোটি পোস্ট বিশ্লেষণ করেছেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি উন্মোচনের পর থেকে সাইবার অপরাধীরা কীভাবে এটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, তা খুঁজে বের করতে গবেষকরা মেশিন লার্নিং টুল এবং ম্যানুয়াল স্যাম্পলিং পদ্ধতির সাহায্য নিয়েছেন।

গবেষণার ফলাফল বলছে, এআই কোডিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বা সহায়তাকারী টুলগুলো অপেশাদার বা অদক্ষ হ্যাকারদের খুব একটা উপকারে আসছে না। উল্টো যারা আগে থেকেই দক্ষ হ্যাকার, তারাই এই প্রযুক্তির সুবিধা বেশি নিতে পারছেন। কারণ, এআই-এর মাধ্যমে জটিল ম্যালওয়্যার তৈরি বা সিকিউরিটি ব্রিজ করার জন্য উচ্চতর কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন হয়, যা সাধারণ সাইবার অপরাধীদের আয়ত্তের বাইরে। তবে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এআই সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে; যেমন— সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীবিদ্বেষী হয়রানি চালানো, বট পরিচালনার মাধ্যমে জালিয়াতি এবং সাইবার নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে নিজেদের প্যাটার্ন লুকিয়ে রাখা।

ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরার ডিজিটাল মেথডস-এর সিনিয়র লেকচারার ড. বেন কোলিয়ার এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত এআই নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও তা তাদের অপরাধের মূল ধারায় খুব একটা সুবিধা দিতে পারছে না। এর অন্যতম কারণ হলো উন্নত চ্যাটবটগুলোতে থাকা শক্তিশালী 'গার্ডরেইল' বা নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা, যা ক্ষতিকর নির্দেশ পালনে বাধা দেয়। তবে ড. কোলিয়ার একটি আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বিপদটা হ্যাকারদের চেয়ে সাধারণ মানুষ ও কোম্পানিগুলোর দিক থেকেই বেশি। অনেক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার এআই সিস্টেম গ্রহণ করছে, যা সামান্য পরিশ্রমে হ্যাক করা সম্ভব।

গবেষণায় আরেকটি সামাজিক উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে। অনেক সাইবার অপরাধী এখন আতঙ্কিত যে, মূলধারার আইটি শিল্পে এআই-এর প্রভাব বাড়লে তারা তাদের নিয়মিত চাকরি হারাতে পারেন। এই বেকারত্বের ভয় অনেক দক্ষ কর্মীকে অপরাধ জগতের দিকে ধাবিত করতে পারে বলে গবেষকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। এছাড়া 'এজেন্টিক এআই' বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম সিস্টেমগুলোর অনিরাপদ ব্যবহার ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে 'ভাইবকোডেড' বা এআই দিয়ে লেখা কোড সংবলিত সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

এই গবেষণার বিস্তারিত এবং পিয়ার রিভিউড ফলাফলগুলো আগামী জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলেতে অনুষ্ঠিতব্য ‘ওয়ার্কশপ অন দ্য ইকোনমিক্স অফ ইনফরমেশন সিকিউরিটি’-তে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হবে।

 সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল