দিকপাল

খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের ‘না’ লাখো শিক্ষার্থীর ফল নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : বুধবার, ০৬ মে ২০২৬ | ০৫:১১ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের ‘না’ লাখো শিক্ষার্থীর ফল নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা

পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে শিক্ষা খাতে এক গভীর সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। প্রতি বছরই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় ঘনিয়ে এলে পরীক্ষকদের মাঝে খাতা দেখার বিষয়ে এক ধরনের চরম অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিক্ষকদের অভিযোগ, হাড়ভাঙা খাটুনির তুলনায় বোর্ড থেকে যে সম্মানী দেওয়া হয় তা অত্যন্ত সামান্য; এমনকি সেই নামমাত্র অর্থটুকু হাতে পেতেও অনেক ক্ষেত্রে বছর পার হয়ে যায়। এছাড়া বর্তমান সময়ে অনেক শিক্ষকই বোর্ড পরীক্ষার খাতা দেখার চেয়ে কোচিং বা প্রাইভেট টিউশন পড়িয়ে বেশি আয় করাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ প্রক্রিয়ায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারিত সময়ে প্রকাশ করা নিয়ে বড় ধরনের জটিলতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত বছরের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে এবারও অনেক পরীক্ষক নির্ধারিত সময়ে বোর্ড থেকে খাতা সংগ্রহ করছেন না। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বারবার তলব করার পরেও বাংলা প্রথম পত্রের উত্তরপত্র সংগ্রহ না করায় গত মঙ্গলবার ২৩৫ জন পরীক্ষকের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে খুদে বার্তার মাধ্যমে তাদের সতর্ক করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি, যার ফলে বোর্ড কর্তৃপক্ষ এখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, যোগ্য শিক্ষকদের পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলেও তাদের এই অনাগ্রহ পুরো মূল্যায়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিক্ষকরা নিজ থেকে আবেদন করে পরীক্ষক হওয়ার পরও দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে তার দায়ভার শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়বে।

সংকটের গভীরতা আরও বেড়েছে পরীক্ষক নিয়োগের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও অযোগ্য শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগে। নীতিমালা অনুযায়ী কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে কম অভিজ্ঞ বা এমনকি ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকরাও অন্য বিষয়ের খাতা দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও সঠিক নির্দেশনার অভাবে সেখানেও ত্রুটি থেকে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর ফলে খাতা মূল্যায়নে ভুলের হার বাড়ছে এবং পুনর্নিরীক্ষণে শত শত শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হচ্ছে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এমনকি অনেক শিক্ষক খাতা নিয়ে নিজেরা না দেখে অন্যদের দিয়ে মূল্যায়ন করাচ্ছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যা ১৯৮০ সালের পরীক্ষা পরিচালনা আইন অনুযায়ী কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ।

শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আসা ক্ষোভের প্রধান কারণ হলো আর্থিক অসন্তোষ। বর্তমানে প্রতিটি খাতা মূল্যায়নের জন্য মাত্র ৩৫ টাকা সম্মানী দেওয়া হয়, যেখান থেকে আবার ১০ শতাংশ কর কর্তন করা হয়। রাজধানীর নামী এক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জানিয়েছেন, গত বছরের খাতা দেখার টাকাই তিনি এখনও পাননি, অথচ এ বছরও তাকে খাতা দেখার বাড়তি চাপ দেওয়া হচ্ছে। সম্মানী প্রদানে এই দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতা শিক্ষকদের পেশাদারিত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সম্মানীর পরিমাণ বৃদ্ধি এবং দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করার পাশাপাশি যোগ্য ও অভিজ্ঞ পরীক্ষক নিয়োগে বোর্ডগুলোর কঠোর হওয়া জরুরি। অন্যথায় প্রতি বছর এমন অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হবে লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬


খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের ‘না’ লাখো শিক্ষার্থীর ফল নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা

প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬

featured Image

পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে শিক্ষা খাতে এক গভীর সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। প্রতি বছরই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় ঘনিয়ে এলে পরীক্ষকদের মাঝে খাতা দেখার বিষয়ে এক ধরনের চরম অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিক্ষকদের অভিযোগ, হাড়ভাঙা খাটুনির তুলনায় বোর্ড থেকে যে সম্মানী দেওয়া হয় তা অত্যন্ত সামান্য; এমনকি সেই নামমাত্র অর্থটুকু হাতে পেতেও অনেক ক্ষেত্রে বছর পার হয়ে যায়। এছাড়া বর্তমান সময়ে অনেক শিক্ষকই বোর্ড পরীক্ষার খাতা দেখার চেয়ে কোচিং বা প্রাইভেট টিউশন পড়িয়ে বেশি আয় করাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ প্রক্রিয়ায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারিত সময়ে প্রকাশ করা নিয়ে বড় ধরনের জটিলতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত বছরের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে এবারও অনেক পরীক্ষক নির্ধারিত সময়ে বোর্ড থেকে খাতা সংগ্রহ করছেন না। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বারবার তলব করার পরেও বাংলা প্রথম পত্রের উত্তরপত্র সংগ্রহ না করায় গত মঙ্গলবার ২৩৫ জন পরীক্ষকের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে খুদে বার্তার মাধ্যমে তাদের সতর্ক করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি, যার ফলে বোর্ড কর্তৃপক্ষ এখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, যোগ্য শিক্ষকদের পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলেও তাদের এই অনাগ্রহ পুরো মূল্যায়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিক্ষকরা নিজ থেকে আবেদন করে পরীক্ষক হওয়ার পরও দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে তার দায়ভার শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়বে।

সংকটের গভীরতা আরও বেড়েছে পরীক্ষক নিয়োগের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও অযোগ্য শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগে। নীতিমালা অনুযায়ী কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে কম অভিজ্ঞ বা এমনকি ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকরাও অন্য বিষয়ের খাতা দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও সঠিক নির্দেশনার অভাবে সেখানেও ত্রুটি থেকে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর ফলে খাতা মূল্যায়নে ভুলের হার বাড়ছে এবং পুনর্নিরীক্ষণে শত শত শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হচ্ছে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এমনকি অনেক শিক্ষক খাতা নিয়ে নিজেরা না দেখে অন্যদের দিয়ে মূল্যায়ন করাচ্ছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যা ১৯৮০ সালের পরীক্ষা পরিচালনা আইন অনুযায়ী কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ।

শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আসা ক্ষোভের প্রধান কারণ হলো আর্থিক অসন্তোষ। বর্তমানে প্রতিটি খাতা মূল্যায়নের জন্য মাত্র ৩৫ টাকা সম্মানী দেওয়া হয়, যেখান থেকে আবার ১০ শতাংশ কর কর্তন করা হয়। রাজধানীর নামী এক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জানিয়েছেন, গত বছরের খাতা দেখার টাকাই তিনি এখনও পাননি, অথচ এ বছরও তাকে খাতা দেখার বাড়তি চাপ দেওয়া হচ্ছে। সম্মানী প্রদানে এই দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতা শিক্ষকদের পেশাদারিত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সম্মানীর পরিমাণ বৃদ্ধি এবং দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করার পাশাপাশি যোগ্য ও অভিজ্ঞ পরীক্ষক নিয়োগে বোর্ডগুলোর কঠোর হওয়া জরুরি। অন্যথায় প্রতি বছর এমন অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হবে লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল