দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বুধবার সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হাম ও এর আনুষঙ্গিক জটিলতায় আরও নয়টি শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, বর্তমানে দেশে হামে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, আর এই রোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৩০ জন শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে আসা রোগীদের একটি বড় অংশই অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছাচ্ছে, যা মৃত্যুর হার বৃদ্ধির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত একদিনে হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে ১ হাজার ৪৮৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১২৬ জনের শরীরে সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বর্তমানে রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালেও অনেক শিশু এই রোগের চিকিৎসা নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মনে করছেন, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় যখন কোনো শিশু আক্রান্ত হয়, তখন শুরুতেই সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় অবস্থা দ্রুত জটিল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগের একদম শেষ পর্যায়ে যখন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখনই তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়। ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অনেক শিশুর মৃত্যু ঘটছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হামের সঙ্গে যখন নিউমোনিয়া দেখা দেয়, তখন দ্রুত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ভিটামিন এ ক্যাপসুল প্রদান, পুষ্টির জোগান এবং অক্সিজেনের মাত্রার মতো সাধারণ বিষয়গুলো মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে তদারকি করা হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশব্যাপী চিকিৎসকদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা বা ম্যানুয়াল অব ম্যানেজমেন্ট অব মিজলস তৈরি করা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর হাম সংশ্লিষ্ট মৃত ৬০ জন শিশুর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ৪৮ জনই মারা গেছে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে। তবে এদের বড় অংশই এসেছে ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্যও একই ইঙ্গিত দেয়। উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসার সুব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের ঢাকায় পাঠানোর প্রবণতা এবং পথে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়া রোগীদের জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটোছুটি করেন, যা মুমূর্ষু শিশুর স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটায়।
সরকারিভাবে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। টিকাদানের এই হার সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়ক হলেও ক্রমবর্ধমান মৃত্যু হার নিয়ে খোদ স্বাস্থ্য প্রশাসনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারকদের মতে, হামের চিকিৎসা খুব বেশি জটিল না হলেও সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তাই অপ্রয়োজনীয় রোগী স্থানান্তর এড়িয়ে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা জোরদার করা এবং অভিভাবকদের সচেতন করা গেলে এই অকাল মৃত্যু অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বুধবার সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হাম ও এর আনুষঙ্গিক জটিলতায় আরও নয়টি শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, বর্তমানে দেশে হামে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, আর এই রোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৩০ জন শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে আসা রোগীদের একটি বড় অংশই অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছাচ্ছে, যা মৃত্যুর হার বৃদ্ধির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত একদিনে হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে ১ হাজার ৪৮৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১২৬ জনের শরীরে সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বর্তমানে রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালেও অনেক শিশু এই রোগের চিকিৎসা নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মনে করছেন, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় যখন কোনো শিশু আক্রান্ত হয়, তখন শুরুতেই সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় অবস্থা দ্রুত জটিল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগের একদম শেষ পর্যায়ে যখন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখনই তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়। ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অনেক শিশুর মৃত্যু ঘটছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হামের সঙ্গে যখন নিউমোনিয়া দেখা দেয়, তখন দ্রুত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ভিটামিন এ ক্যাপসুল প্রদান, পুষ্টির জোগান এবং অক্সিজেনের মাত্রার মতো সাধারণ বিষয়গুলো মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে তদারকি করা হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশব্যাপী চিকিৎসকদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা বা ম্যানুয়াল অব ম্যানেজমেন্ট অব মিজলস তৈরি করা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর হাম সংশ্লিষ্ট মৃত ৬০ জন শিশুর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ৪৮ জনই মারা গেছে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে। তবে এদের বড় অংশই এসেছে ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্যও একই ইঙ্গিত দেয়। উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসার সুব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের ঢাকায় পাঠানোর প্রবণতা এবং পথে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়া রোগীদের জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটোছুটি করেন, যা মুমূর্ষু শিশুর স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটায়।
সরকারিভাবে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। টিকাদানের এই হার সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়ক হলেও ক্রমবর্ধমান মৃত্যু হার নিয়ে খোদ স্বাস্থ্য প্রশাসনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারকদের মতে, হামের চিকিৎসা খুব বেশি জটিল না হলেও সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তাই অপ্রয়োজনীয় রোগী স্থানান্তর এড়িয়ে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা জোরদার করা এবং অভিভাবকদের সচেতন করা গেলে এই অকাল মৃত্যু অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন