দিকপাল

হাম আতঙ্ক বাড়ছেই, সংকট কাটতে লাগতে পারে আরও সপ্তাহ


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬ | ১২:১৯ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

হাম আতঙ্ক বাড়ছেই, সংকট কাটতে লাগতে পারে আরও সপ্তাহ

সারাদেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে আশার কথা হলো, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে এই সংক্রমণের হার ক্রমান্বয়ে কমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি দেশব্যাপী পরিচালিত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় যেসব শিশু টিকা গ্রহণ করেছে, তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পূর্ণাঙ্গভাবে তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। এই মধ্যবর্তী সময়ে ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায় বিধায় সংক্রমণের গ্রাফ এখনই নিচে নামছে না।

বুধবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন যে, ২০২৬ সালে এসে হামের মতো একটি নিরাময়যোগ্য রোগে এত শিশুর প্রাণহানি আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং লজ্জার বিষয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির সুফল পেতে অন্তত তিন থেকে চার সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়, কারণ শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে এই সময়টুকু প্রয়োজন। যারা এপ্রিলের শুরুতে টিকা নিয়েছে, তারা এখন সুরক্ষার আওতায় এসেছে। ফলে মে মাসের শেষ নাগাদ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর পেছনে প্রধানত নিউমোনিয়া এবং তীব্র অপুষ্টি দায়ী। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, যেসব শিশু প্রাণ হারিয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ আগে থেকেই অপুষ্টিতে ভুগছিল। শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকায় হামের সংক্রমণ তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত জটিল আকার ধারণ করে এবং পরবর্তীতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এছাড়া আবহাওয়া পরিবর্তন এবং ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে শুধুমাত্র টিকাদান যথেষ্ট নয়, বরং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে আসন্ন বাজেটে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ হলেও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় তা বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন এবং এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, ইতোমধ্যে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। তিনি অভিভাবকদের আহ্বান জানান যে, নিয়মিত কর্মসূচিতে টিকা নেওয়া থাকলেও বর্তমান বিশেষ ক্যাম্পেইনের টিকা যেন অবশ্যই শিশুদের দেওয়া হয়।

বিগত ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যান বলছে, হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আটটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় দেড় হাজার নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ পর্যন্ত নিশ্চিত ও সন্দেহজনক মিলিয়ে হামে প্রাণ হারিয়েছে ৪৩২ জন শিশু। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে মৃতের সংখ্যা ১৪৩ জন। এরপরই রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ৭৮ জন শিশু। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী হার রোধে স্বাস্থ্য বিভাগ এখন পূর্ণ শক্তিতে কাজ করছে এবং টিকাদান কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপের সফলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬


হাম আতঙ্ক বাড়ছেই, সংকট কাটতে লাগতে পারে আরও সপ্তাহ

প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬

featured Image

সারাদেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে আশার কথা হলো, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে এই সংক্রমণের হার ক্রমান্বয়ে কমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি দেশব্যাপী পরিচালিত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় যেসব শিশু টিকা গ্রহণ করেছে, তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পূর্ণাঙ্গভাবে তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। এই মধ্যবর্তী সময়ে ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায় বিধায় সংক্রমণের গ্রাফ এখনই নিচে নামছে না।

বুধবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন যে, ২০২৬ সালে এসে হামের মতো একটি নিরাময়যোগ্য রোগে এত শিশুর প্রাণহানি আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং লজ্জার বিষয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির সুফল পেতে অন্তত তিন থেকে চার সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়, কারণ শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে এই সময়টুকু প্রয়োজন। যারা এপ্রিলের শুরুতে টিকা নিয়েছে, তারা এখন সুরক্ষার আওতায় এসেছে। ফলে মে মাসের শেষ নাগাদ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর পেছনে প্রধানত নিউমোনিয়া এবং তীব্র অপুষ্টি দায়ী। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, যেসব শিশু প্রাণ হারিয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ আগে থেকেই অপুষ্টিতে ভুগছিল। শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকায় হামের সংক্রমণ তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত জটিল আকার ধারণ করে এবং পরবর্তীতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এছাড়া আবহাওয়া পরিবর্তন এবং ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে শুধুমাত্র টিকাদান যথেষ্ট নয়, বরং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে আসন্ন বাজেটে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ হলেও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় তা বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন এবং এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, ইতোমধ্যে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। তিনি অভিভাবকদের আহ্বান জানান যে, নিয়মিত কর্মসূচিতে টিকা নেওয়া থাকলেও বর্তমান বিশেষ ক্যাম্পেইনের টিকা যেন অবশ্যই শিশুদের দেওয়া হয়।

বিগত ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যান বলছে, হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আটটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় দেড় হাজার নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ পর্যন্ত নিশ্চিত ও সন্দেহজনক মিলিয়ে হামে প্রাণ হারিয়েছে ৪৩২ জন শিশু। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে মৃতের সংখ্যা ১৪৩ জন। এরপরই রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ৭৮ জন শিশু। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী হার রোধে স্বাস্থ্য বিভাগ এখন পূর্ণ শক্তিতে কাজ করছে এবং টিকাদান কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপের সফলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল