দিকপাল

রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের জন্য আসছে প্রবাসী কার্ড


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শনিবার, ১৬ মে ২০২৬ | ০৫:১৩ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের জন্য আসছে প্রবাসী কার্ড

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ডের সফল বাস্তবায়নের পর, এবার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রাবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। সরকারের উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী দুই মাসের মধ্যেই প্রবাসী নাগরিকদের হাতে এই বিশেষ কার্ড তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে সরকারের প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এই নতুন উদ্যোগের কথা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, মূলত প্রবাসীদের বৈধ পথে রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে উৎসাহিত করতেই সরকার এই যুগান্তকারী প্রবাসী কার্ড চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে স্বাভাবিকভাবেই এই নতুন কার্ড চালুর খবর আসার পর থেকে প্রবাসী নাগরিকদের মনে এটি নিয়ে নানা কৌতুহল, প্রশ্ন ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে যে, এই কার্ডের মাধ্যমে তারা প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের বাস্তব সুবিধা পেতে যাচ্ছেন।

উল্লেখ্য, বৈধভাবে বিদেশে কর্মরত বা গমনেচ্ছু প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আগে থেকেই ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার ইমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং কার্ড তথা বিএমইটি কার্ডের প্রচলন রয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অধীনে নিবন্ধিত হয়ে যারা বৈধ উপায়ে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমান, কেবল তারাই এই কার্ডটি পেয়ে থাকেন। বিএমইটি কার্ডের প্রধান সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে একজন শ্রমিকের যাবতীয় ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য সরকারি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত থাকে, যার ফলে প্রবাসে যেকোনো বিপদের সম্মুখীন হলে ওই কর্মীকে সহজেই চিহ্নিত করা যায় এবং সরকার তৎক্ষণাৎ প্রয়োজনীয় আইনি বা কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করতে পারে। ফলে আগে থেকেই প্রবাসীদের সুরক্ষায় এমন একটি ডিজিটাল কার্ড সচল থাকার পরও কেন আবার নতুন করে প্রবাসী কার্ড চালু করা হচ্ছে এবং এই কার্ডে বাড়তি কী কী সুবিধা যুক্ত থাকবে, তা নিয়ে প্রবাসীদের মাঝে বিস্তর আলোচনা চলছে।

এই বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে জানানো হয়েছে যে, পূর্বের বিএমইটি কার্ডের সমস্ত মৌলিক তথ্যের পাশাপাশি নতুন এই প্রবাসী কার্ডে সম্পূর্ণ আধুনিক ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি যুক্ত করা হচ্ছে, যা প্রবাসীদের জন্য বাড়তি অনেক সুযোগ-সুবিধার দুয়ার খুলে দেবে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এই কার্ডের উপযোগিতা তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, এটি আসলে প্রবাসী কর্মীদের জন্য একটি বহুুমাত্রিক ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও সেবা কার্ড হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে তারা দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান যে, এই কার্ডটি প্রবাসীদের জন্য পাসপোর্টের একটি চমৎকার বিকল্প বা সহায়ক দলিল হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। কার্ডের গায়ে একটি বিশেষ কিউআর কোড যুক্ত থাকবে, যা যেকোনো দেশের নিরাপত্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্ক্যান করলেই মুহূর্তের মধ্যে ওই প্রবাসী নাগরিকের বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দেখতে পাবেন। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমেও ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যবহার করা যাবে, ফলে আসল প্লাস্টিক কার্ডটি সব সময় সঙ্গে রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। আসলে নির্বাচনের পূর্বে দলীয় ইশতেহারেই এই প্রবাসী কার্ডের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যেখানে প্রবাসীদের তথ্য, কর্মদক্ষতা ও চাকরির যাবতীয় শর্ত সংরক্ষণের পাশাপাশি ব্যাংকিং পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অতি সহজে ও কম খরচে দেশে রেমিট্যান্স বা উপার্জিত অর্থ প্রেরণের ব্যবস্থার কথা উল্লেখ ছিল।

তবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চালু হওয়া বিএমইটি কার্ডের তুলনায় এই নতুন প্রবাসী কার্ডের বড় পার্থক্যটি মূলত অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জায়গায়। নতুন এই কার্ডের মাধ্যমে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে প্রবাসীরা সরকারের পক্ষ থেকে বাড়তি আর্থিক প্রণোদনা পাবেন এবং প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফেরত আসার পর তাদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা বলয় নিশ্চিত করা হবে। মালয়েশিয়া প্রবাসী শাহরিয়ার তারেক সহ অনেক সাধারণ কর্মী অবশ্য তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কিছুটা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, পূর্বের কার্ডের মাধ্যমে কিছু সুবিধা মিললেও এখনো প্রবাসীরা দেশের বিমানবন্দরগুলোতে কিংবা অন্যান্য নাগরিক সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে নানাভাবে হয়রানির শিকার হন। তাই নতুন এই কার্ড তাদের কতখানি প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দিতে পারবে, তা নিয়ে তারা সন্দিহান। এই বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক আশ্বস্ত করে বলেন যে, এই কার্ডের অন্যতম প্রধান শক্তিশালী দিক হলো এর আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যা একটি ডুয়েল কারেন্সি বা দ্বৈত মুদ্রার কার্ড হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে একজন প্রবাসী যে দেশে অবস্থান করছেন, সেই দেশের মুদ্রায় যেমন লেনদেন বা খরচ করতে পারবেন, ঠিক তেমনি বাংলাদেশে এসেও এটি দিয়ে সরাসরি বাংলাদেশি টাকায় কেনাকাটা করতে পারবেন। এমনকি কোনো প্রবাসী যদি প্রবাসে বসেই এই কার্ডের অনলাইন পেমেন্ট বা ডিজিটাল পরিশোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে থাকা তাঁর পরিবারের জন্য কোনো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বা সেবা কিনে দিতে চান, তবে সেটিও অনায়াসে করা সম্ভব হবে।

এই কার্ড চালুর আরেকটি চমৎকার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী জানান যে, অনেক সময় প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর পর তাদের নিকটাত্মীয় বা পরিবারের সদস্যরা হিসাবহীনভাবে তা খরচ করে ফেলেন। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা তাদের পরিবারের জন্য একটি নির্দিষ্ট খরচের সীমা বা লিমিট নির্ধারণ করে দিতে পারবেন, যার ফলে পরিবার কেবল প্রয়োজনীয় অর্থটুকুই ব্যয় করতে পারবে, কোনো ধরনের অপচয় বা আনলিমিটেড টাকা খরচের সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়া সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত প্রবাসীদের উন্নত নাগরিক জীবন নিশ্চিত করতে বিশেষ ‘প্রবাসী সিটি’ বা আবাসন এলাকা গড়ে তোলা হবে। যেসব প্রবাসীর কাছে এই বৈধ প্রবাসী কার্ড থাকবে, তারা ওই সমস্ত প্রবাসী সিটিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্লট বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ মূল্যছাড় ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন। এর পাশাপাশি পূর্বে চালু থাকা বিএমইটি বীমা এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ যাবতীয় কল্যাণমূলক সুবিধাও এই নতুন কার্ডে বহাল থাকবে। সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে যাতে এই কার্ডধারী প্রবাসীরা যখনই দেশের বিমানবন্দরে যাতায়াত করবেন, তখন যেন কার্ডটি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রীয় রেমিট্যান্সযোদ্ধা হিসেবে তাদের প্রাপ্য সর্বোচ্চ সম্মানটুকু পান এবং কোনো ধরনের প্রশাসনিক হয়রানির শিকার না হন।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে একটি বড় অংশ অবশ্য পড়াশোনা বা অন্য কোনো মাধ্যমে বিদেশ গিয়ে পরবর্তীতে কর্মসংস্থানে জড়িয়ে পড়েছেন, যাদের অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক বিএমইটি কার্ড নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী ইশতিয়াক আসিফের মতো অনেকেরই প্রশ্ন, বৈধ পাসপোর্ট ও সংশ্লিষ্ট দেশের কাজের ভিসা থাকার পরও কেন শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য আলাদা করে এই কার্ড নিতে হবে। এই বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের মত হলো, বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ প্রবাসীর তথ্য সরকারের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে এবং নতুন কার্ডের আকর্ষণীয় রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক সুবিধাগুলো দেখে বাকি প্রবাসীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কার্ড নিতে আগ্রহী হবেন। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে যাদের ইতিমধ্যে বিএমইটি কার্ড রয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই প্রবাসী কার্ড দেওয়া হবে এবং সেক্ষেত্রে তাদের নতুন করে সহজ প্রক্রিয়ায় রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। আগে বিএমইটি কার্ড করার সময় একটি নির্দিষ্ট সরকারি ফি লাগত, তবে যাদের আগে থেকেই সেই কার্ডটি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই নতুন কার্ডের জন্য হয়তো কোনো বাড়তি ফি লাগবে না। তবে সম্পূর্ণ নতুনভাবে যারা এই তালিকায় যুক্ত হবেন, তাদের ক্ষেত্রে একটি নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফির প্রয়োজন হতে পারে এবং প্রবাসীদের সুবিধার্থে বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এই কার্ড বিতরণ করা হবে। এদিকে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি একটি জরুরি পরামর্শ দিয়ে বলেছেন যে, বিগত সরকারের দেওয়া বিএমইটি কার্ডটি অনেক চটকদার সুবিধার কথা বলে চালু করা হলেও বাস্তবে তা সাধারণ প্রবাসীদের তেমন কোনো কাজেই আসেনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, নতুন এই প্রবাসী কার্ডটি চালু করার পূর্বে এটি যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে প্রবাসীদের জন্য শতভাগ কার্যকর ও কল্যাণকর হয়, সেই বিষয়ে সরকারকে এখন থেকেই নিখুঁত ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের জন্য আসছে প্রবাসী কার্ড

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ডের সফল বাস্তবায়নের পর, এবার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রাবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। সরকারের উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী দুই মাসের মধ্যেই প্রবাসী নাগরিকদের হাতে এই বিশেষ কার্ড তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে সরকারের প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এই নতুন উদ্যোগের কথা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, মূলত প্রবাসীদের বৈধ পথে রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে উৎসাহিত করতেই সরকার এই যুগান্তকারী প্রবাসী কার্ড চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে স্বাভাবিকভাবেই এই নতুন কার্ড চালুর খবর আসার পর থেকে প্রবাসী নাগরিকদের মনে এটি নিয়ে নানা কৌতুহল, প্রশ্ন ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে যে, এই কার্ডের মাধ্যমে তারা প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের বাস্তব সুবিধা পেতে যাচ্ছেন।

উল্লেখ্য, বৈধভাবে বিদেশে কর্মরত বা গমনেচ্ছু প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আগে থেকেই ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার ইমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং কার্ড তথা বিএমইটি কার্ডের প্রচলন রয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অধীনে নিবন্ধিত হয়ে যারা বৈধ উপায়ে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমান, কেবল তারাই এই কার্ডটি পেয়ে থাকেন। বিএমইটি কার্ডের প্রধান সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে একজন শ্রমিকের যাবতীয় ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য সরকারি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত থাকে, যার ফলে প্রবাসে যেকোনো বিপদের সম্মুখীন হলে ওই কর্মীকে সহজেই চিহ্নিত করা যায় এবং সরকার তৎক্ষণাৎ প্রয়োজনীয় আইনি বা কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করতে পারে। ফলে আগে থেকেই প্রবাসীদের সুরক্ষায় এমন একটি ডিজিটাল কার্ড সচল থাকার পরও কেন আবার নতুন করে প্রবাসী কার্ড চালু করা হচ্ছে এবং এই কার্ডে বাড়তি কী কী সুবিধা যুক্ত থাকবে, তা নিয়ে প্রবাসীদের মাঝে বিস্তর আলোচনা চলছে।

এই বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে জানানো হয়েছে যে, পূর্বের বিএমইটি কার্ডের সমস্ত মৌলিক তথ্যের পাশাপাশি নতুন এই প্রবাসী কার্ডে সম্পূর্ণ আধুনিক ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি যুক্ত করা হচ্ছে, যা প্রবাসীদের জন্য বাড়তি অনেক সুযোগ-সুবিধার দুয়ার খুলে দেবে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এই কার্ডের উপযোগিতা তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, এটি আসলে প্রবাসী কর্মীদের জন্য একটি বহুুমাত্রিক ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও সেবা কার্ড হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে তারা দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান যে, এই কার্ডটি প্রবাসীদের জন্য পাসপোর্টের একটি চমৎকার বিকল্প বা সহায়ক দলিল হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। কার্ডের গায়ে একটি বিশেষ কিউআর কোড যুক্ত থাকবে, যা যেকোনো দেশের নিরাপত্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্ক্যান করলেই মুহূর্তের মধ্যে ওই প্রবাসী নাগরিকের বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দেখতে পাবেন। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমেও ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যবহার করা যাবে, ফলে আসল প্লাস্টিক কার্ডটি সব সময় সঙ্গে রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। আসলে নির্বাচনের পূর্বে দলীয় ইশতেহারেই এই প্রবাসী কার্ডের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যেখানে প্রবাসীদের তথ্য, কর্মদক্ষতা ও চাকরির যাবতীয় শর্ত সংরক্ষণের পাশাপাশি ব্যাংকিং পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অতি সহজে ও কম খরচে দেশে রেমিট্যান্স বা উপার্জিত অর্থ প্রেরণের ব্যবস্থার কথা উল্লেখ ছিল।

তবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চালু হওয়া বিএমইটি কার্ডের তুলনায় এই নতুন প্রবাসী কার্ডের বড় পার্থক্যটি মূলত অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জায়গায়। নতুন এই কার্ডের মাধ্যমে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে প্রবাসীরা সরকারের পক্ষ থেকে বাড়তি আর্থিক প্রণোদনা পাবেন এবং প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফেরত আসার পর তাদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা বলয় নিশ্চিত করা হবে। মালয়েশিয়া প্রবাসী শাহরিয়ার তারেক সহ অনেক সাধারণ কর্মী অবশ্য তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কিছুটা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, পূর্বের কার্ডের মাধ্যমে কিছু সুবিধা মিললেও এখনো প্রবাসীরা দেশের বিমানবন্দরগুলোতে কিংবা অন্যান্য নাগরিক সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে নানাভাবে হয়রানির শিকার হন। তাই নতুন এই কার্ড তাদের কতখানি প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দিতে পারবে, তা নিয়ে তারা সন্দিহান। এই বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক আশ্বস্ত করে বলেন যে, এই কার্ডের অন্যতম প্রধান শক্তিশালী দিক হলো এর আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যা একটি ডুয়েল কারেন্সি বা দ্বৈত মুদ্রার কার্ড হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে একজন প্রবাসী যে দেশে অবস্থান করছেন, সেই দেশের মুদ্রায় যেমন লেনদেন বা খরচ করতে পারবেন, ঠিক তেমনি বাংলাদেশে এসেও এটি দিয়ে সরাসরি বাংলাদেশি টাকায় কেনাকাটা করতে পারবেন। এমনকি কোনো প্রবাসী যদি প্রবাসে বসেই এই কার্ডের অনলাইন পেমেন্ট বা ডিজিটাল পরিশোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে থাকা তাঁর পরিবারের জন্য কোনো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বা সেবা কিনে দিতে চান, তবে সেটিও অনায়াসে করা সম্ভব হবে।

এই কার্ড চালুর আরেকটি চমৎকার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী জানান যে, অনেক সময় প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর পর তাদের নিকটাত্মীয় বা পরিবারের সদস্যরা হিসাবহীনভাবে তা খরচ করে ফেলেন। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা তাদের পরিবারের জন্য একটি নির্দিষ্ট খরচের সীমা বা লিমিট নির্ধারণ করে দিতে পারবেন, যার ফলে পরিবার কেবল প্রয়োজনীয় অর্থটুকুই ব্যয় করতে পারবে, কোনো ধরনের অপচয় বা আনলিমিটেড টাকা খরচের সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়া সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত প্রবাসীদের উন্নত নাগরিক জীবন নিশ্চিত করতে বিশেষ ‘প্রবাসী সিটি’ বা আবাসন এলাকা গড়ে তোলা হবে। যেসব প্রবাসীর কাছে এই বৈধ প্রবাসী কার্ড থাকবে, তারা ওই সমস্ত প্রবাসী সিটিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্লট বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ মূল্যছাড় ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন। এর পাশাপাশি পূর্বে চালু থাকা বিএমইটি বীমা এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ যাবতীয় কল্যাণমূলক সুবিধাও এই নতুন কার্ডে বহাল থাকবে। সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে যাতে এই কার্ডধারী প্রবাসীরা যখনই দেশের বিমানবন্দরে যাতায়াত করবেন, তখন যেন কার্ডটি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রীয় রেমিট্যান্সযোদ্ধা হিসেবে তাদের প্রাপ্য সর্বোচ্চ সম্মানটুকু পান এবং কোনো ধরনের প্রশাসনিক হয়রানির শিকার না হন।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে একটি বড় অংশ অবশ্য পড়াশোনা বা অন্য কোনো মাধ্যমে বিদেশ গিয়ে পরবর্তীতে কর্মসংস্থানে জড়িয়ে পড়েছেন, যাদের অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক বিএমইটি কার্ড নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী ইশতিয়াক আসিফের মতো অনেকেরই প্রশ্ন, বৈধ পাসপোর্ট ও সংশ্লিষ্ট দেশের কাজের ভিসা থাকার পরও কেন শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য আলাদা করে এই কার্ড নিতে হবে। এই বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের মত হলো, বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ প্রবাসীর তথ্য সরকারের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে এবং নতুন কার্ডের আকর্ষণীয় রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক সুবিধাগুলো দেখে বাকি প্রবাসীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কার্ড নিতে আগ্রহী হবেন। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে যাদের ইতিমধ্যে বিএমইটি কার্ড রয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই প্রবাসী কার্ড দেওয়া হবে এবং সেক্ষেত্রে তাদের নতুন করে সহজ প্রক্রিয়ায় রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। আগে বিএমইটি কার্ড করার সময় একটি নির্দিষ্ট সরকারি ফি লাগত, তবে যাদের আগে থেকেই সেই কার্ডটি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই নতুন কার্ডের জন্য হয়তো কোনো বাড়তি ফি লাগবে না। তবে সম্পূর্ণ নতুনভাবে যারা এই তালিকায় যুক্ত হবেন, তাদের ক্ষেত্রে একটি নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফির প্রয়োজন হতে পারে এবং প্রবাসীদের সুবিধার্থে বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এই কার্ড বিতরণ করা হবে। এদিকে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি একটি জরুরি পরামর্শ দিয়ে বলেছেন যে, বিগত সরকারের দেওয়া বিএমইটি কার্ডটি অনেক চটকদার সুবিধার কথা বলে চালু করা হলেও বাস্তবে তা সাধারণ প্রবাসীদের তেমন কোনো কাজেই আসেনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, নতুন এই প্রবাসী কার্ডটি চালু করার পূর্বে এটি যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে প্রবাসীদের জন্য শতভাগ কার্যকর ও কল্যাণকর হয়, সেই বিষয়ে সরকারকে এখন থেকেই নিখুঁত ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল