ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কিউবার অবিসংবাদিত ও প্রবীণ বিপ্লবী নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে প্রায় দুই দশক আগে একটি মানবিক সহায়তা বহনকারী বিমান আকাশপথে ভূপাতিত করার সুনির্দিষ্ট ঘটনায় আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি অভিযোগ গঠনের জোরালো পরিকল্পনা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এমনিতেই তীব্র জ্বালানি সংকট, নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতিসহ বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও শ্বাসরোধকারী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কিউবা। এমন এক চরম বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের এই আকস্মিক আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপকে দেশটির ওপর ওয়াশিংটনের এক ধরনের নতুন ও বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবে দেখছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বর্তমানে ৯৪ বছর বয়সী কিউবান বিপ্লবের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে যদি এই অভিযোগ চূড়ান্তভাবে গঠন করা হয়, তবে তা হবে কিউবার বর্তমান কমিউনিস্ট সরকারের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ ও নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর আরেকটি বড় ও আগ্রাসী পদক্ষেপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই কিউবার সমাজতান্ত্রিক সরকারকে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত, অদক্ষ ও স্বৈরাচারী বলে আখ্যা দিয়ে আসছে এবং দেশটিতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য নানামুখী আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন এই নতুন পরিকল্পনা ও আইনি তৎপরতা বিষয়ে কিউবা সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া না হলেও সম্প্রতি আয়োজিত ব্রিকস জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়ে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত কড়া ও হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বিশ্বমঞ্চে বলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধ, অন্যায় নিষেধাজ্ঞা এবং বারবার সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি সত্ত্বেও কিউবা তার নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক উন্নয়নের পথে সার্বভৌম অবস্থান বজায় রাখবে এবং কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সামনে মাথা নত করবে না।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স কিউবার রাজধানী হাভানার সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বললে এক মিশ্র ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের মতে, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে এই ধরনের কোনো একতরফা মামলা বা বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে আমেরিকার সঙ্গে কিউবার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা আরও বহু বছর পিছিয়ে যাবে এবং দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সংকট আরও গভীর ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করবে। হাভানার এক প্রবীণ স্কুলশিক্ষিকা সোনিয়া তোরেস অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন যে, এমন পদক্ষেপকে সমগ্র কিউবান জাতির জাতীয় মর্যাদা ও আত্মসম্মানের ওপর এক বড় আঘাত হিসেবে দেখা হবে। তাঁর ভাষায়, কিউবার মানুষকে সব সময় প্রতিকূলতা জয় করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা যদি আজ তাদের শ্রদ্ধেয় নেতা রাউলের বিচার করতে চায়, তবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ লাঠি-পাথর হাতে তুলে নিয়ে রাস্তায় নামবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে এই দীর্ঘস্থায়ী ও উত্তেজনাপূর্ণ বৈরি সম্পর্কের ইতিহাস শুরু হয়েছিল আজ থেকে কয়েক দশক আগে, ১৯৫৯ সালে কিংবদন্তি নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সংঘটিত সফল কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর থেকে। বিপ্লবের পরপরই কাস্ত্রো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে এক সুদৃঢ় কৌশলগত জোট গড়ে তোলেন এবং কিউবার মাটিতে থাকা মার্কিন নাগরিকদের মালিকানাধীন সমস্ত বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা ও বিপুল স্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এর পর থেকেই আমেরিকার ঘরের কাছে এক সমাজতান্ত্রিক দ্বীপরাষ্ট্রের উত্থান ঘটায় দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা ও অবরোধের রাজনীতির সূচনা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার ওপর তাদের নীতি আরও বেশি কঠোর ও নির্মম করেছে। কার্যত এক ধরনের জ্বালানি অবরোধ আরোপ, সামরিক আগ্রাসনের প্রচ্ছন্ন হুমকি এবং একের পর এক অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের ফলে বহু বিদেশি কোম্পানি লোকসানের মুখে পড়ে কিউবা থেকে তাদের পাট গোটাতে শুরু করেছে, যার মধ্যে কানাডার বিখ্যাত খনি কোম্পানি শেরিট ইন্টারন্যাশনালও অন্যতম।
দীর্ঘদিন ধরে কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক পিটার কর্নব্লুহ এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে সতর্ক করে বলেছেন যে, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হলে তা হবে দুই দেশের মধ্যকার যেকোনো ধরনের শান্তিমূলক আলোচনার এক ‘কূটনৈতিক সমাপ্তি’। তাঁর সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি আসলে এক ধরনের চূড়ান্ত আল্টিমেটাম এবং এই মার্কিন আইনি অভিযোগটি ভবিষ্যতে কিউবার মাটিতে যেকোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালানো কিংবা প্রবীণ নেতা রাউল কাস্ত্রোকে বলপূর্বক আটক বা হত্যার মতো চরম পদক্ষেপের জন্য এক ধরনের আইনি বৈধতার আবরণ তৈরি করতে পারে। অতীতেও দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক বা পুরনো ফৌজদারি অভিযোগ এনে পরবর্তীতে সেই দেশে সামরিক অভিযানের বা আগ্রাসনের যৌক্তিকতা হিসেবে তা বিশ্ববাসীর সামনে ব্যবহার করেছে। এমনকি চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বামপন্থী নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার এক বিতর্কিত মার্কিন অভিযানের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছিলেন যে, তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হতে যাচ্ছে কিউবা।
যদিও রাউল কাস্ত্রো বর্তমানে বয়সজনিত কারণে কিউবার কোনো প্রত্যক্ষ সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পদে আসীন নেই, তবুও তাকে এখনও কিউবার সবচেয়ে প্রভাবশালী জীবিত অভিভাবক, নেতা এবং বিপ্লবের জীবন্ত প্রতীক হিসেবে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখে সে দেশের সাধারণ মানুষ ও সেনাবাহিনী। আমেরিকার পরিকল্পিত এই সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিগত ১৯৯৬ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যেখানে একটি মানবিক সহায়তাকারী সংগঠন কর্তৃক পরিচালিত দুটি বিশেষ ছোট বিমান কিউবার আকাশসীমায় ভূপাতিত করা হয়েছিল। সে সময় কিউবার সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল যে, নিজেদের আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্যই আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই বিমানগুলো ভূপাতিত করা হয়েছিল। তবে পরে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার এক তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, ঘটনাটি কিউবার সীমানার বাইরে আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর ঘটেছিল। ফিদেল কাস্ত্রো সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলেছিলেন যে, কিউবার সামরিক বাহিনী আগে থেকেই যেকোনো আকাশপথের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কড়া নির্দেশনা পেয়েছিল, তবে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাউল কাস্ত্রো বিমান দুটি ধ্বংস করার জন্য কোনো সরাসরি বা তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেননি। হাভানার স্থানীয় বাসিন্দা এলিয়েসের দিয়াজ এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ১৯৯৬ সালে কিউবা যেভাবে শত্রুর হাত থেকে নিজেদের আত্মরক্ষা করেছিল, আজকেও ঠিক একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মতে, সেটি ছিল কিউবার ওপর এক ধরনের সুদূরপ্রসারী বিদেশি আগ্রাসন, আর যেকোনো স্বাধীন দেশের অধিকার রয়েছে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করার। তাই এত বছর পর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যদি রাউল কাস্ত্রোর বিচার করতে চাওয়া হয়, তবে তা হবে এক চরম ভুল ও অন্যায় পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স।

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কিউবার অবিসংবাদিত ও প্রবীণ বিপ্লবী নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে প্রায় দুই দশক আগে একটি মানবিক সহায়তা বহনকারী বিমান আকাশপথে ভূপাতিত করার সুনির্দিষ্ট ঘটনায় আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি অভিযোগ গঠনের জোরালো পরিকল্পনা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এমনিতেই তীব্র জ্বালানি সংকট, নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতিসহ বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও শ্বাসরোধকারী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কিউবা। এমন এক চরম বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের এই আকস্মিক আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপকে দেশটির ওপর ওয়াশিংটনের এক ধরনের নতুন ও বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবে দেখছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বর্তমানে ৯৪ বছর বয়সী কিউবান বিপ্লবের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে যদি এই অভিযোগ চূড়ান্তভাবে গঠন করা হয়, তবে তা হবে কিউবার বর্তমান কমিউনিস্ট সরকারের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ ও নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর আরেকটি বড় ও আগ্রাসী পদক্ষেপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই কিউবার সমাজতান্ত্রিক সরকারকে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত, অদক্ষ ও স্বৈরাচারী বলে আখ্যা দিয়ে আসছে এবং দেশটিতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য নানামুখী আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন এই নতুন পরিকল্পনা ও আইনি তৎপরতা বিষয়ে কিউবা সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া না হলেও সম্প্রতি আয়োজিত ব্রিকস জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়ে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত কড়া ও হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বিশ্বমঞ্চে বলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধ, অন্যায় নিষেধাজ্ঞা এবং বারবার সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি সত্ত্বেও কিউবা তার নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক উন্নয়নের পথে সার্বভৌম অবস্থান বজায় রাখবে এবং কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সামনে মাথা নত করবে না।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স কিউবার রাজধানী হাভানার সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বললে এক মিশ্র ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের মতে, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে এই ধরনের কোনো একতরফা মামলা বা বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে আমেরিকার সঙ্গে কিউবার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে সামান্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা আরও বহু বছর পিছিয়ে যাবে এবং দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সংকট আরও গভীর ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করবে। হাভানার এক প্রবীণ স্কুলশিক্ষিকা সোনিয়া তোরেস অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন যে, এমন পদক্ষেপকে সমগ্র কিউবান জাতির জাতীয় মর্যাদা ও আত্মসম্মানের ওপর এক বড় আঘাত হিসেবে দেখা হবে। তাঁর ভাষায়, কিউবার মানুষকে সব সময় প্রতিকূলতা জয় করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা যদি আজ তাদের শ্রদ্ধেয় নেতা রাউলের বিচার করতে চায়, তবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ লাঠি-পাথর হাতে তুলে নিয়ে রাস্তায় নামবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে এই দীর্ঘস্থায়ী ও উত্তেজনাপূর্ণ বৈরি সম্পর্কের ইতিহাস শুরু হয়েছিল আজ থেকে কয়েক দশক আগে, ১৯৫৯ সালে কিংবদন্তি নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সংঘটিত সফল কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর থেকে। বিপ্লবের পরপরই কাস্ত্রো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে এক সুদৃঢ় কৌশলগত জোট গড়ে তোলেন এবং কিউবার মাটিতে থাকা মার্কিন নাগরিকদের মালিকানাধীন সমস্ত বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা ও বিপুল স্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এর পর থেকেই আমেরিকার ঘরের কাছে এক সমাজতান্ত্রিক দ্বীপরাষ্ট্রের উত্থান ঘটায় দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা ও অবরোধের রাজনীতির সূচনা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার ওপর তাদের নীতি আরও বেশি কঠোর ও নির্মম করেছে। কার্যত এক ধরনের জ্বালানি অবরোধ আরোপ, সামরিক আগ্রাসনের প্রচ্ছন্ন হুমকি এবং একের পর এক অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের ফলে বহু বিদেশি কোম্পানি লোকসানের মুখে পড়ে কিউবা থেকে তাদের পাট গোটাতে শুরু করেছে, যার মধ্যে কানাডার বিখ্যাত খনি কোম্পানি শেরিট ইন্টারন্যাশনালও অন্যতম।
দীর্ঘদিন ধরে কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক পিটার কর্নব্লুহ এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে সতর্ক করে বলেছেন যে, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হলে তা হবে দুই দেশের মধ্যকার যেকোনো ধরনের শান্তিমূলক আলোচনার এক ‘কূটনৈতিক সমাপ্তি’। তাঁর সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি আসলে এক ধরনের চূড়ান্ত আল্টিমেটাম এবং এই মার্কিন আইনি অভিযোগটি ভবিষ্যতে কিউবার মাটিতে যেকোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালানো কিংবা প্রবীণ নেতা রাউল কাস্ত্রোকে বলপূর্বক আটক বা হত্যার মতো চরম পদক্ষেপের জন্য এক ধরনের আইনি বৈধতার আবরণ তৈরি করতে পারে। অতীতেও দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক বা পুরনো ফৌজদারি অভিযোগ এনে পরবর্তীতে সেই দেশে সামরিক অভিযানের বা আগ্রাসনের যৌক্তিকতা হিসেবে তা বিশ্ববাসীর সামনে ব্যবহার করেছে। এমনকি চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বামপন্থী নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার এক বিতর্কিত মার্কিন অভিযানের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছিলেন যে, তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হতে যাচ্ছে কিউবা।
যদিও রাউল কাস্ত্রো বর্তমানে বয়সজনিত কারণে কিউবার কোনো প্রত্যক্ষ সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পদে আসীন নেই, তবুও তাকে এখনও কিউবার সবচেয়ে প্রভাবশালী জীবিত অভিভাবক, নেতা এবং বিপ্লবের জীবন্ত প্রতীক হিসেবে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখে সে দেশের সাধারণ মানুষ ও সেনাবাহিনী। আমেরিকার পরিকল্পিত এই সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিগত ১৯৯৬ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যেখানে একটি মানবিক সহায়তাকারী সংগঠন কর্তৃক পরিচালিত দুটি বিশেষ ছোট বিমান কিউবার আকাশসীমায় ভূপাতিত করা হয়েছিল। সে সময় কিউবার সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল যে, নিজেদের আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্যই আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই বিমানগুলো ভূপাতিত করা হয়েছিল। তবে পরে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার এক তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, ঘটনাটি কিউবার সীমানার বাইরে আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর ঘটেছিল। ফিদেল কাস্ত্রো সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলেছিলেন যে, কিউবার সামরিক বাহিনী আগে থেকেই যেকোনো আকাশপথের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কড়া নির্দেশনা পেয়েছিল, তবে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাউল কাস্ত্রো বিমান দুটি ধ্বংস করার জন্য কোনো সরাসরি বা তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেননি। হাভানার স্থানীয় বাসিন্দা এলিয়েসের দিয়াজ এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ১৯৯৬ সালে কিউবা যেভাবে শত্রুর হাত থেকে নিজেদের আত্মরক্ষা করেছিল, আজকেও ঠিক একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মতে, সেটি ছিল কিউবার ওপর এক ধরনের সুদূরপ্রসারী বিদেশি আগ্রাসন, আর যেকোনো স্বাধীন দেশের অধিকার রয়েছে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করার। তাই এত বছর পর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যদি রাউল কাস্ত্রোর বিচার করতে চাওয়া হয়, তবে তা হবে এক চরম ভুল ও অন্যায় পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স।

আপনার মতামত লিখুন