দিকপাল

হরমুজে ২৪ কোটি ডলারের মার্কিন ড্রোন বিধ্বস্ত



হরমুজে ২৪ কোটি ডলারের মার্কিন ড্রোন বিধ্বস্ত
এমকিউ-৪সি ট্রাইটন নামের ওই ড্রোনটি সম্প্রতি হরমুজ প্রণালির আকাশে বিধ্বস্ত হয়

ইরানের সঙ্গে এক ধরনের টানাপোড়েনপূর্ণ, ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উন্নত নজরদারি ড্রোন বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, এমকিউ-৪সি ট্রাইটন মডেলের ড্রোনটি ৯ এপ্রিল হরমুজ প্রণালির আকাশে দুর্ঘটনায় পড়ে। ঘটনাটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা কিনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো জটিলতা রয়েছে তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

নেভাল সেফটি কমান্ড এই ঘটনাকে ‘ক্লাস এ মিশ্যাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সাধারণত এমন শ্রেণিবিন্যাস তখনই করা হয়, যখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দুই মিলিয়ন ডলারের বেশি হয়, অথবা সম্পূর্ণ প্ল্যাটফর্মটি হারিয়ে যায়। এই নির্দিষ্ট ড্রোনটির মূল্য প্রায় ২৩৮ মিলিয়ন ডলার সংখ্যাটি নিজেই বোঝায়, এটি কেবল একটি উড়োজাহাজ নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। ফলে এর ক্ষতি আর্থিক দিক ছাড়িয়ে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতার প্রশ্নও উত্থাপন করছে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা থেকে যে চিত্রটি পাওয়া যায়, তা কিছুটা উদ্বেগজনক। ‘ভিভিপিই৮০৪’ কলসাইন ব্যবহার করে ড্রোনটি প্রায় তিন ঘণ্টার একটি নিয়মিত নজরদারি মিশনে ছিল। ইতালির সিগোনেলা ঘাঁটিতে ফেরার পথে হঠাৎই এটি জরুরি সংকেত পাঠাতে শুরু করে। ট্রান্সপন্ডারে ৭৭০০ কোড দেখা যায় যা সাধারণত আকাশে সংকটময় পরিস্থিতির নির্দেশক। এরপর দ্রুত উচ্চতা হারানোর ঘটনা ঘটে; প্রায় ৫০ হাজার ফুট থেকে নেমে এটি অল্প সময়ের মধ্যে ১০ হাজার ফুটের নিচে চলে আসে। তারপরই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই দ্রুত পতনটি যান্ত্রিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত দিতে পারে, যদিও এটি একমাত্র সম্ভাবনা বলে ধরে নেওয়া হয়তো তাড়াহুড়ো হবে।

নর্থরপ গ্রুম্যান নির্মিত এই ট্রাইটনকে প্রায়ই ‘ডানা-ওয়ালা স্যাটেলাইট’ বলা হয় উপমাটি কিছুটা অতিরঞ্জিত শোনালেও এর সক্ষমতার দিক থেকে পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রভিত্তিক নজরদারি চালাতে পারে এমন প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাই একটি ইউনিট হারানো মানে শুধু সরঞ্জামের ক্ষতি নয়, বরং নজরদারির ধারাবাহিকতায়ও সম্ভাব্য ফাঁক তৈরি হওয়া।

মার্কিন নৌবাহিনী এখনো পর্যন্ত কোনো শত্রুপক্ষকে দায়ী করেনি। এই নীরবতা ইঙ্গিতপূর্ণ হতে পারে হয়তো তারা নিশ্চিত নয়, কিংবা বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হওয়ার আগে প্রমাণ সংগ্রহ করতে চাচ্ছে। একই সময়ে ঘটনাটি যে প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক এমনিতেই অস্থির; ফলে এই দুর্ঘটনা কেবল প্রযুক্তিগত ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবে, এমনটা ধরে নেওয়া কঠিন।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, যান্ত্রিক ত্রুটি একটি বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা হতে পারে। তবু আরেকটি উদ্বেগ রয়ে যায় ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ কোথায় পড়েছে এবং তা কার হাতে যেতে পারে। যদি প্রতিপক্ষ কোনোভাবে এটির সংবেদনশীল প্রযুক্তি বা ডেটা উদ্ধার করতে পারে, তাহলে তা ভবিষ্যৎ সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এই আশঙ্কা একেবারে নতুন নয়; আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ অনেক সময়ই অপ্রত্যাশিত কৌশলগত সুবিধা এনে দেয়।

তদন্ত ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, তবে এমন ঘটনার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণে সময় লাগাই স্বাভাবিক। এর মধ্যে পারস্য উপসাগরের বিতর্কিত জলসীমায় নজরদারি আরও সতর্কভাবে চালানো হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। শেষ পর্যন্ত, এই ঘটনাটি হয়তো একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হবে অথবা এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের আরেকটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হিসেবেও সামনে আসতে পারে। এখনই কোনো একক ব্যাখ্যায় স্থির হওয়া, অন্তত এই পর্যায়ে, কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে হয়।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


হরমুজে ২৪ কোটি ডলারের মার্কিন ড্রোন বিধ্বস্ত

প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ইরানের সঙ্গে এক ধরনের টানাপোড়েনপূর্ণ, ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উন্নত নজরদারি ড্রোন বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, এমকিউ-৪সি ট্রাইটন মডেলের ড্রোনটি ৯ এপ্রিল হরমুজ প্রণালির আকাশে দুর্ঘটনায় পড়ে। ঘটনাটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা কিনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো জটিলতা রয়েছে তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

নেভাল সেফটি কমান্ড এই ঘটনাকে ‘ক্লাস এ মিশ্যাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সাধারণত এমন শ্রেণিবিন্যাস তখনই করা হয়, যখন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দুই মিলিয়ন ডলারের বেশি হয়, অথবা সম্পূর্ণ প্ল্যাটফর্মটি হারিয়ে যায়। এই নির্দিষ্ট ড্রোনটির মূল্য প্রায় ২৩৮ মিলিয়ন ডলার সংখ্যাটি নিজেই বোঝায়, এটি কেবল একটি উড়োজাহাজ নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। ফলে এর ক্ষতি আর্থিক দিক ছাড়িয়ে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতার প্রশ্নও উত্থাপন করছে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা থেকে যে চিত্রটি পাওয়া যায়, তা কিছুটা উদ্বেগজনক। ‘ভিভিপিই৮০৪’ কলসাইন ব্যবহার করে ড্রোনটি প্রায় তিন ঘণ্টার একটি নিয়মিত নজরদারি মিশনে ছিল। ইতালির সিগোনেলা ঘাঁটিতে ফেরার পথে হঠাৎই এটি জরুরি সংকেত পাঠাতে শুরু করে। ট্রান্সপন্ডারে ৭৭০০ কোড দেখা যায় যা সাধারণত আকাশে সংকটময় পরিস্থিতির নির্দেশক। এরপর দ্রুত উচ্চতা হারানোর ঘটনা ঘটে; প্রায় ৫০ হাজার ফুট থেকে নেমে এটি অল্প সময়ের মধ্যে ১০ হাজার ফুটের নিচে চলে আসে। তারপরই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই দ্রুত পতনটি যান্ত্রিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত দিতে পারে, যদিও এটি একমাত্র সম্ভাবনা বলে ধরে নেওয়া হয়তো তাড়াহুড়ো হবে।

নর্থরপ গ্রুম্যান নির্মিত এই ট্রাইটনকে প্রায়ই ‘ডানা-ওয়ালা স্যাটেলাইট’ বলা হয় উপমাটি কিছুটা অতিরঞ্জিত শোনালেও এর সক্ষমতার দিক থেকে পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রভিত্তিক নজরদারি চালাতে পারে এমন প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাই একটি ইউনিট হারানো মানে শুধু সরঞ্জামের ক্ষতি নয়, বরং নজরদারির ধারাবাহিকতায়ও সম্ভাব্য ফাঁক তৈরি হওয়া।

মার্কিন নৌবাহিনী এখনো পর্যন্ত কোনো শত্রুপক্ষকে দায়ী করেনি। এই নীরবতা ইঙ্গিতপূর্ণ হতে পারে হয়তো তারা নিশ্চিত নয়, কিংবা বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হওয়ার আগে প্রমাণ সংগ্রহ করতে চাচ্ছে। একই সময়ে ঘটনাটি যে প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক এমনিতেই অস্থির; ফলে এই দুর্ঘটনা কেবল প্রযুক্তিগত ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবে, এমনটা ধরে নেওয়া কঠিন।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, যান্ত্রিক ত্রুটি একটি বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা হতে পারে। তবু আরেকটি উদ্বেগ রয়ে যায় ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ কোথায় পড়েছে এবং তা কার হাতে যেতে পারে। যদি প্রতিপক্ষ কোনোভাবে এটির সংবেদনশীল প্রযুক্তি বা ডেটা উদ্ধার করতে পারে, তাহলে তা ভবিষ্যৎ সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এই আশঙ্কা একেবারে নতুন নয়; আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ অনেক সময়ই অপ্রত্যাশিত কৌশলগত সুবিধা এনে দেয়।

তদন্ত ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, তবে এমন ঘটনার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণে সময় লাগাই স্বাভাবিক। এর মধ্যে পারস্য উপসাগরের বিতর্কিত জলসীমায় নজরদারি আরও সতর্কভাবে চালানো হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। শেষ পর্যন্ত, এই ঘটনাটি হয়তো একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হবে অথবা এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের আরেকটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হিসেবেও সামনে আসতে পারে। এখনই কোনো একক ব্যাখ্যায় স্থির হওয়া, অন্তত এই পর্যায়ে, কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে হয়।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল