দিকপাল

ইসরাইল ইস্যুতে কাজ করতে অস্বীকৃতি, চাকরি হারালেন গুগল ইঞ্জিনিয়ার


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বুধবার, ২০ মে ২০২৬ | ০২:১৬ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসরাইল ইস্যুতে কাজ করতে অস্বীকৃতি, চাকরি হারালেন গুগল ইঞ্জিনিয়ার

ইসরাইল সরকারের সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যকলাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অনৈতিক ব্যবহারের তীব্র প্রতিবাদ করায় এক ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এআই প্রকৌশলীকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগলের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী প্রকৌশলী যুক্তরাজ্যের একটি কর্মসংস্থান ট্রাইব্যুনালে গুগলের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামাজিক, নৈতিক ও মানবিক প্রভাব নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে তুমুল উদ্বেগ ও বিতর্ক চলছে, ঠিক তখনই এই চাঞ্চল্যকর বরখাস্তের বিষয়টি প্রকাশ্যে এল।

আদালতে দায়ের করা অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ওই ফিলিস্তিনি প্রকৌশলী লন্ডনে অবস্থিত গুগলের বিশ্বখ্যাত এআই গবেষণা কেন্দ্র ‘ডিপমাইন্ড’ কার্যালয়ে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন। গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরতা ও গণহত্যার পেছনে গুগলের প্রযুক্তির অপব্যবহার দেখে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হন। একপর্যায়ে তিনি অফিসের সহকর্মীদের মাঝে একটি লিফলেট বা সচেতনতামূলক ফ্লায়ার বিতরণ করেন। যেখানে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লেখা ছিল যে, গুগল সরাসরি সেই সামরিক বাহিনীকে এআই প্রযুক্তি সরবরাহ করছে যারা বর্তমানে একটি জাতির ওপর পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালাচ্ছে। একই সাথে তিনি সহকর্মীদের বিবেককে জাগ্রত করতে প্রশ্ন তোলেন, মানবতার ধ্বংসযজ্ঞের অংশ হয়ে মাস শেষে যে বেতন পাওয়া যাচ্ছে, তা কি সত্যিই নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য? এর পাশাপাশি তিনি সহকর্মীদের ইমেইল পাঠিয়ে গুগলের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান, যেখানে কোম্পানিটি পূর্বে দেওয়া মানুষের ক্ষতি না করার এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলার অঙ্গীকার থেকে সম্পূর্ণ সরে আসে। তিনি কর্মীদের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে একটি শক্তিশালী সংগঠন বা ইউনিয়ন গড়ে তোলারও আহ্বান জানান।

ট্রাইব্যুনালে ওই কর্মী উল্লেখ করেছেন, কোনো মানুষেরই যুদ্ধাপরাধ কিংবা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সহযোগী হওয়া উচিত নয়—এই গভীর ব্যক্তিগত ও নৈতিক বিশ্বাসের কারণে গুগল তার ওপর চরম প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে এবং বৈষম্যমূলক আচরণ করে। গত সেপ্টেম্বর মাসে মানবসম্পদ বিভাগের সাথে কয়েকটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর গুগল দাবি করে যে ওই কর্মী নিজ ইচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, যা ভুক্তভোগী প্রকৌশলী সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। পরবর্তীতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে জানান, একটি ফ্রন্টিয়ার এআই ল্যাবে কাজ করা তার শৈশবের লালিত স্বপ্ন ছিল। কিন্তু গুগল একের পর এক যুদ্ধংদেহী চুক্তি স্বাক্ষর করার পর তার সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তিনি প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় তীব্র অপরাধবোধে ভুগতেন এবং মনে হতো তিনি নিজের বিপন্ন মানুষ ও পুরো মানবতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।

অবশ্য গুগল ডিপমাইন্ড কর্তৃপক্ষ এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, কোনো কর্মীকে স্বাধীন মতপ্রকাশ বা গঠনমূলক আলোচনার জন্য বরখাস্ত করা হয় না। তবে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মুনাফার লোভে গুগলের এআই নীতিমালার নেতিবাচক পরিবর্তন কর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করেছে এবং কেবল নৈতিকতার খাতিরেই ইতিমধ্যে অনেক শীর্ষস্থানীয় গবেষক চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। শুরুর দিকে যারা ক্যানসার নিরাময়ের মতো মহৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহারের স্বপ্ন দেখতেন, তারা এখন এই প্রযুক্তির বিধ্বংসী ও সামরিক রূপ দেখে চরমভাবে হতাশ। বিশেষ করে, গাজা সংঘাতের সময় ইসরাইল সরকারের সাথে গুগল ও আমাজনের বিশাল অঙ্কের ‘প্রোজেক্ট নিম্বাস’ নামক ক্লাউড কম্পিউটিং চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ কর্মীদের মধ্যে বিক্ষোভ চলছে, কারণ ইসরাইলি কর্মকর্তারা নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে এই প্রযুক্তি যুদ্ধে তাদের অভূতপূর্ব সুবিধা দিচ্ছে।

এই আইনি লড়াইয়ে ফিলিস্তিনি প্রকৌশলীর পাশে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তি খাতের ন্যায়বিচার বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক প্রচারণা গোষ্ঠী। সংগঠনটির শীর্ষ কর্তারা বলছেন, সংঘাত ও নজরদারি সংক্রান্ত যে মানবিক নীতিগুলো গুগল গত বছর বিসর্জন দিয়েছে, ওই প্রকৌশলী কেবল সেগুলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার সতর্কতা শোনার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি অভ্যন্তরীণ কণ্ঠরোধ করতে তাকে অন্যায়ভাবে সরিয়ে দিয়েছে। এআই প্রযুক্তির এমন অনৈতিক ও সামরিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে এখন কেবল গুগল কর্মীরাই নন, বরং সাধারণ মানুষ এবং বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীরাও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন, যা প্রযুক্তি দুনিয়ায় এক নতুন ঐতিহাসিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মূল সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


ইসরাইল ইস্যুতে কাজ করতে অস্বীকৃতি, চাকরি হারালেন গুগল ইঞ্জিনিয়ার

প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬

featured Image

ইসরাইল সরকারের সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যকলাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অনৈতিক ব্যবহারের তীব্র প্রতিবাদ করায় এক ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এআই প্রকৌশলীকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগলের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী প্রকৌশলী যুক্তরাজ্যের একটি কর্মসংস্থান ট্রাইব্যুনালে গুগলের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামাজিক, নৈতিক ও মানবিক প্রভাব নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে তুমুল উদ্বেগ ও বিতর্ক চলছে, ঠিক তখনই এই চাঞ্চল্যকর বরখাস্তের বিষয়টি প্রকাশ্যে এল।

আদালতে দায়ের করা অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ওই ফিলিস্তিনি প্রকৌশলী লন্ডনে অবস্থিত গুগলের বিশ্বখ্যাত এআই গবেষণা কেন্দ্র ‘ডিপমাইন্ড’ কার্যালয়ে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন। গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরতা ও গণহত্যার পেছনে গুগলের প্রযুক্তির অপব্যবহার দেখে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হন। একপর্যায়ে তিনি অফিসের সহকর্মীদের মাঝে একটি লিফলেট বা সচেতনতামূলক ফ্লায়ার বিতরণ করেন। যেখানে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লেখা ছিল যে, গুগল সরাসরি সেই সামরিক বাহিনীকে এআই প্রযুক্তি সরবরাহ করছে যারা বর্তমানে একটি জাতির ওপর পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালাচ্ছে। একই সাথে তিনি সহকর্মীদের বিবেককে জাগ্রত করতে প্রশ্ন তোলেন, মানবতার ধ্বংসযজ্ঞের অংশ হয়ে মাস শেষে যে বেতন পাওয়া যাচ্ছে, তা কি সত্যিই নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য? এর পাশাপাশি তিনি সহকর্মীদের ইমেইল পাঠিয়ে গুগলের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান, যেখানে কোম্পানিটি পূর্বে দেওয়া মানুষের ক্ষতি না করার এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলার অঙ্গীকার থেকে সম্পূর্ণ সরে আসে। তিনি কর্মীদের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে একটি শক্তিশালী সংগঠন বা ইউনিয়ন গড়ে তোলারও আহ্বান জানান।

ট্রাইব্যুনালে ওই কর্মী উল্লেখ করেছেন, কোনো মানুষেরই যুদ্ধাপরাধ কিংবা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সহযোগী হওয়া উচিত নয়—এই গভীর ব্যক্তিগত ও নৈতিক বিশ্বাসের কারণে গুগল তার ওপর চরম প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে এবং বৈষম্যমূলক আচরণ করে। গত সেপ্টেম্বর মাসে মানবসম্পদ বিভাগের সাথে কয়েকটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর গুগল দাবি করে যে ওই কর্মী নিজ ইচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, যা ভুক্তভোগী প্রকৌশলী সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। পরবর্তীতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে জানান, একটি ফ্রন্টিয়ার এআই ল্যাবে কাজ করা তার শৈশবের লালিত স্বপ্ন ছিল। কিন্তু গুগল একের পর এক যুদ্ধংদেহী চুক্তি স্বাক্ষর করার পর তার সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তিনি প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় তীব্র অপরাধবোধে ভুগতেন এবং মনে হতো তিনি নিজের বিপন্ন মানুষ ও পুরো মানবতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।

অবশ্য গুগল ডিপমাইন্ড কর্তৃপক্ষ এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, কোনো কর্মীকে স্বাধীন মতপ্রকাশ বা গঠনমূলক আলোচনার জন্য বরখাস্ত করা হয় না। তবে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মুনাফার লোভে গুগলের এআই নীতিমালার নেতিবাচক পরিবর্তন কর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করেছে এবং কেবল নৈতিকতার খাতিরেই ইতিমধ্যে অনেক শীর্ষস্থানীয় গবেষক চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। শুরুর দিকে যারা ক্যানসার নিরাময়ের মতো মহৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহারের স্বপ্ন দেখতেন, তারা এখন এই প্রযুক্তির বিধ্বংসী ও সামরিক রূপ দেখে চরমভাবে হতাশ। বিশেষ করে, গাজা সংঘাতের সময় ইসরাইল সরকারের সাথে গুগল ও আমাজনের বিশাল অঙ্কের ‘প্রোজেক্ট নিম্বাস’ নামক ক্লাউড কম্পিউটিং চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ কর্মীদের মধ্যে বিক্ষোভ চলছে, কারণ ইসরাইলি কর্মকর্তারা নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে এই প্রযুক্তি যুদ্ধে তাদের অভূতপূর্ব সুবিধা দিচ্ছে।

এই আইনি লড়াইয়ে ফিলিস্তিনি প্রকৌশলীর পাশে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তি খাতের ন্যায়বিচার বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক প্রচারণা গোষ্ঠী। সংগঠনটির শীর্ষ কর্তারা বলছেন, সংঘাত ও নজরদারি সংক্রান্ত যে মানবিক নীতিগুলো গুগল গত বছর বিসর্জন দিয়েছে, ওই প্রকৌশলী কেবল সেগুলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার সতর্কতা শোনার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি অভ্যন্তরীণ কণ্ঠরোধ করতে তাকে অন্যায়ভাবে সরিয়ে দিয়েছে। এআই প্রযুক্তির এমন অনৈতিক ও সামরিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে এখন কেবল গুগল কর্মীরাই নন, বরং সাধারণ মানুষ এবং বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীরাও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন, যা প্রযুক্তি দুনিয়ায় এক নতুন ঐতিহাসিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মূল সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল