বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া বর্তমানে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বংশগত এই রক্তস্বল্পতার রোগটি দেশে এখন ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। ‘অরফানেট জার্নাল অব রেয়ার ডিজিজেস’-এ প্রকাশিত বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) একটি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০.৯ থেকে ১৩.৩ শতাংশ মানুষই থ্যালাসেমিয়ার বাহক। অর্থাৎ, ১ কোটি ৭০ লাখ থেকে শুরু করে ২ কোটি ২০ লাখের মতো বিশাল এক জনগোষ্ঠী অজান্তেই এই রোগের জিন বহন করে বেড়াচ্ছেন। সচেতনতার চরম অভাব এবং অপর্যাপ্ত চিকিৎসা কাঠামোর কারণে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
থ্যালাসেমিয়া মূলত এমন একটি বংশগত ব্যাধি, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর স্বাভাবিক বা পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। এর ফলে রোগীরা দীর্ঘস্থায়ী রক্তস্বল্পতায় ভোগেন এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য তাদের আজীবন নিয়মিত বিরতিতে রক্ত সঞ্চালনের ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশে অধিকাংশ রোগীই ‘Hb E-বিটা’ নামক থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে ১ জন বাহক হওয়ার পরও দেশে এই রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধার অভাব প্রকট। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্র না থাকা এবং নিরাপদ রক্তের তীব্র সংকটের কারণে রোগীদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশই বহন করতে হয় তার পরিবারকে, যা অনেক পরিবারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, থ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, বরং এটি জেনেটিকভাবে বাবা-মা থেকে সন্তানের দেহে স্থানান্তরিত হয়। যেহেতু এটি একটি বংশগত রোগ, তাই সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এটি শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং করা। দুজন বাহক যদি একে অপরকে বিয়ে না করেন, তবে এই রোগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়ানোর সুযোগ পায় না। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে এই পদ্ধতি অনুসরণ করে নিজেদের থ্যালাসেমিয়া মুক্ত করতে সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও এই মরণঘাতী রোগ নির্মূল করতে হলে বিয়ের আগে বাধ্যতামূলক রক্ত পরীক্ষা এবং ব্যাপক জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
গবেষকরা মনে করেন, এই সংকট মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। এর অংশ হিসেবে স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করা এবং বৃহৎ পরিসরে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। চিকিৎসার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ হবে বলে তারা মনে করেন। একটি জাতীয় রোগী নিবন্ধন ব্যবস্থা তৈরি এবং দেশব্যাপী আধুনিক চিকিৎসা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই অভিশাপ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
সূত্র: বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (বিআরএফ) এবং অরফানেট জার্নাল অব রেয়ার ডিজিজেস।

রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া বর্তমানে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বংশগত এই রক্তস্বল্পতার রোগটি দেশে এখন ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। ‘অরফানেট জার্নাল অব রেয়ার ডিজিজেস’-এ প্রকাশিত বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) একটি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০.৯ থেকে ১৩.৩ শতাংশ মানুষই থ্যালাসেমিয়ার বাহক। অর্থাৎ, ১ কোটি ৭০ লাখ থেকে শুরু করে ২ কোটি ২০ লাখের মতো বিশাল এক জনগোষ্ঠী অজান্তেই এই রোগের জিন বহন করে বেড়াচ্ছেন। সচেতনতার চরম অভাব এবং অপর্যাপ্ত চিকিৎসা কাঠামোর কারণে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
থ্যালাসেমিয়া মূলত এমন একটি বংশগত ব্যাধি, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর স্বাভাবিক বা পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। এর ফলে রোগীরা দীর্ঘস্থায়ী রক্তস্বল্পতায় ভোগেন এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য তাদের আজীবন নিয়মিত বিরতিতে রক্ত সঞ্চালনের ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশে অধিকাংশ রোগীই ‘Hb E-বিটা’ নামক থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে ১ জন বাহক হওয়ার পরও দেশে এই রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধার অভাব প্রকট। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্র না থাকা এবং নিরাপদ রক্তের তীব্র সংকটের কারণে রোগীদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশই বহন করতে হয় তার পরিবারকে, যা অনেক পরিবারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, থ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, বরং এটি জেনেটিকভাবে বাবা-মা থেকে সন্তানের দেহে স্থানান্তরিত হয়। যেহেতু এটি একটি বংশগত রোগ, তাই সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এটি শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং করা। দুজন বাহক যদি একে অপরকে বিয়ে না করেন, তবে এই রোগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়ানোর সুযোগ পায় না। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে এই পদ্ধতি অনুসরণ করে নিজেদের থ্যালাসেমিয়া মুক্ত করতে সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও এই মরণঘাতী রোগ নির্মূল করতে হলে বিয়ের আগে বাধ্যতামূলক রক্ত পরীক্ষা এবং ব্যাপক জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
গবেষকরা মনে করেন, এই সংকট মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। এর অংশ হিসেবে স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করা এবং বৃহৎ পরিসরে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। চিকিৎসার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ হবে বলে তারা মনে করেন। একটি জাতীয় রোগী নিবন্ধন ব্যবস্থা তৈরি এবং দেশব্যাপী আধুনিক চিকিৎসা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই অভিশাপ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
সূত্র: বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (বিআরএফ) এবং অরফানেট জার্নাল অব রেয়ার ডিজিজেস।

আপনার মতামত লিখুন