দিকপাল

আইনি লড়াইয়ে সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা উচ্চ আদালতে ডজনখানেক নেতার জামিন আবেদন



আইনি লড়াইয়ে সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা উচ্চ আদালতে ডজনখানেক নেতার জামিন আবেদন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপিদের রাজনৈতিক ভাগ্য নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। দেশজুড়ে দায়ের হওয়া অসংখ্য হত্যা ও সহিংসতার মামলায় অভিযুক্ত হয়ে বর্তমানে শ্রীঘরে দিন কাটছে দলটির অনেক হেভিওয়েট নেতার। দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকার পর এবার আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে কারামুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের সাবেক প্রায় এক ডজন মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতা জামিনের আশায় উচ্চ আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

আইনি লড়াইয়ের এই তালিকায় শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছেন সাবেক রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, প্রখ্যাত অভিনেতা ও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বরা। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ আল জ্যাকব, সংগীতশিল্পী ও সাবেক এমপি মমতাজ বেগম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত সাবেক এমপি ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনসহ আরও বেশ কয়েকজন নেতা হাইকোর্টে জামিন আবেদন জমা দিয়েছেন। এসব আবেদনের শুনানি বর্তমানে বিভিন্ন বেঞ্চে চলমান রয়েছে।

বিশেষ করে সাবেক রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের বিষয়টি বেশ আলোচনায় রয়েছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগসহ মোট তিনটি মামলায় তিনি জামিন প্রার্থনা করেছেন। গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেফতারের পর কয়েক দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। বিচারপতি জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আগামী ৫ মে এই মামলাগুলোতে আদেশ দেওয়ার জন্য দিন ধার্য করেছেন। অন্যদিকে, প্রবীণ অভিনেতা ও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরও জামিনের অপেক্ষায় রয়েছেন। মিরপুর এলাকায় কিশোর সিয়াম সরদার হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তার আবেদনটি হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

আরেক প্রভাবশালী নেতা র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর ক্ষেত্রে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেছেন। ২০২২ সালে বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে অভিযান এবং কর্মী মকবুলকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে কেন জামিন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়েছেন আদালত। গত ২৮ এপ্রিল এই রুল জারি করা হয়। ভোলা-৪ আসনের সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ আল জ্যাকবের অবস্থাও তথৈবচ। রূপনগরে শামীম হাওলাদার হত্যা মামলায় ১২২ নম্বর আসামি হিসেবে তিনি বর্তমানে কারাবন্দি এবং জামিন পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে রাজনীতিতে আসা মমতাজ বেগমের বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় সাগর হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। বিচারপতি জাহিদ সারওয়ারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ তার জামিনের প্রশ্নে রুল জারি করেছেন। এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে সবসময় সরব থাকা ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের বিরুদ্ধে খিলগাঁও ও আদাবর থানার দুটি হত্যা মামলা রুজু হয়েছে। তার জামিন সংক্রান্ত রুলটিও বর্তমানে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এই তালিকায় আরও নাম রয়েছে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু এবং সাবেক এমপি তানভীর ইমামের।

তবে এই জামিন প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করছে রাষ্ট্রপক্ষ। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আলামিন এ বিষয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালানো হয়েছে, তার দায়ভার এই নেতারা এড়াতে পারেন না। বিশেষ করে জুলাই হত্যাকাণ্ডে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উসকানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের মতে, প্রতিটি মামলায় তাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে এবং এই মুহূর্তে তাদের জামিন দেওয়া হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও স্বাভাবিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়তে পারে। ফলে এসব প্রভাবশালী নেতার কারামুক্তি আটকাতে আদালতকে জোরালো যুক্তি দেখাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ। এখন দেখার বিষয়, উচ্চ আদালত তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত দেন।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

রোববার, ০৩ মে ২০২৬


আইনি লড়াইয়ে সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা উচ্চ আদালতে ডজনখানেক নেতার জামিন আবেদন

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬

featured Image

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপিদের রাজনৈতিক ভাগ্য নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। দেশজুড়ে দায়ের হওয়া অসংখ্য হত্যা ও সহিংসতার মামলায় অভিযুক্ত হয়ে বর্তমানে শ্রীঘরে দিন কাটছে দলটির অনেক হেভিওয়েট নেতার। দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকার পর এবার আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে কারামুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের সাবেক প্রায় এক ডজন মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতা জামিনের আশায় উচ্চ আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

আইনি লড়াইয়ের এই তালিকায় শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছেন সাবেক রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, প্রখ্যাত অভিনেতা ও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বরা। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ আল জ্যাকব, সংগীতশিল্পী ও সাবেক এমপি মমতাজ বেগম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত সাবেক এমপি ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনসহ আরও বেশ কয়েকজন নেতা হাইকোর্টে জামিন আবেদন জমা দিয়েছেন। এসব আবেদনের শুনানি বর্তমানে বিভিন্ন বেঞ্চে চলমান রয়েছে।

বিশেষ করে সাবেক রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের বিষয়টি বেশ আলোচনায় রয়েছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগসহ মোট তিনটি মামলায় তিনি জামিন প্রার্থনা করেছেন। গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেফতারের পর কয়েক দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। বিচারপতি জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আগামী ৫ মে এই মামলাগুলোতে আদেশ দেওয়ার জন্য দিন ধার্য করেছেন। অন্যদিকে, প্রবীণ অভিনেতা ও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরও জামিনের অপেক্ষায় রয়েছেন। মিরপুর এলাকায় কিশোর সিয়াম সরদার হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তার আবেদনটি হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

আরেক প্রভাবশালী নেতা র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর ক্ষেত্রে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেছেন। ২০২২ সালে বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে অভিযান এবং কর্মী মকবুলকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে কেন জামিন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়েছেন আদালত। গত ২৮ এপ্রিল এই রুল জারি করা হয়। ভোলা-৪ আসনের সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ আল জ্যাকবের অবস্থাও তথৈবচ। রূপনগরে শামীম হাওলাদার হত্যা মামলায় ১২২ নম্বর আসামি হিসেবে তিনি বর্তমানে কারাবন্দি এবং জামিন পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে রাজনীতিতে আসা মমতাজ বেগমের বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় সাগর হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। বিচারপতি জাহিদ সারওয়ারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ তার জামিনের প্রশ্নে রুল জারি করেছেন। এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে সবসময় সরব থাকা ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের বিরুদ্ধে খিলগাঁও ও আদাবর থানার দুটি হত্যা মামলা রুজু হয়েছে। তার জামিন সংক্রান্ত রুলটিও বর্তমানে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এই তালিকায় আরও নাম রয়েছে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু এবং সাবেক এমপি তানভীর ইমামের।

তবে এই জামিন প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করছে রাষ্ট্রপক্ষ। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আলামিন এ বিষয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালানো হয়েছে, তার দায়ভার এই নেতারা এড়াতে পারেন না। বিশেষ করে জুলাই হত্যাকাণ্ডে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উসকানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের মতে, প্রতিটি মামলায় তাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে এবং এই মুহূর্তে তাদের জামিন দেওয়া হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও স্বাভাবিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়তে পারে। ফলে এসব প্রভাবশালী নেতার কারামুক্তি আটকাতে আদালতকে জোরালো যুক্তি দেখাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ। এখন দেখার বিষয়, উচ্চ আদালত তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত দেন।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল