দেশের অপরাধ জগতে দশকের পর দশক ধরে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে কলকাঠি নাড়ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেউ দেশের সীমানার ভেতর থেকে আবার কেউ সুদূর প্রবাসে বসেই নিয়ন্ত্রণ করছে ঢাকার রাজপথ। টার্গেট কিলিং, অতর্কিত গুলি আর বিদেশি নম্বর থেকে আসা প্রাণনাশের হুমকি এখন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই লড়াইয়ে দাগি আসামিদের পাশাপাশি এখন নতুন করে উঠে আসছে পর্দার আড়ালে থাকা তরুণ শুটারদের নাম। স্বার্থের সামান্য সংঘাত হলেই সহযোগীদের পাঠিয়ে পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে দ্বিধা করছে না এই খুনি চক্র, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির পশুর হাটের ইজারা এবং এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ। সম্প্রতি রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যার ঘটনাটি এই উত্তাপের এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। যদিও প্রাথমিক তদন্তে বসিলা পশুর হাটের ইজারা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের কথা উঠে এসেছে, তবে গোয়েন্দারা মনে করছেন এর পেছনে আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ রয়েছে। গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুর এবং রায়েরবাজার হয়ে লালবাগ পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন, যিনি বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় অবস্থান করছেন বলে জানা যায়। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, নিহত টিটন ইমনের শ্যালক হওয়া সত্ত্বেও এই হত্যাকাণ্ডে ইমনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রযুক্তির সহায়তায় জানতে পেরেছে যে, সানজিদুল ইসলাম ইমন ছাড়াও বাড্ডার মেহেদী হাসান এবং আরও কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী নিয়মিতভাবে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, টার্গেট কিলিং বা ব্যক্তিগত ক্ষতির ভয়ে ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে তারা সন্ত্রাসীদের সাথে আপসরফা করে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, পোশাক কারখানার ঝুট, আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ থেকে শুরু করে বড় বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে এই সন্ত্রাসীদের কদর অপরাধ জগতে যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, প্রযুক্তির ব্যবহারে সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে থাকে। এছাড়া প্রশাসনের ভেতরে থাকা কোনো কোনো কর্মকর্তার সাথে সন্ত্রাসীদের সখ্যের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। ফলে কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে কিংবা দেশের বাইরে পালিয়ে থেকে তারা অনায়াসেই নিজেদের অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আশ্বাস দিয়েছেন যে, জামিনে থাকা বা চিহ্নিত অপরাধীদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
বর্তমানে অপরাধ জগতের এই অস্থিরতায় আলোচনায় উঠে এসেছে পিচ্চি হেলাল, কিলার আব্বাস, শাহাদাত হোসেন, জিসান এবং ফ্রিডম রাসুর মতো দুর্ধর্ষ নামগুলো। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই সংঘাত থামাতে হলে কেবল মাঠ পর্যায়ের শুটারদের ধরলে চলবে না, বরং পর্দার আড়ালে থাকা মূল পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করা জরুরি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) জানিয়েছে, অপরাধী দেশের ভেতরে থাকুক বা বাইরে, তাদের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, দৃশ্যমান ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই অন্ধকার ছায়া থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে না।

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
দেশের অপরাধ জগতে দশকের পর দশক ধরে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে কলকাঠি নাড়ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেউ দেশের সীমানার ভেতর থেকে আবার কেউ সুদূর প্রবাসে বসেই নিয়ন্ত্রণ করছে ঢাকার রাজপথ। টার্গেট কিলিং, অতর্কিত গুলি আর বিদেশি নম্বর থেকে আসা প্রাণনাশের হুমকি এখন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই লড়াইয়ে দাগি আসামিদের পাশাপাশি এখন নতুন করে উঠে আসছে পর্দার আড়ালে থাকা তরুণ শুটারদের নাম। স্বার্থের সামান্য সংঘাত হলেই সহযোগীদের পাঠিয়ে পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে দ্বিধা করছে না এই খুনি চক্র, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির পশুর হাটের ইজারা এবং এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ। সম্প্রতি রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যার ঘটনাটি এই উত্তাপের এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। যদিও প্রাথমিক তদন্তে বসিলা পশুর হাটের ইজারা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের কথা উঠে এসেছে, তবে গোয়েন্দারা মনে করছেন এর পেছনে আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ রয়েছে। গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুর এবং রায়েরবাজার হয়ে লালবাগ পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন, যিনি বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় অবস্থান করছেন বলে জানা যায়। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, নিহত টিটন ইমনের শ্যালক হওয়া সত্ত্বেও এই হত্যাকাণ্ডে ইমনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রযুক্তির সহায়তায় জানতে পেরেছে যে, সানজিদুল ইসলাম ইমন ছাড়াও বাড্ডার মেহেদী হাসান এবং আরও কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী নিয়মিতভাবে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, টার্গেট কিলিং বা ব্যক্তিগত ক্ষতির ভয়ে ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে তারা সন্ত্রাসীদের সাথে আপসরফা করে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, পোশাক কারখানার ঝুট, আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ থেকে শুরু করে বড় বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে এই সন্ত্রাসীদের কদর অপরাধ জগতে যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, প্রযুক্তির ব্যবহারে সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে থাকে। এছাড়া প্রশাসনের ভেতরে থাকা কোনো কোনো কর্মকর্তার সাথে সন্ত্রাসীদের সখ্যের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। ফলে কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে কিংবা দেশের বাইরে পালিয়ে থেকে তারা অনায়াসেই নিজেদের অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আশ্বাস দিয়েছেন যে, জামিনে থাকা বা চিহ্নিত অপরাধীদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
বর্তমানে অপরাধ জগতের এই অস্থিরতায় আলোচনায় উঠে এসেছে পিচ্চি হেলাল, কিলার আব্বাস, শাহাদাত হোসেন, জিসান এবং ফ্রিডম রাসুর মতো দুর্ধর্ষ নামগুলো। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই সংঘাত থামাতে হলে কেবল মাঠ পর্যায়ের শুটারদের ধরলে চলবে না, বরং পর্দার আড়ালে থাকা মূল পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করা জরুরি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) জানিয়েছে, অপরাধী দেশের ভেতরে থাকুক বা বাইরে, তাদের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, দৃশ্যমান ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই অন্ধকার ছায়া থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে না।

আপনার মতামত লিখুন