রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে লক্কড়ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দাপটে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা এখন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন লাখো কর্মজীবী মানুষ অমানবিক কষ্ট আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব ভাঙাচোরা গাড়িতে যাতায়াত করছেন। একদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ বিষিয়ে উঠছে, অন্যদিকে সড়কের মাঝপথে গাড়ি বিকল হয়ে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও ২০ বছরের বেশি পুরোনো এসব বাস-মিনিবাসের দৌরাত্ম্য কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না, যা এখন জনদুর্ভোগের পাশাপাশি ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিআরটিএর বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, একটি বাস বা মিনিবাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল বা ইকোনমিক লাইফ ধরা হয় ২০ বছর এবং ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের ক্ষেত্রে ২৫ বছর। তবে সরকারি হালনাগাদ পরিসংখ্যান এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। বর্তমানে সারা দেশে ৩৯ হাজার ১৬৯টি বাস-মিনিবাস এবং ৪১ হাজার ১৪০টি পণ্যবাহী যানবাহন তাদের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, সড়কে চলাচলকারী প্রায় ৮০ হাজার ভারী যানবাহন এখন সচল ‘মৃত্যুফাঁদ’। গত ২০২৩ সালে স্ক্র্যাপিং নির্দেশিকা প্রণয়নের মাধ্যমে এসব পুরোনো গাড়ি সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রবল চাপে সেই পরিকল্পনা মাঝপথেই ভেস্তে যায়। ফলে সড়কগুলো এখনো জরাজীর্ণ যানবাহনের দখলেই রয়ে গেছে।
বর্তমানে এই সংকট সমাধানে কিছুটা কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিষয়ে তারা এখন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছেন। সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এস আহাম্মেদ খোকন স্পষ্ট করেছেন যে, বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেকোনো উচ্ছেদ অভিযানে তারা পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এক বিশেষ ঘোষণা দিয়েছে। ১০ থেকে ১৩ মে পর্যন্ত পুলিশ সপ্তাহ শেষ হওয়ার পরপরই রাজধানীতে লক্কড়ঝক্কড় যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু হবে। ডিএমপির এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ফ্লাইওভার বা সেতুর ওপর এসব গাড়ি বিকল হয়ে সাধারণ মানুষের যে ভোগান্তি তৈরি করছে, তা আর বরদাশত করা হবে না। নির্দেশনা অমান্য করলে ভারী জরিমানা ও গাড়ি ডাম্পিং করার মতো কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, পরিবহন খাতে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ নেই বললেই চলে। সড়কে মাত্রাতিরিক্ত চাঁদাবাজি, নিবন্ধন ও রোড পারমিট পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা এবং একটি প্রভাবশালী পরিবহন সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীরা নতুন ও আধুনিক বাস নামাতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে পুরোনো বাসগুলোই বারবার মেরামত করে বা রং চটিয়ে সড়কে চালানো হচ্ছে। অনেক বাসের জানালা ভাঙা, সিট নোংরা এবং বসার অনুপযোগী হলেও তীব্র যানজট ও গণপরিবহন সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই এসব ঝুঁকিপূর্ণ বাসে যাতায়াত করছেন।
সার্বিক পরিস্থিতিতে সড়ক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিবহন সেক্টরে আমূল সংস্কার এবং সিন্ডিকেট প্রথা ভেঙে না দিলে লক্কড়ঝক্কড় বাসের এই জঞ্জাল থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। যতক্ষণ পর্যন্ত সড়কে নতুন ও আধুনিক বাসের সরবরাহ নিশ্চিত না হবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিরপেক্ষভাবে কাজ না করবে, ততক্ষণ যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি আর রাজপথের এই বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকবে।

শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে লক্কড়ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দাপটে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা এখন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন লাখো কর্মজীবী মানুষ অমানবিক কষ্ট আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব ভাঙাচোরা গাড়িতে যাতায়াত করছেন। একদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ বিষিয়ে উঠছে, অন্যদিকে সড়কের মাঝপথে গাড়ি বিকল হয়ে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও ২০ বছরের বেশি পুরোনো এসব বাস-মিনিবাসের দৌরাত্ম্য কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না, যা এখন জনদুর্ভোগের পাশাপাশি ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিআরটিএর বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, একটি বাস বা মিনিবাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল বা ইকোনমিক লাইফ ধরা হয় ২০ বছর এবং ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের ক্ষেত্রে ২৫ বছর। তবে সরকারি হালনাগাদ পরিসংখ্যান এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। বর্তমানে সারা দেশে ৩৯ হাজার ১৬৯টি বাস-মিনিবাস এবং ৪১ হাজার ১৪০টি পণ্যবাহী যানবাহন তাদের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, সড়কে চলাচলকারী প্রায় ৮০ হাজার ভারী যানবাহন এখন সচল ‘মৃত্যুফাঁদ’। গত ২০২৩ সালে স্ক্র্যাপিং নির্দেশিকা প্রণয়নের মাধ্যমে এসব পুরোনো গাড়ি সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রবল চাপে সেই পরিকল্পনা মাঝপথেই ভেস্তে যায়। ফলে সড়কগুলো এখনো জরাজীর্ণ যানবাহনের দখলেই রয়ে গেছে।
বর্তমানে এই সংকট সমাধানে কিছুটা কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিষয়ে তারা এখন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছেন। সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এস আহাম্মেদ খোকন স্পষ্ট করেছেন যে, বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেকোনো উচ্ছেদ অভিযানে তারা পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এক বিশেষ ঘোষণা দিয়েছে। ১০ থেকে ১৩ মে পর্যন্ত পুলিশ সপ্তাহ শেষ হওয়ার পরপরই রাজধানীতে লক্কড়ঝক্কড় যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু হবে। ডিএমপির এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ফ্লাইওভার বা সেতুর ওপর এসব গাড়ি বিকল হয়ে সাধারণ মানুষের যে ভোগান্তি তৈরি করছে, তা আর বরদাশত করা হবে না। নির্দেশনা অমান্য করলে ভারী জরিমানা ও গাড়ি ডাম্পিং করার মতো কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, পরিবহন খাতে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ নেই বললেই চলে। সড়কে মাত্রাতিরিক্ত চাঁদাবাজি, নিবন্ধন ও রোড পারমিট পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা এবং একটি প্রভাবশালী পরিবহন সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীরা নতুন ও আধুনিক বাস নামাতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে পুরোনো বাসগুলোই বারবার মেরামত করে বা রং চটিয়ে সড়কে চালানো হচ্ছে। অনেক বাসের জানালা ভাঙা, সিট নোংরা এবং বসার অনুপযোগী হলেও তীব্র যানজট ও গণপরিবহন সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই এসব ঝুঁকিপূর্ণ বাসে যাতায়াত করছেন।
সার্বিক পরিস্থিতিতে সড়ক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিবহন সেক্টরে আমূল সংস্কার এবং সিন্ডিকেট প্রথা ভেঙে না দিলে লক্কড়ঝক্কড় বাসের এই জঞ্জাল থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। যতক্ষণ পর্যন্ত সড়কে নতুন ও আধুনিক বাসের সরবরাহ নিশ্চিত না হবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিরপেক্ষভাবে কাজ না করবে, ততক্ষণ যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি আর রাজপথের এই বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন