মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের রান্নাঘরে এসে পড়েছে। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ঋতু পরিবর্তনের কারণে সবজির উৎপাদন ঘাটতি মিলেমিশে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুললেও, অদ্ভুতভাবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের মুখে এবার হাসির ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। যদিও উৎপাদন খরচ এবং পরিবহন ভাড়া কয়েক গুণ বেড়েছে, তবুও জোগানের তুলনায় চাহিদা আকাশচুম্বী হওয়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের রেকর্ড পরিমাণ খামার মূল্য পাচ্ছেন।
উত্তরবঙ্গের সবজি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মহাস্থানগড় এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই মাসে বগুড়া থেকে রাজধানী ঢাকা কিংবা নোয়াখালীর মতো দূরপাল্লার পথে সবজি পরিবহনে ট্রাক ভাড়া প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মহাস্থান হাটের পাইকারি বাজারে সবজির দাম ইতোমধ্যেই ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যে সবজি পাইকারি বাজারে কেজি প্রতি ২৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, পরিবহন খরচ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা যোগ হয়ে ঢাকার খুচরা বাজারগুলোতে সেই একই সবজি ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ৬০ থেকে ১০০ টাকা দরে।
দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে কৃষিকাজে নিয়োজিত মহাস্থানের প্রবীণ কৃষক মাইনুল আহসান জানান, ৫ বিঘা জমিতে তিনি সারা বছরই চক্রাকারে সবজি চাষ করেন। তার মতে, অন্য ফসলের তুলনায় সবজি চাষ কয়েক গুণ বেশি লাভজনক হওয়ায় স্থানীয় ৯০ শতাংশ কৃষকই এখন ধান ছেড়ে সবজি আবাদে ঝুঁকছেন। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারে ডিজেলের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় জমিতে সেচ দেওয়া এবং ট্রাক্টর চালানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। এর ফলে ফলন গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। তবে সরবরাহ কম থাকায় বাজারে সবজির তীব্র টান পড়েছে, যার সুফল পাচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। তারা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে ফসল বিক্রি করতে পারছেন। সুধামপুরের কৃষক শাহজাহান আলী জানালেন, যে মূলা আগে ৪০০-৫০০ টাকা মণ বিক্রি করতে হিমশিম খেতে হতো, এবার তা ১২০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে।
তবে এই সুসময়ের পেছনে বড় ধরনের ঝুঁকিও দেখছেন চাষিরা। শাহজাহানপুর এলাকার কৃষক শাহ জামালের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দুষ্প্রাপ্যতা দীর্ঘমেয়াদে সবজি চাষিদের মহাবিপদে ফেলতে পারে। ট্রাকের অতিরিক্ত ভাড়া অনেক সময় কৃষকের পণ্যের দাম কমিয়ে সমন্বয় করার চেষ্টা করেন ব্যবসায়ীরা। তিনি সতর্ক করে বলেন, দাম বাড়িয়ে হলেও সরকার যদি সময়মতো সার, বীজ ও সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে উৎপাদন বিপর্যয় ঘটবে এবং ভোক্তাদের আরও চড়া মূল্য দিতে হবে।
মহাস্থানের বড় আড়ৎদাররা জানিয়েছেন, গত দুই মাস ধরে মোকামে সবজির আমদানি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। প্রতিদিন যে পরিমাণ সবজি হাটে আসছে, পাইকারদের চাহিদা তার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে কৃষক পর্যায়েই সবজির দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ট্রাক প্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া। নোয়াখালীর চৌমুহনীতে এক ট্রাক সবজি পাঠাতে আগে যেখানে ২৫ হাজার টাকা লাগত, এখন সেখানে ৩৫ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। এই বহুমুখী সংকটের কারণে সবজির বাজার এখন অস্থিতিশীল। একদিকে কৃষকের লাভ হলেও অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটছে অস্বাভাবিক অগ্নিমূল্য।

শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের রান্নাঘরে এসে পড়েছে। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ঋতু পরিবর্তনের কারণে সবজির উৎপাদন ঘাটতি মিলেমিশে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুললেও, অদ্ভুতভাবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের মুখে এবার হাসির ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। যদিও উৎপাদন খরচ এবং পরিবহন ভাড়া কয়েক গুণ বেড়েছে, তবুও জোগানের তুলনায় চাহিদা আকাশচুম্বী হওয়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের রেকর্ড পরিমাণ খামার মূল্য পাচ্ছেন।
উত্তরবঙ্গের সবজি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মহাস্থানগড় এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই মাসে বগুড়া থেকে রাজধানী ঢাকা কিংবা নোয়াখালীর মতো দূরপাল্লার পথে সবজি পরিবহনে ট্রাক ভাড়া প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মহাস্থান হাটের পাইকারি বাজারে সবজির দাম ইতোমধ্যেই ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যে সবজি পাইকারি বাজারে কেজি প্রতি ২৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, পরিবহন খরচ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা যোগ হয়ে ঢাকার খুচরা বাজারগুলোতে সেই একই সবজি ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ৬০ থেকে ১০০ টাকা দরে।
দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে কৃষিকাজে নিয়োজিত মহাস্থানের প্রবীণ কৃষক মাইনুল আহসান জানান, ৫ বিঘা জমিতে তিনি সারা বছরই চক্রাকারে সবজি চাষ করেন। তার মতে, অন্য ফসলের তুলনায় সবজি চাষ কয়েক গুণ বেশি লাভজনক হওয়ায় স্থানীয় ৯০ শতাংশ কৃষকই এখন ধান ছেড়ে সবজি আবাদে ঝুঁকছেন। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারে ডিজেলের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় জমিতে সেচ দেওয়া এবং ট্রাক্টর চালানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। এর ফলে ফলন গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। তবে সরবরাহ কম থাকায় বাজারে সবজির তীব্র টান পড়েছে, যার সুফল পাচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। তারা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে ফসল বিক্রি করতে পারছেন। সুধামপুরের কৃষক শাহজাহান আলী জানালেন, যে মূলা আগে ৪০০-৫০০ টাকা মণ বিক্রি করতে হিমশিম খেতে হতো, এবার তা ১২০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে।
তবে এই সুসময়ের পেছনে বড় ধরনের ঝুঁকিও দেখছেন চাষিরা। শাহজাহানপুর এলাকার কৃষক শাহ জামালের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দুষ্প্রাপ্যতা দীর্ঘমেয়াদে সবজি চাষিদের মহাবিপদে ফেলতে পারে। ট্রাকের অতিরিক্ত ভাড়া অনেক সময় কৃষকের পণ্যের দাম কমিয়ে সমন্বয় করার চেষ্টা করেন ব্যবসায়ীরা। তিনি সতর্ক করে বলেন, দাম বাড়িয়ে হলেও সরকার যদি সময়মতো সার, বীজ ও সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে উৎপাদন বিপর্যয় ঘটবে এবং ভোক্তাদের আরও চড়া মূল্য দিতে হবে।
মহাস্থানের বড় আড়ৎদাররা জানিয়েছেন, গত দুই মাস ধরে মোকামে সবজির আমদানি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। প্রতিদিন যে পরিমাণ সবজি হাটে আসছে, পাইকারদের চাহিদা তার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে কৃষক পর্যায়েই সবজির দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ট্রাক প্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া। নোয়াখালীর চৌমুহনীতে এক ট্রাক সবজি পাঠাতে আগে যেখানে ২৫ হাজার টাকা লাগত, এখন সেখানে ৩৫ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। এই বহুমুখী সংকটের কারণে সবজির বাজার এখন অস্থিতিশীল। একদিকে কৃষকের লাভ হলেও অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটছে অস্বাভাবিক অগ্নিমূল্য।

আপনার মতামত লিখুন