দিকপাল

যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস মনিটরিং সিস্টেমে ইরানি হ্যাকারদের সাইবার হামলা


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শনিবার, ১৬ মে ২০২৬ | ১২:২৮ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস মনিটরিং সিস্টেমে ইরানি হ্যাকারদের সাইবার হামলা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন গ্যাস স্টেশনে অবস্থিত খনিজ জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাংকের অভ্যন্তরীণ স্বয়ংক্রিয় পরিমাণ পর্যবেক্ষণকারী সিস্টেমে এক বড় ধরনের সাইবার অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই ডিজিটাল হ্যাকিংয়ের ঘটনায় তেহরান-সংশ্লিষ্ট ইরানি হ্যাকারদের সরাসরি জড়িত থাকার জোরালো সন্দেহ প্রকাশ করছেন মার্কিন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। এই স্পর্শকাতর বিষয়টি সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, হ্যাকাররা মূলত অনলাইনে উন্মুক্ত থাকা এবং কোনো ধরনের পাসওয়ার্ড সুরক্ষা না থাকা স্বয়ংক্রিয় ট্যাংক পরিমাপক যন্ত্রের সিস্টেমে অবৈধভাবে প্রবেশাধিকার লাভ করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশকারী হ্যাকাররা জ্বালানি ট্যাংকের মূল ডিসপ্লেতে প্রদর্শিত তথ্যে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলেও সৌভাগ্যবশত আধারগুলোতে থাকা প্রকৃত খনিজ তেলের পরিমাণে কোনো ধরনের হেরফের বা ক্ষতিসাধন করতে পারেনি।

এই সাইবার হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের শারীরিক জখম, যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে মার্কিন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তাদের মতে, তাত্ত্বিকভাবে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সিস্টেমে একবার প্রবেশাধিকার পেয়ে গেলে যেকোনো চতুর হ্যাকার গ্যাস লিক বা জ্বালানি ছড়িয়ে পড়ার মতো বিপজ্জনক তথ্য গোপন রাখতে সক্ষম, যা পরবর্তীতে যেকোনো জনবহুল এলাকায় প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ ও বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 


ঘটনার তদন্তে নিয়োজিত বিশেষ দলগুলোর সূত্রমতে, অতীতেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস ট্যাংক এবং তেল-গ্যাস সরবরাহ সংক্রান্ত ডিজিটাল অবকাঠামোতে ইরানের সাইবার হামলার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস রয়েছে। আর এই কারণেই তেহরানকে এই ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে হ্যাকাররা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তাদের ডিজিটাল পদাঙ্ক বা তথ্যপ্রমাণ মুছে দিয়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রশাসন হয়তো শতভাগ নিশ্চিতভাবে দায়ী পক্ষকে আইনি কাঠামোর আওতায় শনাক্ত করতে পারবে না বলেও তদন্তকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এই গুরুতর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য জানতে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা তাৎক্ষণিক কিছু জানায়নি এবং দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মতে, যদি এই সাইবার হামলায় ইরানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়, তবে এটি হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন অভ্যন্তরীণ মূল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে তেহরানের সর্বশেষ ও সবচেয়ে বড় সাইবার হুমকি। যেহেতু ইরানের সামরিক ড্রোন বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার মতো ভৌগোলিক সক্ষমতা রাখে না, তাই তারা এই ধরনের পরিশীলিত সাইবার হামলার সুপ্ত হাতিয়ার ব্যবহার করে ওয়াশিংটনের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। জ্বালানি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খনিজ তেলের দাম ইতিমধ্যে অনেকটাই বেড়ে গেছে, যা বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ঘরোয়া রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অস্বস্তিকর একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ নাগরিকদের ওপর পরিচালিত এক দেশব্যাপী জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ মার্কিন নাগরিক স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আর্থিক অবস্থার ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত ও আধুনিক পাসওয়ার্ড বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই অনলাইনে সরাসরি পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকিং গোষ্ঠীগুলো আমেরিকার এমন সব দুর্বল ও অরক্ষিত ডিজিটাল সিস্টেম খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে, যেগুলো সরাসরি তেল-গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ স্থাপনা কিংবা জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইতিপূর্বে বিগত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর মার্কিন কর্মকর্তারা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছিলেন যে, ইরানের বিশেষ সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনধিকার প্রবেশ করেছিল। সে সময় তারা পানির চাপ নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্রের স্ক্রিনে ইসরায়েলবিরোধী উগ্র বার্তা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিল। সাইবার নিরাপত্তা গবেষকরা বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট-সংযুক্ত এই সমস্ত স্বয়ংক্রিয় পরিমাপক যন্ত্রের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে আসছেন। বিগত ২০১৫ সালে একটি খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইনে একটি ভুয়া তেল ট্যাংকের সিস্টেম চালু করলে খুব দ্রুতই একটি ইরানপন্থী হ্যাকার দল সেখানে প্রবেশ করে আক্রমণ চালায়। এর বাইরেও ২০২১ সালে এক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কিছু অত্যন্ত গোপন নথির উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছিল যে, আমেরিকার গ্যাস স্টেশনগুলোর এই ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমকে তারা তাদের সম্ভাব্য প্রধান সাইবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করছিল।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে মনে করে আসছিল যে, ডিজিটাল ও সাইবার যুদ্ধের সক্ষমতায় ইরান হয়তো চীন কিংবা রাশিয়ার মতো পরাশক্তিদের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক চলমান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি পরিকাঠামোতে যেভাবে ধারাবাহিক অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে, তা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ইরান এখন একটি অত্যন্ত সক্ষম, আধুনিক এবং চরম অনিশ্চিত সাইবার প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা আমেরিকার একাধিক তেল, গ্যাস ও পানি সরবরাহ কেন্দ্রে সফলভাবে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। এর বাইরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বনামধন্য ও বৃহৎ চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্য সরবরাহ কার্যক্রমে বড় ধরনের বিলম্ব ঘটিয়েছে তারা, এমনকি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের ব্যক্তিগত তথ্য ও যোগাযোগ মাধ্যমও ফাঁস করা হয়েছে। শুধু আমেরিকাই নয়, ইসরায়েলের জাতীয় সাইবার প্রতিরক্ষা সংস্থাও নিশ্চিত করেছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে তেহরান ব্যাপক মাত্রায় ডিজিটাল আক্রমণ চালিয়েছে। অবশ্য একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলও তাদের সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে সমান তালে সাইবার অপারেশন পরিচালনা করেছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে দাবি করা হয়েছে। ইসরায়েলি সাইবার নিরাপত্তা প্রধানের মতে, ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা বর্তমানে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে চরম রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে এবং তারা সাইবার জগতে যেখানেই সামান্যতম সুযোগ পাচ্ছে, সেখানেই আঘাত হানার চেষ্টা করছে। বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন যে, আমেরিকার আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের এই ক্রমবর্ধমান সাইবার তৎপরতা এক নতুন রাজনৈতিক উদ্বেগ ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে, কারণ অতীতেও মার্কিন সাধারণ নির্বাচনে ভোটারদের বিভ্রান্ত ও ভয়ভীতি দেখাতে ইরানি হ্যাকাররা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিভিন্ন উগ্র সংগঠনের ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে সুদূরপ্রসারী প্রোপাগান্ডা বা তথ্যভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের অপারেশন চালিয়েছিল।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস মনিটরিং সিস্টেমে ইরানি হ্যাকারদের সাইবার হামলা

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন গ্যাস স্টেশনে অবস্থিত খনিজ জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাংকের অভ্যন্তরীণ স্বয়ংক্রিয় পরিমাণ পর্যবেক্ষণকারী সিস্টেমে এক বড় ধরনের সাইবার অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই ডিজিটাল হ্যাকিংয়ের ঘটনায় তেহরান-সংশ্লিষ্ট ইরানি হ্যাকারদের সরাসরি জড়িত থাকার জোরালো সন্দেহ প্রকাশ করছেন মার্কিন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। এই স্পর্শকাতর বিষয়টি সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, হ্যাকাররা মূলত অনলাইনে উন্মুক্ত থাকা এবং কোনো ধরনের পাসওয়ার্ড সুরক্ষা না থাকা স্বয়ংক্রিয় ট্যাংক পরিমাপক যন্ত্রের সিস্টেমে অবৈধভাবে প্রবেশাধিকার লাভ করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশকারী হ্যাকাররা জ্বালানি ট্যাংকের মূল ডিসপ্লেতে প্রদর্শিত তথ্যে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হলেও সৌভাগ্যবশত আধারগুলোতে থাকা প্রকৃত খনিজ তেলের পরিমাণে কোনো ধরনের হেরফের বা ক্ষতিসাধন করতে পারেনি।

এই সাইবার হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের শারীরিক জখম, যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে মার্কিন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তাদের মতে, তাত্ত্বিকভাবে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সিস্টেমে একবার প্রবেশাধিকার পেয়ে গেলে যেকোনো চতুর হ্যাকার গ্যাস লিক বা জ্বালানি ছড়িয়ে পড়ার মতো বিপজ্জনক তথ্য গোপন রাখতে সক্ষম, যা পরবর্তীতে যেকোনো জনবহুল এলাকায় প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ ও বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 


ঘটনার তদন্তে নিয়োজিত বিশেষ দলগুলোর সূত্রমতে, অতীতেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস ট্যাংক এবং তেল-গ্যাস সরবরাহ সংক্রান্ত ডিজিটাল অবকাঠামোতে ইরানের সাইবার হামলার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস রয়েছে। আর এই কারণেই তেহরানকে এই ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে হ্যাকাররা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তাদের ডিজিটাল পদাঙ্ক বা তথ্যপ্রমাণ মুছে দিয়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রশাসন হয়তো শতভাগ নিশ্চিতভাবে দায়ী পক্ষকে আইনি কাঠামোর আওতায় শনাক্ত করতে পারবে না বলেও তদন্তকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এই গুরুতর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য জানতে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা তাৎক্ষণিক কিছু জানায়নি এবং দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মতে, যদি এই সাইবার হামলায় ইরানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়, তবে এটি হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন অভ্যন্তরীণ মূল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে তেহরানের সর্বশেষ ও সবচেয়ে বড় সাইবার হুমকি। যেহেতু ইরানের সামরিক ড্রোন বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার মতো ভৌগোলিক সক্ষমতা রাখে না, তাই তারা এই ধরনের পরিশীলিত সাইবার হামলার সুপ্ত হাতিয়ার ব্যবহার করে ওয়াশিংটনের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। জ্বালানি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খনিজ তেলের দাম ইতিমধ্যে অনেকটাই বেড়ে গেছে, যা বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ঘরোয়া রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অস্বস্তিকর একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ নাগরিকদের ওপর পরিচালিত এক দেশব্যাপী জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ মার্কিন নাগরিক স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আর্থিক অবস্থার ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত ও আধুনিক পাসওয়ার্ড বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই অনলাইনে সরাসরি পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকিং গোষ্ঠীগুলো আমেরিকার এমন সব দুর্বল ও অরক্ষিত ডিজিটাল সিস্টেম খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে, যেগুলো সরাসরি তেল-গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ স্থাপনা কিংবা জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইতিপূর্বে বিগত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর মার্কিন কর্মকর্তারা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছিলেন যে, ইরানের বিশেষ সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনধিকার প্রবেশ করেছিল। সে সময় তারা পানির চাপ নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্রের স্ক্রিনে ইসরায়েলবিরোধী উগ্র বার্তা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিল। সাইবার নিরাপত্তা গবেষকরা বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট-সংযুক্ত এই সমস্ত স্বয়ংক্রিয় পরিমাপক যন্ত্রের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে আসছেন। বিগত ২০১৫ সালে একটি খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইনে একটি ভুয়া তেল ট্যাংকের সিস্টেম চালু করলে খুব দ্রুতই একটি ইরানপন্থী হ্যাকার দল সেখানে প্রবেশ করে আক্রমণ চালায়। এর বাইরেও ২০২১ সালে এক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কিছু অত্যন্ত গোপন নথির উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছিল যে, আমেরিকার গ্যাস স্টেশনগুলোর এই ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমকে তারা তাদের সম্ভাব্য প্রধান সাইবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করছিল।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে মনে করে আসছিল যে, ডিজিটাল ও সাইবার যুদ্ধের সক্ষমতায় ইরান হয়তো চীন কিংবা রাশিয়ার মতো পরাশক্তিদের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক চলমান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি পরিকাঠামোতে যেভাবে ধারাবাহিক অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে, তা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ইরান এখন একটি অত্যন্ত সক্ষম, আধুনিক এবং চরম অনিশ্চিত সাইবার প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা আমেরিকার একাধিক তেল, গ্যাস ও পানি সরবরাহ কেন্দ্রে সফলভাবে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। এর বাইরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বনামধন্য ও বৃহৎ চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্য সরবরাহ কার্যক্রমে বড় ধরনের বিলম্ব ঘটিয়েছে তারা, এমনকি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের ব্যক্তিগত তথ্য ও যোগাযোগ মাধ্যমও ফাঁস করা হয়েছে। শুধু আমেরিকাই নয়, ইসরায়েলের জাতীয় সাইবার প্রতিরক্ষা সংস্থাও নিশ্চিত করেছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে তেহরান ব্যাপক মাত্রায় ডিজিটাল আক্রমণ চালিয়েছে। অবশ্য একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলও তাদের সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে সমান তালে সাইবার অপারেশন পরিচালনা করেছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে দাবি করা হয়েছে। ইসরায়েলি সাইবার নিরাপত্তা প্রধানের মতে, ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা বর্তমানে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে চরম রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে এবং তারা সাইবার জগতে যেখানেই সামান্যতম সুযোগ পাচ্ছে, সেখানেই আঘাত হানার চেষ্টা করছে। বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন যে, আমেরিকার আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের এই ক্রমবর্ধমান সাইবার তৎপরতা এক নতুন রাজনৈতিক উদ্বেগ ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে, কারণ অতীতেও মার্কিন সাধারণ নির্বাচনে ভোটারদের বিভ্রান্ত ও ভয়ভীতি দেখাতে ইরানি হ্যাকাররা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিভিন্ন উগ্র সংগঠনের ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে সুদূরপ্রসারী প্রোপাগান্ডা বা তথ্যভিত্তিক প্রভাব বিস্তারের অপারেশন চালিয়েছিল।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল