দিকপাল

লাইসেন্স ছাড়াই শতকোটি টাকার টিকিট বাণিজ্য, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বুধবার, ২০ মে ২০২৬ | ০২:১৫ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

লাইসেন্স ছাড়াই শতকোটি টাকার টিকিট বাণিজ্য, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাদেশে বহাল তবিয়তে ব্যবসা পরিচালনা করছে অন্তত ১৬টি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার স্থানীয় প্রতিনিধি বা জেনারেল সেলস এজেন্ট। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্সের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেলেও কোনো রকম বৈধ অনুমোদন ছাড়াই তারা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার টিকিট বিক্রি, কার্গো বুকিং এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন সচল রেখেছে। বিমান পরিবহণ খাতের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে এভাবে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কার্যক্রম চালানোয় একদিকে যেমন সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সাধারণ যাত্রীদের আর্থিক সুরক্ষাও চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের এভিয়েশন খাতের তদারকি সংস্থা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের মাধ্যমে এই প্রভাবশালী ১৬টি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। ওই আদেশে স্পষ্ট শর্ত ছিল যে, এটি কেবল একটি সাময়িক ব্যবস্থা এবং এই সময়ের মধ্যে সব ধরনের আইনি নথিপত্র জমা দিয়ে নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তবে নির্ধারিত সেই সময়সীমা পার হওয়ার পর দীর্ঘ দিন কেটে গেলেও কোনো এজেন্টই তাদের লাইসেন্স নবায়ন করেনি। বৈধ কোনো চুক্তি বা অনুমোদন ছাড়াই তারা দেশের ভেতরে তাদের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছে, যা দেশের প্রচলিত বিমান চলাচল বিধিমালার চরম লঙ্ঘন।

অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া এই প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সের স্থানীয় প্রতিনিধি ইউনাইটেড লিংক লিমিটেড, কাতার এয়ারওয়েজের ওরিক্স এভিয়েশন লিমিটেড এবং ইতিহাদ এয়ারওয়েজের উইং এভিয়েশন লিমিটেড। এ ছাড়া ইন্ডিগো ও এয়ার এরাবিয়ার টিকিট ও কার্গো বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে আরএএস হলিডেজ ও ওয়ান ওয়ার্ল্ড এভিয়েশন। একই অবস্থা ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারওয়েজের এজেন্ট গ্লোবাল এভিয়েশন লিমিটেড এবং মালিন্দো বা বাটিক এয়ারের এজেন্ট প্রাইম এভিয়েশন লিমিটেডের ক্ষেত্রেও। এই তালিকায় জাজিরা এয়ারওয়েজ, স্পাইসজেট, ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স এবং ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্সের মতো বড় বড় বিমান সংস্থার স্থানীয় এজেন্টরাও রয়েছে।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, এই আন্তর্জাতিক লাইসেন্সগুলো কেবল কোনো সাধারণ প্রশাসনিক কাগজ নয়, বরং এর সাথে যাত্রীদের আইনি নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক নজরদারির বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। লাইসেন্সবিহীন এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন করার কারণে আন্তর্জাতিক টিকিটিংয়ের বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অবৈধ উপায়ে পাচার হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হতে পারে সাধারণ যাত্রীদের ক্ষেত্রে; যদি কোনো কারণে ফ্লাইট বাতিল হয়, অর্থ আত্মসাৎ বা প্রতারণার ঘটনা ঘটে, তবে লাইসেন্সহীন এই এজেন্টদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। অনেক ভুক্তভোগী যাত্রীও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, বিমান বাতিলের পর টিকিটের টাকা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে এই অনুমোদনহীন সংস্থাগুলো কোনো দায়িত্ব নেবে কি না, তা নিয়ে তারা চরম সংশয়ে আছেন।

এ ধরনের গুরুতর অনিয়মের বিষয়ে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যোগাযোগ করা হলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সের স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, তারা অনেক আগেই নবায়নের আবেদন জমা দিলেও অজ্ঞাত কোনো কারণে কর্তৃপক্ষ সেটি ঝুলিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে ইতিহাদ এয়ারওয়েজের প্রতিনিধি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে পরে জানাবেন বলে মন্তব্য করেন। এদিকে তদারকি সংস্থার নিজস্ব নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে যে, তারা যেকোনো সময় কোনো কারণ ছাড়াই এই সাময়িক অনুমতি বাতিল করার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু রহস্যজনক কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের নিজস্ব কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এই নবায়ন প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে এবং খুব দ্রুতই এই আইনি সংকট সমাধান করে পুরো এভিয়েশন খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


লাইসেন্স ছাড়াই শতকোটি টাকার টিকিট বাণিজ্য, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬

featured Image

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাদেশে বহাল তবিয়তে ব্যবসা পরিচালনা করছে অন্তত ১৬টি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার স্থানীয় প্রতিনিধি বা জেনারেল সেলস এজেন্ট। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্সের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেলেও কোনো রকম বৈধ অনুমোদন ছাড়াই তারা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার টিকিট বিক্রি, কার্গো বুকিং এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন সচল রেখেছে। বিমান পরিবহণ খাতের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে এভাবে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কার্যক্রম চালানোয় একদিকে যেমন সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সাধারণ যাত্রীদের আর্থিক সুরক্ষাও চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের এভিয়েশন খাতের তদারকি সংস্থা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের মাধ্যমে এই প্রভাবশালী ১৬টি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। ওই আদেশে স্পষ্ট শর্ত ছিল যে, এটি কেবল একটি সাময়িক ব্যবস্থা এবং এই সময়ের মধ্যে সব ধরনের আইনি নথিপত্র জমা দিয়ে নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তবে নির্ধারিত সেই সময়সীমা পার হওয়ার পর দীর্ঘ দিন কেটে গেলেও কোনো এজেন্টই তাদের লাইসেন্স নবায়ন করেনি। বৈধ কোনো চুক্তি বা অনুমোদন ছাড়াই তারা দেশের ভেতরে তাদের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছে, যা দেশের প্রচলিত বিমান চলাচল বিধিমালার চরম লঙ্ঘন।

অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া এই প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সের স্থানীয় প্রতিনিধি ইউনাইটেড লিংক লিমিটেড, কাতার এয়ারওয়েজের ওরিক্স এভিয়েশন লিমিটেড এবং ইতিহাদ এয়ারওয়েজের উইং এভিয়েশন লিমিটেড। এ ছাড়া ইন্ডিগো ও এয়ার এরাবিয়ার টিকিট ও কার্গো বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে আরএএস হলিডেজ ও ওয়ান ওয়ার্ল্ড এভিয়েশন। একই অবস্থা ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারওয়েজের এজেন্ট গ্লোবাল এভিয়েশন লিমিটেড এবং মালিন্দো বা বাটিক এয়ারের এজেন্ট প্রাইম এভিয়েশন লিমিটেডের ক্ষেত্রেও। এই তালিকায় জাজিরা এয়ারওয়েজ, স্পাইসজেট, ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স এবং ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্সের মতো বড় বড় বিমান সংস্থার স্থানীয় এজেন্টরাও রয়েছে।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, এই আন্তর্জাতিক লাইসেন্সগুলো কেবল কোনো সাধারণ প্রশাসনিক কাগজ নয়, বরং এর সাথে যাত্রীদের আইনি নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক নজরদারির বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। লাইসেন্সবিহীন এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন করার কারণে আন্তর্জাতিক টিকিটিংয়ের বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অবৈধ উপায়ে পাচার হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হতে পারে সাধারণ যাত্রীদের ক্ষেত্রে; যদি কোনো কারণে ফ্লাইট বাতিল হয়, অর্থ আত্মসাৎ বা প্রতারণার ঘটনা ঘটে, তবে লাইসেন্সহীন এই এজেন্টদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। অনেক ভুক্তভোগী যাত্রীও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, বিমান বাতিলের পর টিকিটের টাকা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে এই অনুমোদনহীন সংস্থাগুলো কোনো দায়িত্ব নেবে কি না, তা নিয়ে তারা চরম সংশয়ে আছেন।

এ ধরনের গুরুতর অনিয়মের বিষয়ে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যোগাযোগ করা হলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সের স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, তারা অনেক আগেই নবায়নের আবেদন জমা দিলেও অজ্ঞাত কোনো কারণে কর্তৃপক্ষ সেটি ঝুলিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে ইতিহাদ এয়ারওয়েজের প্রতিনিধি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে পরে জানাবেন বলে মন্তব্য করেন। এদিকে তদারকি সংস্থার নিজস্ব নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে যে, তারা যেকোনো সময় কোনো কারণ ছাড়াই এই সাময়িক অনুমতি বাতিল করার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু রহস্যজনক কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের নিজস্ব কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এই নবায়ন প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে এবং খুব দ্রুতই এই আইনি সংকট সমাধান করে পুরো এভিয়েশন খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল