একটি সাত বছরের নিষ্পাপ শিশুর পিঠে থাকার কথা ছিল রঙিন স্কুলব্যাগ আর চঞ্চল পায়ে মেতে ওঠার কথা ছিল বিদ্যালয়ের আঙিনায়। কিন্তু মে মাসের এক অভিশপ্ত সকালে, রাজধানীর মিরপুর পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের বন্ধ দরজার ওপাশে ওত পেতে ছিল এক আদিম হিংস্র নরপিশাচ। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই চঞ্চল শৈশব রূপান্তরিত হলো একটি মস্তকবিহীন নিথর ও ক্ষতবিক্ষত দেহে। ঢাকার মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি আবাসিক ভবনে ঘটে যাওয়া এই বর্বরোচিত নৃশংসতা কেবল একটি পরিবারকে চিরতরে ধ্বংস করেনি, বরং পুরো দেশের সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র এবং নাগরিক বিবেককে এক চরম ঝাঁকুনি দিয়েছে। প্রতিবেশীর বিকৃত লালসার শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারানো দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের প্রধান রূপকার ও ঘাতক সোহেল রানা ওরফে জাকির হোসেন অবশেষে আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। তবে আইনের চাকা তার নিজস্ব গতিতে ঘুরলেও, নিহত শিশুর পিতা আবদুল হান্নান মোল্লার বুকফাটা হাহাকার আর দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি তীব্র আক্ষেপের বাণী এখন পুরো এলাকার বাতাসে এক জলন্ত প্রশ্ন হয়ে ভাসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে নিজের চরম ক্ষোভ ও হতাশা উগরে দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আপনারা বিচার করতে পারবেন? পারবেন না। কোনো পদক্ষেপ নেবেন? আপনি পারবেন না। কয়েক দিন পর আরেকটা বড় ঘটনা ঘটবে, আর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে। ব্যস, এখানেই শেষ। একজন শোকার্ত পিতার এই অবিশ্বাসের বাণী যেন আমাদের পুরো শাসন ব্যবস্থার গালে এক মস্ত বড় চড়।
হত্যাকাণ্ডের সেই রোমহর্ষক ও লোমহর্ষক দিনটির বিবরণ শুনলে যেকোনো সুস্থ মানুষের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। পল্লবীর ওই ভবনে সপরিবারে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে অত্যন্ত শান্তিতে বসবাস করে আসছিলেন রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। পেশাগত কারণে তিনি একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কর্মরত থাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকতেন। অন্যদিকে, পেশায় রিকশা মেকানিক সোহেল রানা তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে নিয়ে মাত্র দুই মাস আগে একই ভবনের ঠিক উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়া হিসেবে আসে। একই তলায় মুখোমুখি থাকার সুবাদে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে তাদের সাধারণ একটা পরিচয় তৈরি হয়েছিল, আর সেই সরল পরিচয়ই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়াল ফুটফুটে রামিসার জন্য। গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে রামিসা যখন খেলাধুলার জন্য বাসা থেকে বের হয়, তখনই কৌশলে ও সুপরিকল্পিতভাবে তাকে নিজেদের ফ্ল্যাটের ভেতর ডেকে নিয়ে যায় ঘাতক দম্পতি। এরপর সেই বন্ধ ঘরের ভেতরে শিশুটির ওপর চালানো হয় চরম পাশবিক নির্যাতন। সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চললেও মেয়ে ঘরে না ফেরায় মা পারভীন আক্তার চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে পাশের ওই সন্দেহভাজন ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার ছোট্ট স্যান্ডেল জোড়া পড়ে থাকতে দেখে তার বুক কেঁপে ওঠে। তিনি পাগলের মতো দরজায় বারবার ধাক্কা দিলেও এবং চিৎকার করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলছিল না। মূলত তখন ভেতরে চলছিল এক চরম পৈশাচিক যজ্ঞ। দীর্ঘক্ষণ পর প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই স্বজনরা শিউরে ওঠেন। ঘরের শয়নকক্ষের মেঝের ছোপ ছোপ রক্তের দাগ অনুসরণ করে খাটের নিচে পাওয়া যায় রামিসার ক্ষতবিক্ষত মস্তকবিহীন শরীর। আর বাথরুমের একটি প্লাস্টিকের বালতির ভেতর রাখা ছিল তার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা মাথাটি। লাশ পুরোপুরি গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে অবলীলায় কেটে ফেলা হয়েছিল শিশুটির মাথা ও দুই হাত।
এই নৃশংসতার পর রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে যে বুকফাটা আর্তনাদ করেছেন, তা আগামী দিনের ইতিহাসের পাতায় এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থাকবে। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, আমি বিচার চাই না, কারণ আপনাদের বিচার করার কোনো ভালো রেকর্ড নেই। তিনি আরও জানান, ১৭ বছর ধরে ওই ভবনে থাকলেও কারও সঙ্গে খুব বেশি মেলামেশা ছিল না তাদের। নিজের কাজ শেষ করে রাত আটটা-নয়টার মধ্যেই ঘরে ফিরে সন্তানদের সময় দিতেন। অথচ সেই নিরীহ পরিবারের কোলের ছোট মেয়েটিকে নির্মমভাবে কেড়ে নিল মাত্র দুই মাস আগে আসা এক ভুঁইফোড় ভাড়াটিয়া। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, রামিসার মা যখন বাইরে দাঁড়িয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলেন ও চিৎকার করছিলেন, তখন ঘাতক সোহেলকে পেছনের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে ভেতরের পুরোটা সময় দরজা শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছিল তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। সোহেল নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ পর স্বপ্না দরজা খোলে এবং ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর নাটক করে। তবে উপস্থিত জনতা তাকে হাতেনাতে আটকে রেখে পুলিশে সোপর্দ করে। পরবর্তীতে পুলিশের জেরার মুখে তার সক্রিয় অপরাধের বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, জানালার গ্রিল গলে পালিয়ে যাওয়া সোহেল রানা ঢাকা ছেড়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় গিয়ে আত্মগোপন করে। সেখানে পালিয়ে থাকার জন্য অর্থের প্রয়োজনে সে তার এক বন্ধুর কাছে বিকাশ নম্বরে টাকা চায়। সেই টাকা তুলতে ফতুল্লা জগতের একটি দোকানে গেলে ওত পেতে থাকা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। জানা গেছে, ইতিপূর্বেও নাটোরের একটি নাশকতার মামলায় এই সোহেল অভিযুক্ত ছিল এবং সে নিয়মিত তার নিজের স্ত্রীর ওপরও বিকৃত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাত।
গ্রেপ্তারের পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবীর থানার উপপরিদর্শক আসামিদের ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করেন। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ঘাতক সোহেল রানা স্বেচ্ছায় নিজের পৈশাচিক দোষ স্বীকার করে অত্যন্ত লোমহর্ষক জবানবন্দি প্রদান করে। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে বিচারক তাকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অন্যদিকে, অপরাধের আলামত নষ্টের চেষ্টা ও স্বামীকে পালাতে সরাসরি সাহায্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের জামিন নামঞ্জুর করে তাকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুটির লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর ধর্ষণের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই নির্মম ঘটনার পর থেকে পুরো দেশজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও দোষীদের প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন। এই ঘটনার পর থেকে পুরো মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় এক থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিজেদের ফ্ল্যাটের ঠিক উল্টো পাশের ঘরেই যে এত বড় নরক তৈরি হতে পারে, তা ভেবে শিউরে উঠছেন স্থানীয় অভিভাবকেরা। সন্তানকে চোখের আড়াল করতে এখন তীব্র ভয় কাজ করছে সবার মনে। আইনি প্রক্রিয়া হয়তো তার নিজস্ব গতিতে চলবে, তবে নিহত রামিসার বাবার সেই ক্ষোভ মেশানো আক্ষেপ দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতার দিকে এক বিরাট আঙুল তুলেছে। পুরো দেশবাসীর এখন একটাই দাবি, বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই নরপিশাচ দম্পতির যেন দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়, যাতে আর কোনো বাবাকে এমন আক্ষেপ নিয়ে কাঁদতে না হয়।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
একটি সাত বছরের নিষ্পাপ শিশুর পিঠে থাকার কথা ছিল রঙিন স্কুলব্যাগ আর চঞ্চল পায়ে মেতে ওঠার কথা ছিল বিদ্যালয়ের আঙিনায়। কিন্তু মে মাসের এক অভিশপ্ত সকালে, রাজধানীর মিরপুর পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের বন্ধ দরজার ওপাশে ওত পেতে ছিল এক আদিম হিংস্র নরপিশাচ। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই চঞ্চল শৈশব রূপান্তরিত হলো একটি মস্তকবিহীন নিথর ও ক্ষতবিক্ষত দেহে। ঢাকার মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি আবাসিক ভবনে ঘটে যাওয়া এই বর্বরোচিত নৃশংসতা কেবল একটি পরিবারকে চিরতরে ধ্বংস করেনি, বরং পুরো দেশের সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র এবং নাগরিক বিবেককে এক চরম ঝাঁকুনি দিয়েছে। প্রতিবেশীর বিকৃত লালসার শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারানো দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের প্রধান রূপকার ও ঘাতক সোহেল রানা ওরফে জাকির হোসেন অবশেষে আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। তবে আইনের চাকা তার নিজস্ব গতিতে ঘুরলেও, নিহত শিশুর পিতা আবদুল হান্নান মোল্লার বুকফাটা হাহাকার আর দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি তীব্র আক্ষেপের বাণী এখন পুরো এলাকার বাতাসে এক জলন্ত প্রশ্ন হয়ে ভাসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে নিজের চরম ক্ষোভ ও হতাশা উগরে দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আপনারা বিচার করতে পারবেন? পারবেন না। কোনো পদক্ষেপ নেবেন? আপনি পারবেন না। কয়েক দিন পর আরেকটা বড় ঘটনা ঘটবে, আর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে। ব্যস, এখানেই শেষ। একজন শোকার্ত পিতার এই অবিশ্বাসের বাণী যেন আমাদের পুরো শাসন ব্যবস্থার গালে এক মস্ত বড় চড়।
হত্যাকাণ্ডের সেই রোমহর্ষক ও লোমহর্ষক দিনটির বিবরণ শুনলে যেকোনো সুস্থ মানুষের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। পল্লবীর ওই ভবনে সপরিবারে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে অত্যন্ত শান্তিতে বসবাস করে আসছিলেন রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। পেশাগত কারণে তিনি একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কর্মরত থাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকতেন। অন্যদিকে, পেশায় রিকশা মেকানিক সোহেল রানা তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে নিয়ে মাত্র দুই মাস আগে একই ভবনের ঠিক উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়া হিসেবে আসে। একই তলায় মুখোমুখি থাকার সুবাদে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে তাদের সাধারণ একটা পরিচয় তৈরি হয়েছিল, আর সেই সরল পরিচয়ই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়াল ফুটফুটে রামিসার জন্য। গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে রামিসা যখন খেলাধুলার জন্য বাসা থেকে বের হয়, তখনই কৌশলে ও সুপরিকল্পিতভাবে তাকে নিজেদের ফ্ল্যাটের ভেতর ডেকে নিয়ে যায় ঘাতক দম্পতি। এরপর সেই বন্ধ ঘরের ভেতরে শিশুটির ওপর চালানো হয় চরম পাশবিক নির্যাতন। সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চললেও মেয়ে ঘরে না ফেরায় মা পারভীন আক্তার চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে পাশের ওই সন্দেহভাজন ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার ছোট্ট স্যান্ডেল জোড়া পড়ে থাকতে দেখে তার বুক কেঁপে ওঠে। তিনি পাগলের মতো দরজায় বারবার ধাক্কা দিলেও এবং চিৎকার করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলছিল না। মূলত তখন ভেতরে চলছিল এক চরম পৈশাচিক যজ্ঞ। দীর্ঘক্ষণ পর প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই স্বজনরা শিউরে ওঠেন। ঘরের শয়নকক্ষের মেঝের ছোপ ছোপ রক্তের দাগ অনুসরণ করে খাটের নিচে পাওয়া যায় রামিসার ক্ষতবিক্ষত মস্তকবিহীন শরীর। আর বাথরুমের একটি প্লাস্টিকের বালতির ভেতর রাখা ছিল তার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা মাথাটি। লাশ পুরোপুরি গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে অবলীলায় কেটে ফেলা হয়েছিল শিশুটির মাথা ও দুই হাত।
এই নৃশংসতার পর রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে যে বুকফাটা আর্তনাদ করেছেন, তা আগামী দিনের ইতিহাসের পাতায় এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে থাকবে। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, আমি বিচার চাই না, কারণ আপনাদের বিচার করার কোনো ভালো রেকর্ড নেই। তিনি আরও জানান, ১৭ বছর ধরে ওই ভবনে থাকলেও কারও সঙ্গে খুব বেশি মেলামেশা ছিল না তাদের। নিজের কাজ শেষ করে রাত আটটা-নয়টার মধ্যেই ঘরে ফিরে সন্তানদের সময় দিতেন। অথচ সেই নিরীহ পরিবারের কোলের ছোট মেয়েটিকে নির্মমভাবে কেড়ে নিল মাত্র দুই মাস আগে আসা এক ভুঁইফোড় ভাড়াটিয়া। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, রামিসার মা যখন বাইরে দাঁড়িয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলেন ও চিৎকার করছিলেন, তখন ঘাতক সোহেলকে পেছনের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে ভেতরের পুরোটা সময় দরজা শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছিল তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। সোহেল নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ পর স্বপ্না দরজা খোলে এবং ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর নাটক করে। তবে উপস্থিত জনতা তাকে হাতেনাতে আটকে রেখে পুলিশে সোপর্দ করে। পরবর্তীতে পুলিশের জেরার মুখে তার সক্রিয় অপরাধের বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, জানালার গ্রিল গলে পালিয়ে যাওয়া সোহেল রানা ঢাকা ছেড়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় গিয়ে আত্মগোপন করে। সেখানে পালিয়ে থাকার জন্য অর্থের প্রয়োজনে সে তার এক বন্ধুর কাছে বিকাশ নম্বরে টাকা চায়। সেই টাকা তুলতে ফতুল্লা জগতের একটি দোকানে গেলে ওত পেতে থাকা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। জানা গেছে, ইতিপূর্বেও নাটোরের একটি নাশকতার মামলায় এই সোহেল অভিযুক্ত ছিল এবং সে নিয়মিত তার নিজের স্ত্রীর ওপরও বিকৃত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাত।
গ্রেপ্তারের পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবীর থানার উপপরিদর্শক আসামিদের ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করেন। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ঘাতক সোহেল রানা স্বেচ্ছায় নিজের পৈশাচিক দোষ স্বীকার করে অত্যন্ত লোমহর্ষক জবানবন্দি প্রদান করে। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে বিচারক তাকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অন্যদিকে, অপরাধের আলামত নষ্টের চেষ্টা ও স্বামীকে পালাতে সরাসরি সাহায্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের জামিন নামঞ্জুর করে তাকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুটির লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর ধর্ষণের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই নির্মম ঘটনার পর থেকে পুরো দেশজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও দোষীদের প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন। এই ঘটনার পর থেকে পুরো মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় এক থমথমে ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিজেদের ফ্ল্যাটের ঠিক উল্টো পাশের ঘরেই যে এত বড় নরক তৈরি হতে পারে, তা ভেবে শিউরে উঠছেন স্থানীয় অভিভাবকেরা। সন্তানকে চোখের আড়াল করতে এখন তীব্র ভয় কাজ করছে সবার মনে। আইনি প্রক্রিয়া হয়তো তার নিজস্ব গতিতে চলবে, তবে নিহত রামিসার বাবার সেই ক্ষোভ মেশানো আক্ষেপ দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতার দিকে এক বিরাট আঙুল তুলেছে। পুরো দেশবাসীর এখন একটাই দাবি, বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই নরপিশাচ দম্পতির যেন দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়, যাতে আর কোনো বাবাকে এমন আক্ষেপ নিয়ে কাঁদতে না হয়।

আপনার মতামত লিখুন