রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানে অবস্থিত ঢাকা ট্রেড সেন্টার (উত্তর-দক্ষিণ) মার্কেটে দীর্ঘদিন ধরে নকশাবহির্ভূতভাবে অবৈধ দোকান ও গুদামঘর নির্মাণের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত মূল নকশাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মার্কেট মালিক সমিতির প্রভাবশালী নেতারা ভবনের ছাদজুড়ে ১৭০টিরও বেশি অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। এই অবৈধ ছাদ বাণিজ্যের মাধ্যমে সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে জামানত ও ভাড়ার নামে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে মার্কেটের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এই অনিয়ম রোধে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল হোতা হিসেবে ঢাকা ট্রেড সেন্টার উত্তর মার্কেট মালিক সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক মজুর নাম উঠে এসেছে। তার এই স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনও বিষয়টি আমলে নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, মোজাম্মেল হক মজুর বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগের সত্যতা রয়েছে এবং এই বিষয়ে তাদের তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসন আমলের সুযোগ নিয়ে মার্কেট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির প্রভাবশালী নেতারা রাতারাতি এই অবৈধ স্থাপনাগুলো নির্মাণ করেন। সিটি করপোরেশনের মূল নকশার বাইরে গিয়ে এই ১৭০টির বেশি দোকান ও গুদামঘর তৈরিতে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন উত্তর ও দক্ষিণ উভয় অংশের শীর্ষ নেতারা। এদের মধ্যে উত্তর অংশের সভাপতি মোজাম্মেল হক মজু এবং সাধারণ সম্পাদক বাসেত মাস্টারের পাশাপাশি দক্ষিণ অংশের সভাপতি মীর আল মামুন ও সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন রানার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা কেবল ছাদেই নয়, মার্কেটের ভেতরের বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ পকেস্থ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
যদিও অভিযুক্ত নেতারা এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। উত্তর অংশের সভাপতি মোজাম্মেল হক মজুর দাবি, ছাদে বাণিজ্যিকভাবে কোনো দোকান বা গুদামঘর তৈরি করা হয়নি, বরং মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মীদের থাকার সুব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে কিছু অস্থায়ী টিনের ঘর করা হয়েছে। তবে তার এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন খোদ মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মীরাই। তারা জানিয়েছেন, বিশাল ছাদজুড়ে নির্মিত ঘরগুলোর মধ্যে তাদের বিশ্রামের জন্য দেওয়া হয়েছে মাত্র দুটি কক্ষ, যেখানে গাদাগাদি করে তাদের ঘুমানো, খাওয়া ও গোসলসহ দৈনন্দিন কাজ সারতে হয়। বাকি সব ঘরই মূলত ব্যবসায়ী ও গুদাম হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
বাস্তব চিত্রও নিরাপত্তাকর্মীদের দাবির সপক্ষেই কথা বলে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ছাদের এই অবৈধ ঘরগুলো ইতোমধ্যে মার্কেটের বিভিন্ন পোশাক ও জুতা ব্যবসায়ী নিজেদের গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। সেখানে বিপুল পরিমাণ জুতা, জামা, প্যান্ট ও কম্বলসহ বিভিন্ন মালামাল মজুত করে রাখা হয়েছে। এই ঘরগুলো বরাদ্দ পেতে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার থেকে শুরু করে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম জামানত নেওয়া হয়েছে এবং প্রতি মাসে পনেরো থেকে পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যার কোনো হিসাব সিটি করপোরেশনের খাতায় নেই।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্কেটটিতে বেজমেন্ট থেকে শুরু করে ছয়তলা পর্যন্ত সিটি করপোরেশন অনুমোদিত বৈধ ও অস্থায়ী দোকানের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে তিন হাজারের বেশি দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ অংশে এক হাজার একশত একষট্টিটি এবং উত্তর অংশে এক হাজার একশত আটটি বৈধ ও অস্থায়ী দোকান রয়েছে। বাকি প্রায় সাতশত দোকান সম্পূর্ণ অবৈধ এবং নকশাবহির্ভূত, যা মার্কেট কমিটির নেতারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে নিয়মিত অর্থ বাণিজ্য চালাচ্ছেন। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে মার্কেটে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও রহস্যজনক কারণে ছাদের এই বিশাল অবৈধ সাম্রাজ্য সবসময়ই তাদের নজরদারির বাইরে থেকে গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কেট কমিটিরই এক দায়িত্বশীল নেতা স্বীকার করেছেন যে, নিরাপত্তাকর্মীদের আবাসন সুবিধার বাহানা তৈরি করে মূলত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই এই ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এই পুরো সিন্ডিকেটের কারণে একদিকে যেমন সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ ব্যবসায়ীরা চরম বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

রোববার, ১৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানে অবস্থিত ঢাকা ট্রেড সেন্টার (উত্তর-দক্ষিণ) মার্কেটে দীর্ঘদিন ধরে নকশাবহির্ভূতভাবে অবৈধ দোকান ও গুদামঘর নির্মাণের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত মূল নকশাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মার্কেট মালিক সমিতির প্রভাবশালী নেতারা ভবনের ছাদজুড়ে ১৭০টিরও বেশি অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। এই অবৈধ ছাদ বাণিজ্যের মাধ্যমে সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে জামানত ও ভাড়ার নামে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে মার্কেটের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এই অনিয়ম রোধে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল হোতা হিসেবে ঢাকা ট্রেড সেন্টার উত্তর মার্কেট মালিক সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক মজুর নাম উঠে এসেছে। তার এই স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনও বিষয়টি আমলে নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, মোজাম্মেল হক মজুর বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগের সত্যতা রয়েছে এবং এই বিষয়ে তাদের তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসন আমলের সুযোগ নিয়ে মার্কেট ব্যবসায়ী মালিক সমিতির প্রভাবশালী নেতারা রাতারাতি এই অবৈধ স্থাপনাগুলো নির্মাণ করেন। সিটি করপোরেশনের মূল নকশার বাইরে গিয়ে এই ১৭০টির বেশি দোকান ও গুদামঘর তৈরিতে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন উত্তর ও দক্ষিণ উভয় অংশের শীর্ষ নেতারা। এদের মধ্যে উত্তর অংশের সভাপতি মোজাম্মেল হক মজু এবং সাধারণ সম্পাদক বাসেত মাস্টারের পাশাপাশি দক্ষিণ অংশের সভাপতি মীর আল মামুন ও সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন রানার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারা কেবল ছাদেই নয়, মার্কেটের ভেতরের বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ পকেস্থ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
যদিও অভিযুক্ত নেতারা এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। উত্তর অংশের সভাপতি মোজাম্মেল হক মজুর দাবি, ছাদে বাণিজ্যিকভাবে কোনো দোকান বা গুদামঘর তৈরি করা হয়নি, বরং মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মীদের থাকার সুব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে কিছু অস্থায়ী টিনের ঘর করা হয়েছে। তবে তার এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন খোদ মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মীরাই। তারা জানিয়েছেন, বিশাল ছাদজুড়ে নির্মিত ঘরগুলোর মধ্যে তাদের বিশ্রামের জন্য দেওয়া হয়েছে মাত্র দুটি কক্ষ, যেখানে গাদাগাদি করে তাদের ঘুমানো, খাওয়া ও গোসলসহ দৈনন্দিন কাজ সারতে হয়। বাকি সব ঘরই মূলত ব্যবসায়ী ও গুদাম হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
বাস্তব চিত্রও নিরাপত্তাকর্মীদের দাবির সপক্ষেই কথা বলে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ছাদের এই অবৈধ ঘরগুলো ইতোমধ্যে মার্কেটের বিভিন্ন পোশাক ও জুতা ব্যবসায়ী নিজেদের গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। সেখানে বিপুল পরিমাণ জুতা, জামা, প্যান্ট ও কম্বলসহ বিভিন্ন মালামাল মজুত করে রাখা হয়েছে। এই ঘরগুলো বরাদ্দ পেতে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার থেকে শুরু করে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম জামানত নেওয়া হয়েছে এবং প্রতি মাসে পনেরো থেকে পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যার কোনো হিসাব সিটি করপোরেশনের খাতায় নেই।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্কেটটিতে বেজমেন্ট থেকে শুরু করে ছয়তলা পর্যন্ত সিটি করপোরেশন অনুমোদিত বৈধ ও অস্থায়ী দোকানের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে তিন হাজারের বেশি দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ অংশে এক হাজার একশত একষট্টিটি এবং উত্তর অংশে এক হাজার একশত আটটি বৈধ ও অস্থায়ী দোকান রয়েছে। বাকি প্রায় সাতশত দোকান সম্পূর্ণ অবৈধ এবং নকশাবহির্ভূত, যা মার্কেট কমিটির নেতারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে নিয়মিত অর্থ বাণিজ্য চালাচ্ছেন। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে মার্কেটে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও রহস্যজনক কারণে ছাদের এই বিশাল অবৈধ সাম্রাজ্য সবসময়ই তাদের নজরদারির বাইরে থেকে গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কেট কমিটিরই এক দায়িত্বশীল নেতা স্বীকার করেছেন যে, নিরাপত্তাকর্মীদের আবাসন সুবিধার বাহানা তৈরি করে মূলত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই এই ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এই পুরো সিন্ডিকেটের কারণে একদিকে যেমন সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ ব্যবসায়ীরা চরম বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

আপনার মতামত লিখুন