দিকপাল

রাজধানীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, রোগীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬ | ১২:৩৬ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, রোগীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়

সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানীর জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত দালাল চক্রের হাতে নাজেহাল হচ্ছেন অসহায় রোগীরা। হাসপাতালের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ওত পেতে থাকে এই চক্রের সদস্যরা। বিশেষ করে রোগী ভর্তি, শয্যা নিশ্চিত করা কিংবা রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার সিরিয়াল এগিয়ে দেওয়ার নাম করে রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বড় অঙ্কের টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এই অসাধু প্রক্রিয়ার সঙ্গে হাসপাতালের নিম্ন আয়ের কিছু কর্মচারীও সরাসরি জড়িত।

ভুক্তভোগী রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে দায়িত্ব পালনরত ব্যক্তিরাই অনেক সময় দালালের ভূমিকা পালন করেন। তারা রোগীদের সিট খালি নেই বলে ভয় দেখান এবং দ্রুত ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে এক থেকে দুই হাজার টাকা দাবি করেন। এমনকি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা বা এক্স-রের সিরিয়াল পাওয়ার জন্যও প্রতিটি ধাপে একশ থেকে দুইশ টাকা করে গুনতে হয় ভুক্তভোগীদের। টাকা না দিলে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় অথবা পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাসপাতালের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এই চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে কাজ করছেন। সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি নার্সদের কক্ষে আশ্রয় নেন এবং পরবর্তীতে দায়িত্বরত নার্সরা তাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বেতন ছাড়াই ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে কাজ করছেন বলে স্বীকার করেছেন, যা এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অস্তিত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। মূলত হাসপাতালের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রশ্রয়েই এই দালালরা সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।

সম্প্রতি এই অরাজকতা ঠেকাতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাব একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব সদস্যরা রোগীর ছদ্মবেশে হাসপাতালে প্রবেশ করলে দালালরা তাদের টোপ দেয়। টাকার বিনিময়ে ‘ভিআইপি সিট’ পাইয়ে দেওয়া এবং উন্নত পরীক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে তারা রোগী ভাগানোর চেষ্টা করে। হাতেনাতে ধরা পড়ে ১৫ জন দালাল, যাদের অধিকাংশই মহাখালী এলাকার বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের হয়ে কাজ করছিলেন। জানা গেছে, প্রতি রোগী বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের বিনিময়ে তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন এবং মাসোহারা পেয়ে থাকেন।

অভিযান শেষে র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত আটককৃতদের মধ্যে ১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে সাধারণ রোগীদের দাবি, এ ধরনের বিচ্ছিন্ন অভিযান সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী কোনো সমাধান বয়ে আনে না। তারা মনে করেন, হাসপাতালের ভেতর থেকে এই চক্রকে পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে প্রশাসনের কড়া নজরদারি এবং দোষী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি সেবার নামে বাণিজ্য বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও আস্থার সংকটে পড়বে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ১৩ মে ২০২৬


রাজধানীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, রোগীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়

প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬

featured Image

সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানীর জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত দালাল চক্রের হাতে নাজেহাল হচ্ছেন অসহায় রোগীরা। হাসপাতালের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ওত পেতে থাকে এই চক্রের সদস্যরা। বিশেষ করে রোগী ভর্তি, শয্যা নিশ্চিত করা কিংবা রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার সিরিয়াল এগিয়ে দেওয়ার নাম করে রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বড় অঙ্কের টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এই অসাধু প্রক্রিয়ার সঙ্গে হাসপাতালের নিম্ন আয়ের কিছু কর্মচারীও সরাসরি জড়িত।

ভুক্তভোগী রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে দায়িত্ব পালনরত ব্যক্তিরাই অনেক সময় দালালের ভূমিকা পালন করেন। তারা রোগীদের সিট খালি নেই বলে ভয় দেখান এবং দ্রুত ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে এক থেকে দুই হাজার টাকা দাবি করেন। এমনকি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা বা এক্স-রের সিরিয়াল পাওয়ার জন্যও প্রতিটি ধাপে একশ থেকে দুইশ টাকা করে গুনতে হয় ভুক্তভোগীদের। টাকা না দিলে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় অথবা পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাসপাতালের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এই চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে কাজ করছেন। সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি নার্সদের কক্ষে আশ্রয় নেন এবং পরবর্তীতে দায়িত্বরত নার্সরা তাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বেতন ছাড়াই ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে কাজ করছেন বলে স্বীকার করেছেন, যা এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অস্তিত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। মূলত হাসপাতালের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রশ্রয়েই এই দালালরা সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।

সম্প্রতি এই অরাজকতা ঠেকাতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাব একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব সদস্যরা রোগীর ছদ্মবেশে হাসপাতালে প্রবেশ করলে দালালরা তাদের টোপ দেয়। টাকার বিনিময়ে ‘ভিআইপি সিট’ পাইয়ে দেওয়া এবং উন্নত পরীক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে তারা রোগী ভাগানোর চেষ্টা করে। হাতেনাতে ধরা পড়ে ১৫ জন দালাল, যাদের অধিকাংশই মহাখালী এলাকার বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের হয়ে কাজ করছিলেন। জানা গেছে, প্রতি রোগী বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের বিনিময়ে তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন এবং মাসোহারা পেয়ে থাকেন।

অভিযান শেষে র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত আটককৃতদের মধ্যে ১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে সাধারণ রোগীদের দাবি, এ ধরনের বিচ্ছিন্ন অভিযান সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী কোনো সমাধান বয়ে আনে না। তারা মনে করেন, হাসপাতালের ভেতর থেকে এই চক্রকে পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে প্রশাসনের কড়া নজরদারি এবং দোষী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি সেবার নামে বাণিজ্য বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও আস্থার সংকটে পড়বে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল