দিকপাল

নতুন আমদানি নীতিতে তৈরি পোশাক খাতে কঠোর শর্ত, চাপে পড়তে পারেন রপ্তানিকারকরা


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ | ০৮:৩৪ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

নতুন আমদানি নীতিতে তৈরি পোশাক খাতে কঠোর শর্ত, চাপে পড়তে পারেন রপ্তানিকারকরা

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিতে কাঁচামাল আমদানিনির্ভর মূল্য সংযোজন বা ভ্যালু এডিশনের শর্ত অনেক বেশি কঠোর করার এক যুগান্তকারী ও অভূতপূর্ব উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে শিশুদের পোশাক তৈরি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সরকারের নতুন আমদানি নীতি আদেশে এই হার দ্বিগুণ বাড়িয়ে এক লাফে ৩০ শতাংশ করার চূড়ান্ত প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একইভাবে সুতা বা কটন এবং মানবসৃষ্ট কৃত্রিম আঁশ বা ম্যান-মেইড ফাইবার দিয়ে তৈরি সব ধরনের নিট ও ওভেন পোশাক বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রেও ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক ধাক্কায় ৩০ শতাংশ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দেশের পোশাক শিল্পে এক বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।


বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’-এর অত্যন্ত গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ খসড়ায় এই কঠিন প্রস্তাবগুলো রাখা হয়েছে। এই নতুন খসড়া নীতিটি চূড়ান্ত করার উদ্দেশ্যে আজ বৃহস্পতিবার দেশের সমস্ত ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের সাথে এক জরুরি ও উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে বসছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির। সরকারের এই দূরদর্শী ও নতুন নীতি যদি শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়ে কার্যকর হয়, তবে তা ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে বলবৎ থাকবে। এই খসড়া নীতিমালায় আরও একটি বিস্ফোরক প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, এখন থেকে বিদেশ থেকে কোনো ধরনের ‘নিট ফেব্রিক্স বা নিট কাপড় আমদানি করা যাবে না’। সরকারের এমন কঠোর অবস্থানের খবর জানাজানি হওয়ার পর থেকেই নিটওয়্যার খাতের বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও গভীর আপত্তির সৃষ্টি হয়েছে।


বর্তমান প্রচলিত নিয়মে নিট, ওভেন ও শিশুদের পোশাক ছাড়া অন্য কোনো পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের এমন কোনো কড়া বাধ্যবাধকতা বা আইনি নিয়ম ছিল না। তবে নতুন আমদানি নীতিতে পরিধি আরও বাড়িয়ে প্রথমবারের মতো অন্তর্বাস ও সিনথেটিক পণ্য, জুতো ও চামড়াজাত সামগ্রী, জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং আসবাবপত্র বা ফার্নিচার রপ্তানির ক্ষেত্রেও ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের এই কঠিন শর্ত যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সহজ ভাষায় মূল্য সংযোজন বলতে বোঝায়, বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে যে পণ্যটি তৈরি করা হচ্ছে, তার মোট মূল্যের ঠিক কতটুকু অংশ বা লভ্যাংশ প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের ভেতরে তৈরি হচ্ছে তার একটি সুনির্দিষ্ট হার। খসড়া নীতিমালার বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বাস ও অন্যান্য বিশেষায়িত সিনথেটিক পোশাক রপ্তানিতে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ, জুতো, চামড়াজাত পণ্য এবং নন-লেদার জুতো রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ, বিশালাকার জাহাজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ এবং কাঠের তৈরি ফার্নিচার বা আসবাবপত্র বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের কড়া শর্ত বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।


সরকারের এই প্রস্তাবের বিষয়ে পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান দেশের এক শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের বর্তমান উৎপাদন পরিস্থিতি বিবেচনা করলে কিছু নিটওয়্যার পণ্যের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করা সম্ভব হলেও ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে শিশুদের পোশাক, অন্তর্বাস এবং সিনথেটিক পণ্যের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত এই বর্ধিত হার বিভিন্ন কারখানা ও ব্র্যান্ডের সক্ষমতাভেদে অর্জন করা সম্ভব হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে বিদেশ থেকে নিট ফেব্রিক্স আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে বিজিএমইএ প্রধান বলেন, বাংলাদেশে এখনো উৎপাদিত হয় না—এমন বিশেষায়িত নিট ফেব্রিক্স বা কাপড় আমদানির সুযোগ অবশ্যই খোলা রাখতে হবে, অন্যথায় দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এই বিষয়ে আরও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মূল্যের যে নিট পোশাকগুলো রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করা অবাস্তব। কারণ এই ধরনের উন্নত কাপড়ের একটা বড় অংশই বাংলাদেশকে এখনো আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে দেশে নিট ফেব্রিক্স আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হলে তা দেশের ব্যবসার জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। তিনি আরও যোগ করেন, যদি সত্যিই নিট ফেব্রিক্স আমদানি বন্ধ করতে হয়, তবে দেশের ডাইং খাতে বিপুল বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে এবং নতুন বিনিয়োগের পরিবেশও অনুকূলে নেই। ফলে পণ্যের বৈচিত্র্য বজায় রাখতে ফেব্রিক্স আমদানির সুযোগ রাখা অত্যাবশ্যক।

এই খসড়া নীতিমালায় আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি, মোটরকার, যাত্রী পরিবহনকারী জিপ ও ট্রাক আমদানির ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আগের মতোই বহাল রাখা হয়েছে। তবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত পুরোনো পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহন বা ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানির এক দারুণ সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া কোনো কারখানার আগের বছরের মোট রপ্তানি আয়ের ওপর ভিত্তি করে কাঁচামাল আমদানির সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। ম্যান-মেইড ফাইবার, অন্তর্বাস ও সিনথেটিক ফাইবার পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির এই সীমা ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে একবারে ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি জুতো ও চামড়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে আগের বছরের রপ্তানি মূল্যের ৬০ শতাংশ এবং জাহাজ শিল্পে রপ্তানি ঋণপত্রের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। কাঠের ফার্নিচারের ক্ষেত্রে আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ এবং ফেব্রিক্স ফার্নিচারের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ থাকছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে খসড়া নীতিতে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশ থেকে হ্রাসকৃত বা কম শুল্কে পণ্য আমদানির সুবিধা পেতে হলে উৎপত্তিস্থলের সনদপত্র বা সার্টিফিকেট অব অরিজিন প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি আনা হয়েছে ইসরাইল ইস্যুতে; বর্তমান নীতিতে ইসরাইলি পণ্য আমদানিতে সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও, নতুন খসড়ায় তা সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ করার কঠোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। নতুন নিয়মে ইসরাইল থেকে বা সেখানে উৎপাদিত কোনো পণ্য বাংলাদেশে আনা যাবে না এবং ইসরাইলের পতাকাবাহী কোনো জাহাজও বাংলাদেশের কোনো বন্দরে ভিড়তে পারবে না।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


নতুন আমদানি নীতিতে তৈরি পোশাক খাতে কঠোর শর্ত, চাপে পড়তে পারেন রপ্তানিকারকরা

প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিতে কাঁচামাল আমদানিনির্ভর মূল্য সংযোজন বা ভ্যালু এডিশনের শর্ত অনেক বেশি কঠোর করার এক যুগান্তকারী ও অভূতপূর্ব উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে শিশুদের পোশাক তৈরি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সরকারের নতুন আমদানি নীতি আদেশে এই হার দ্বিগুণ বাড়িয়ে এক লাফে ৩০ শতাংশ করার চূড়ান্ত প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একইভাবে সুতা বা কটন এবং মানবসৃষ্ট কৃত্রিম আঁশ বা ম্যান-মেইড ফাইবার দিয়ে তৈরি সব ধরনের নিট ও ওভেন পোশাক বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রেও ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক ধাক্কায় ৩০ শতাংশ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দেশের পোশাক শিল্পে এক বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।


বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’-এর অত্যন্ত গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ খসড়ায় এই কঠিন প্রস্তাবগুলো রাখা হয়েছে। এই নতুন খসড়া নীতিটি চূড়ান্ত করার উদ্দেশ্যে আজ বৃহস্পতিবার দেশের সমস্ত ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের সাথে এক জরুরি ও উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে বসছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির। সরকারের এই দূরদর্শী ও নতুন নীতি যদি শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়ে কার্যকর হয়, তবে তা ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে বলবৎ থাকবে। এই খসড়া নীতিমালায় আরও একটি বিস্ফোরক প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, এখন থেকে বিদেশ থেকে কোনো ধরনের ‘নিট ফেব্রিক্স বা নিট কাপড় আমদানি করা যাবে না’। সরকারের এমন কঠোর অবস্থানের খবর জানাজানি হওয়ার পর থেকেই নিটওয়্যার খাতের বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও গভীর আপত্তির সৃষ্টি হয়েছে।


বর্তমান প্রচলিত নিয়মে নিট, ওভেন ও শিশুদের পোশাক ছাড়া অন্য কোনো পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের এমন কোনো কড়া বাধ্যবাধকতা বা আইনি নিয়ম ছিল না। তবে নতুন আমদানি নীতিতে পরিধি আরও বাড়িয়ে প্রথমবারের মতো অন্তর্বাস ও সিনথেটিক পণ্য, জুতো ও চামড়াজাত সামগ্রী, জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং আসবাবপত্র বা ফার্নিচার রপ্তানির ক্ষেত্রেও ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের এই কঠিন শর্ত যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সহজ ভাষায় মূল্য সংযোজন বলতে বোঝায়, বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে যে পণ্যটি তৈরি করা হচ্ছে, তার মোট মূল্যের ঠিক কতটুকু অংশ বা লভ্যাংশ প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের ভেতরে তৈরি হচ্ছে তার একটি সুনির্দিষ্ট হার। খসড়া নীতিমালার বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বাস ও অন্যান্য বিশেষায়িত সিনথেটিক পোশাক রপ্তানিতে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ, জুতো, চামড়াজাত পণ্য এবং নন-লেদার জুতো রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ, বিশালাকার জাহাজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ এবং কাঠের তৈরি ফার্নিচার বা আসবাবপত্র বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের কড়া শর্ত বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।


সরকারের এই প্রস্তাবের বিষয়ে পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান দেশের এক শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের বর্তমান উৎপাদন পরিস্থিতি বিবেচনা করলে কিছু নিটওয়্যার পণ্যের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করা সম্ভব হলেও ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে শিশুদের পোশাক, অন্তর্বাস এবং সিনথেটিক পণ্যের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত এই বর্ধিত হার বিভিন্ন কারখানা ও ব্র্যান্ডের সক্ষমতাভেদে অর্জন করা সম্ভব হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে বিদেশ থেকে নিট ফেব্রিক্স আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে বিজিএমইএ প্রধান বলেন, বাংলাদেশে এখনো উৎপাদিত হয় না—এমন বিশেষায়িত নিট ফেব্রিক্স বা কাপড় আমদানির সুযোগ অবশ্যই খোলা রাখতে হবে, অন্যথায় দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এই বিষয়ে আরও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মূল্যের যে নিট পোশাকগুলো রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করা অবাস্তব। কারণ এই ধরনের উন্নত কাপড়ের একটা বড় অংশই বাংলাদেশকে এখনো আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে দেশে নিট ফেব্রিক্স আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হলে তা দেশের ব্যবসার জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। তিনি আরও যোগ করেন, যদি সত্যিই নিট ফেব্রিক্স আমদানি বন্ধ করতে হয়, তবে দেশের ডাইং খাতে বিপুল বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে এবং নতুন বিনিয়োগের পরিবেশও অনুকূলে নেই। ফলে পণ্যের বৈচিত্র্য বজায় রাখতে ফেব্রিক্স আমদানির সুযোগ রাখা অত্যাবশ্যক।

এই খসড়া নীতিমালায় আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি, মোটরকার, যাত্রী পরিবহনকারী জিপ ও ট্রাক আমদানির ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আগের মতোই বহাল রাখা হয়েছে। তবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত পুরোনো পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহন বা ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানির এক দারুণ সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া কোনো কারখানার আগের বছরের মোট রপ্তানি আয়ের ওপর ভিত্তি করে কাঁচামাল আমদানির সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। ম্যান-মেইড ফাইবার, অন্তর্বাস ও সিনথেটিক ফাইবার পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির এই সীমা ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে একবারে ৭০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি জুতো ও চামড়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে আগের বছরের রপ্তানি মূল্যের ৬০ শতাংশ এবং জাহাজ শিল্পে রপ্তানি ঋণপত্রের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। কাঠের ফার্নিচারের ক্ষেত্রে আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ এবং ফেব্রিক্স ফার্নিচারের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির সুযোগ থাকছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে খসড়া নীতিতে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশ থেকে হ্রাসকৃত বা কম শুল্কে পণ্য আমদানির সুবিধা পেতে হলে উৎপত্তিস্থলের সনদপত্র বা সার্টিফিকেট অব অরিজিন প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি আনা হয়েছে ইসরাইল ইস্যুতে; বর্তমান নীতিতে ইসরাইলি পণ্য আমদানিতে সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও, নতুন খসড়ায় তা সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ করার কঠোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। নতুন নিয়মে ইসরাইল থেকে বা সেখানে উৎপাদিত কোনো পণ্য বাংলাদেশে আনা যাবে না এবং ইসরাইলের পতাকাবাহী কোনো জাহাজও বাংলাদেশের কোনো বন্দরে ভিড়তে পারবে না।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল