দিকপাল

মহাবিপর্যয়ের মুখে দেশের কৃষিখাত তলিয়ে গেছে লাখ হেক্টর জমির আবাদি ফসল, সংকটের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ



মহাবিপর্যয়ের মুখে দেশের কৃষিখাত তলিয়ে গেছে লাখ হেক্টর জমির আবাদি ফসল, সংকটের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ

দেশের সাত জেলার হাওরাঞ্চলে এখন উৎসবের আমেজ থাকার কথা ছিল, কিন্তু প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে সেখানে এখন কেবলই হাহাকার। কয়েক দিনের টানা ভারি বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কৃষকের আজীবনের স্বপ্ন এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এখন শুধুই থৈ থৈ জল। বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন প্রায় দেড় লাখ কৃষক পরিবার। কৃষি বিভাগ ও বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের প্রাথমিক তথ্যমতে, অন্তত এক লাখ হেক্টর জমির ফসল এখন পানির নিচে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মাঠের পর মাঠ সোনালী ধান এখন পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কোথাও কোথাও ধান কাটতে পারলেও তা মাড়াই বা শুকানোর কোনো জায়গা নেই। বৃষ্টির কারণে কাটা ধানের স্তূপে অঙ্কুর গজিয়ে উঠেছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে কৃষি বিভাগ থেকে ১১ হাজার ধান শুকানোর যন্ত্র বা ‘ড্রায়ার’ বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে মাঠ পর্যায়ে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, ঘোষণার পর অনেক দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো হাওরেই এই যন্ত্র পৌঁছায়নি। ফলে চোখের সামনে নিজের শ্রমের ফসল নষ্ট হতে দেখে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এই শোক সইতে না পেরে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আক্তার হোসেন নামে এক প্রান্তিক কৃষক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ঋণের বোঝা আর ফসল হারানোর যন্ত্রণাই তার মৃত্যুর কারণ বলে জানিয়েছে পরিবার।

দুর্ভোগের এখানেই শেষ নয়, হাওরে এখন ধান কাটার শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যে সামান্য ধান এখনো পানির ওপরে আছে, তা কাটার জন্য জনপ্রতি দেড় হাজার টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে বজ্রপাতের ভয়, অন্যদিকে শ্রমিকের চড়া দাম—সব মিলিয়ে কৃষকের অবস্থা এখন নাভিশ্বাস। সরকারিভাবে কম্বাইন হার্ভেস্টার যন্ত্র সরবরাহের কথা থাকলেও কৃষকদের দাবি, এগুলো প্রভাবশালী মহলের কবজায় চলে গেছে এবং অনেক স্থানে পানি বেড়ে যাওয়ায় এই যন্ত্রগুলো এখন আর ব্যবহারযোগ্য নয়। কৃষি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তারা এই মুহূর্তে কৃষকদের জন্য তেমন কিছুই করতে পারছেন না।

এদিকে সুনামগঞ্জের মতো এলাকাগুলোতে কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। যখন টানা বৃষ্টি আর বজ্রপাতের কারণে কৃষকরা ভয়ে মাঠে নামতে পারছিলেন না, তখন কৃষি বিভাগের প্রতিবেদনে ধান কাটার অবাস্তব উচ্চ হার দেখানো হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের মতে, এটি মাঠের প্রকৃত চিত্রের সঙ্গে সরাসরি তামাশার শামিল। কৃষকরা বলছেন, তাদের অন্তত অর্ধেকের বেশি ধান পানির নিচে পচে গেছে, অথচ সরকারি নথিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম দেখানো হচ্ছে। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এই মনগড়া প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সব মিলিয়ে, সোনালী ধানের হাসিতে যে হাওর মুখরিত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই নিঃস্ব কৃষকের দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্ক বিরাজ করছে।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ০৪ মে ২০২৬


মহাবিপর্যয়ের মুখে দেশের কৃষিখাত তলিয়ে গেছে লাখ হেক্টর জমির আবাদি ফসল, সংকটের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ মে ২০২৬

featured Image

দেশের সাত জেলার হাওরাঞ্চলে এখন উৎসবের আমেজ থাকার কথা ছিল, কিন্তু প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে সেখানে এখন কেবলই হাহাকার। কয়েক দিনের টানা ভারি বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কৃষকের আজীবনের স্বপ্ন এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এখন শুধুই থৈ থৈ জল। বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন প্রায় দেড় লাখ কৃষক পরিবার। কৃষি বিভাগ ও বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের প্রাথমিক তথ্যমতে, অন্তত এক লাখ হেক্টর জমির ফসল এখন পানির নিচে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মাঠের পর মাঠ সোনালী ধান এখন পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কোথাও কোথাও ধান কাটতে পারলেও তা মাড়াই বা শুকানোর কোনো জায়গা নেই। বৃষ্টির কারণে কাটা ধানের স্তূপে অঙ্কুর গজিয়ে উঠেছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে কৃষি বিভাগ থেকে ১১ হাজার ধান শুকানোর যন্ত্র বা ‘ড্রায়ার’ বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে মাঠ পর্যায়ে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, ঘোষণার পর অনেক দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো হাওরেই এই যন্ত্র পৌঁছায়নি। ফলে চোখের সামনে নিজের শ্রমের ফসল নষ্ট হতে দেখে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এই শোক সইতে না পেরে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আক্তার হোসেন নামে এক প্রান্তিক কৃষক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ঋণের বোঝা আর ফসল হারানোর যন্ত্রণাই তার মৃত্যুর কারণ বলে জানিয়েছে পরিবার।

দুর্ভোগের এখানেই শেষ নয়, হাওরে এখন ধান কাটার শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যে সামান্য ধান এখনো পানির ওপরে আছে, তা কাটার জন্য জনপ্রতি দেড় হাজার টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে বজ্রপাতের ভয়, অন্যদিকে শ্রমিকের চড়া দাম—সব মিলিয়ে কৃষকের অবস্থা এখন নাভিশ্বাস। সরকারিভাবে কম্বাইন হার্ভেস্টার যন্ত্র সরবরাহের কথা থাকলেও কৃষকদের দাবি, এগুলো প্রভাবশালী মহলের কবজায় চলে গেছে এবং অনেক স্থানে পানি বেড়ে যাওয়ায় এই যন্ত্রগুলো এখন আর ব্যবহারযোগ্য নয়। কৃষি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তারা এই মুহূর্তে কৃষকদের জন্য তেমন কিছুই করতে পারছেন না।

এদিকে সুনামগঞ্জের মতো এলাকাগুলোতে কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। যখন টানা বৃষ্টি আর বজ্রপাতের কারণে কৃষকরা ভয়ে মাঠে নামতে পারছিলেন না, তখন কৃষি বিভাগের প্রতিবেদনে ধান কাটার অবাস্তব উচ্চ হার দেখানো হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের মতে, এটি মাঠের প্রকৃত চিত্রের সঙ্গে সরাসরি তামাশার শামিল। কৃষকরা বলছেন, তাদের অন্তত অর্ধেকের বেশি ধান পানির নিচে পচে গেছে, অথচ সরকারি নথিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম দেখানো হচ্ছে। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এই মনগড়া প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সব মিলিয়ে, সোনালী ধানের হাসিতে যে হাওর মুখরিত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই নিঃস্ব কৃষকের দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্ক বিরাজ করছে।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল