দিকপাল

রুদ্ধশ্বাস সেই কয়েক ঘণ্টা: বিভীষিকাময় জিম্মি দশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রোমহর্ষক সত্য!


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : সোমবার, ০৪ মে ২০২৬ | ১২:১৪ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

রুদ্ধশ্বাস সেই কয়েক ঘণ্টা: বিভীষিকাময় জিম্মি দশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রোমহর্ষক সত্য!

নীল সমুদ্রের বিশাল জলরাশি আর ঢেউয়ের আড়ালে যে কতবড় বিভীষিকা লুকিয়ে থাকতে পারে, তার এক ভয়াবহ সাক্ষী হয়ে রইল আন্দামান সাগর। গত ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের এক কালবোশেখী সন্ধ্যায় কক্সবাজারের বাহারছড়া উপকূল থেকে যখন ৪২ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি ট্রলার মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল, তখন সেটিতে থাকা পৌনে তিনশ নারী, পুরুষ ও শিশুর চোখে ছিল সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে কয়েক দিনের মধ্যেই গভীর সমুদ্রের অতলে সলিল সমাধিতে পরিণত হবে, তা ছিল কারো কল্পনার বাইরে।

ঘটনার শুরু হয় অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এক অপহরণ ও প্রতারণার জালে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ থেকে শুরু করে টেকনাফের দুর্গম পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত এক ভয়ংকর সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা অসহায় রোহিঙ্গা ও কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী বাংলাদেশিদের টার্গেট করে। কখনো ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে, আবার কখনো সিএনজি বা টমটম থেকে সরাসরি অপহরণ করে নির্জন পাহাড়ের গোপন আস্তানায় জিম্মি করা হয়। সেখানে চলে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এক একজন জিম্মিকে মাত্র ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে বড় দালালদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর তাদের ওপর চলে চূড়ান্ত নিপীড়ন, যতক্ষণ না পরিবার থেকে কয়েক লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় হয়। যারা টাকা দিতে পারে না, তাদের জোর করে তুলে দেওয়া হয় মালয়েশিয়াগামী মৃত্যুফাঁদ সদৃশ এই ট্রলারগুলোতে।

সেই অভিশপ্ত ট্রলারটিতে কোনো পণ্য ছিল না, ছিল কেবল মানুষ। ট্রলারের নিচের বরফঘর থেকে শুরু করে ডেক পর্যন্ত প্রতি ইঞ্চি জায়গায় গাদাগাদি করে বসিয়ে প্রায় ২৬৪ জনকে নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। চার দিন সাগরে ভাসার পর যখন ট্রলারটি আন্দামান সাগরে প্রবেশ করে, তখন থেকেই শুরু হয় চরম বিশৃঙ্খলা। অসহ্য গরমে তৃষ্ণার্ত মানুষ যখন এক ফোঁটা পানির জন্য আর্তনাদ করছিল, তখন দালালচক্রের সদস্যরা দয়া দেখানোর বদলে শুরু করে অমানুষিক পিটুনি। অভিযোগ রয়েছে, অক্সিজেনের অভাবে ট্রলারের নিচের কুঠুরিতে একই রাতে অন্তত ৩৩ জন প্রাণ হারায়। সেই লাশগুলো সাগরে ফেলার সময় ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে একদিকে কাত হয়ে যায় এবং নিমিষেই সমুদ্রের নোনা জলে তলিয়ে যায় কয়েকশ প্রাণ।

ট্রলারডুবির প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর ৯ এপ্রিল সকালে একটি অলৌকিক উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়। ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি জাহাজ ‘এমটি মেঘনা প্রাইড’ সেই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় ডেক থেকে এক ক্রু সাগরে কাউকে ভাসতে দেখেন। জাহাজের ক্যাপ্টেন ওমর জাহানের মানবিক ও সাহসী নেতৃত্বে তিন ঘণ্টার চেষ্টায় ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। উদ্ধারকৃতদের অবস্থা ছিল বর্ণনাতীত—রোদে চামড়া ঝলসে যাওয়া, নোনা জলে শরীর বিধ্বস্ত এবং মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া। তারা এখনো সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। ট্রলারের ভেতরে আটকে থাকা বহু মানুষ বের হওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি, তারা ট্রলারসহ চিরতরে উধাও হয়ে গেছে আন্দামানের অতলে।

এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির ক্ষত এখন কক্সবাজারের নানা প্রান্তে। কেউ স্বামী হারিয়েছেন, কেউ সন্তান, আবার কেউ তার পুরো পরিবার। ২৫ দিন পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের ফেরার প্রতীক্ষায় দরজায় চেয়ে আছেন বৃদ্ধ বাবা-মা। অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে এসেছে যে, এই চক্রের শিকড় সুদূর মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। যারা কোনোমতে ওপারে পৌঁছাতে পারে, তাদের জন্যও অপেক্ষা করে জিম্মিদশার দ্বিতীয় অধ্যায়। থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার গহীন জঙ্গলে আটকে রেখে ফের মুক্তিপণ আদায়ের বাণিজ্য চলে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার বাহিনী এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, পাচারকারী চক্রের হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে নতুন কোনো ট্রলার সাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সমুদ্রের নীল জলরাশি আজ শত শত মানুষের চোখের জলে লোনা হয়ে আছে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ০৪ মে ২০২৬


রুদ্ধশ্বাস সেই কয়েক ঘণ্টা: বিভীষিকাময় জিম্মি দশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রোমহর্ষক সত্য!

প্রকাশের তারিখ : ০৪ মে ২০২৬

featured Image

নীল সমুদ্রের বিশাল জলরাশি আর ঢেউয়ের আড়ালে যে কতবড় বিভীষিকা লুকিয়ে থাকতে পারে, তার এক ভয়াবহ সাক্ষী হয়ে রইল আন্দামান সাগর। গত ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের এক কালবোশেখী সন্ধ্যায় কক্সবাজারের বাহারছড়া উপকূল থেকে যখন ৪২ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি ট্রলার মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল, তখন সেটিতে থাকা পৌনে তিনশ নারী, পুরুষ ও শিশুর চোখে ছিল সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে কয়েক দিনের মধ্যেই গভীর সমুদ্রের অতলে সলিল সমাধিতে পরিণত হবে, তা ছিল কারো কল্পনার বাইরে।

ঘটনার শুরু হয় অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এক অপহরণ ও প্রতারণার জালে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ থেকে শুরু করে টেকনাফের দুর্গম পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত এক ভয়ংকর সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা অসহায় রোহিঙ্গা ও কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী বাংলাদেশিদের টার্গেট করে। কখনো ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে, আবার কখনো সিএনজি বা টমটম থেকে সরাসরি অপহরণ করে নির্জন পাহাড়ের গোপন আস্তানায় জিম্মি করা হয়। সেখানে চলে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এক একজন জিম্মিকে মাত্র ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে বড় দালালদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর তাদের ওপর চলে চূড়ান্ত নিপীড়ন, যতক্ষণ না পরিবার থেকে কয়েক লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় হয়। যারা টাকা দিতে পারে না, তাদের জোর করে তুলে দেওয়া হয় মালয়েশিয়াগামী মৃত্যুফাঁদ সদৃশ এই ট্রলারগুলোতে।

সেই অভিশপ্ত ট্রলারটিতে কোনো পণ্য ছিল না, ছিল কেবল মানুষ। ট্রলারের নিচের বরফঘর থেকে শুরু করে ডেক পর্যন্ত প্রতি ইঞ্চি জায়গায় গাদাগাদি করে বসিয়ে প্রায় ২৬৪ জনকে নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। চার দিন সাগরে ভাসার পর যখন ট্রলারটি আন্দামান সাগরে প্রবেশ করে, তখন থেকেই শুরু হয় চরম বিশৃঙ্খলা। অসহ্য গরমে তৃষ্ণার্ত মানুষ যখন এক ফোঁটা পানির জন্য আর্তনাদ করছিল, তখন দালালচক্রের সদস্যরা দয়া দেখানোর বদলে শুরু করে অমানুষিক পিটুনি। অভিযোগ রয়েছে, অক্সিজেনের অভাবে ট্রলারের নিচের কুঠুরিতে একই রাতে অন্তত ৩৩ জন প্রাণ হারায়। সেই লাশগুলো সাগরে ফেলার সময় ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে একদিকে কাত হয়ে যায় এবং নিমিষেই সমুদ্রের নোনা জলে তলিয়ে যায় কয়েকশ প্রাণ।

ট্রলারডুবির প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর ৯ এপ্রিল সকালে একটি অলৌকিক উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়। ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি জাহাজ ‘এমটি মেঘনা প্রাইড’ সেই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় ডেক থেকে এক ক্রু সাগরে কাউকে ভাসতে দেখেন। জাহাজের ক্যাপ্টেন ওমর জাহানের মানবিক ও সাহসী নেতৃত্বে তিন ঘণ্টার চেষ্টায় ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। উদ্ধারকৃতদের অবস্থা ছিল বর্ণনাতীত—রোদে চামড়া ঝলসে যাওয়া, নোনা জলে শরীর বিধ্বস্ত এবং মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া। তারা এখনো সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। ট্রলারের ভেতরে আটকে থাকা বহু মানুষ বের হওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি, তারা ট্রলারসহ চিরতরে উধাও হয়ে গেছে আন্দামানের অতলে।

এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির ক্ষত এখন কক্সবাজারের নানা প্রান্তে। কেউ স্বামী হারিয়েছেন, কেউ সন্তান, আবার কেউ তার পুরো পরিবার। ২৫ দিন পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের ফেরার প্রতীক্ষায় দরজায় চেয়ে আছেন বৃদ্ধ বাবা-মা। অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে এসেছে যে, এই চক্রের শিকড় সুদূর মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। যারা কোনোমতে ওপারে পৌঁছাতে পারে, তাদের জন্যও অপেক্ষা করে জিম্মিদশার দ্বিতীয় অধ্যায়। থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার গহীন জঙ্গলে আটকে রেখে ফের মুক্তিপণ আদায়ের বাণিজ্য চলে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার বাহিনী এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, পাচারকারী চক্রের হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে নতুন কোনো ট্রলার সাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সমুদ্রের নীল জলরাশি আজ শত শত মানুষের চোখের জলে লোনা হয়ে আছে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল