কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা মাসুমের মাসিক আয় ৪২ হাজার টাকা। আপাতদৃষ্টিতে এই অঙ্কটি সম্মানজনক মনে হলেও বাস্তবতার কষাঘাতে পাঁচজনের সংসার চালাতে গিয়ে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাস শেষে সব খরচ মিটিয়ে হাতে থাকে মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা, যা দিয়ে অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসা আর সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতি মাসেই তাকে ঋণের জালে জড়াতে হচ্ছে। মাসুমের এই করুণ জীবনকাহিনি এখন দেশের লাখো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রতিচ্ছবি। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে রান্নার গ্যাস—প্রতিটি জিনিসের দাম এখন সাধারণের নাগালের বাইরে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশে, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় হু-হু করে বাড়ায় মাসের শুরুতেই হিসাব মেলাতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন ভোক্তারা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকেই বেঁচে থাকার তাগিদে খাবারের তালিকা থেকে পুষ্টিকর খাবার বাদ দিচ্ছেন অথবা তিল তিল করে জমানো সঞ্চয় ভেঙে খরচ মেটাচ্ছেন। বাজার তদারকিতে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এক শ্রেণির অসাধু চক্র মুনাফার পাহাড় গড়ছে, আর তার মাশুল দিচ্ছে সাধারণ কর্মজীবী মানুষ।
রাজধানীর খুচরা বাজারে বর্তমানে চালের কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকায় ঠেকেছে। ডালের দাম কেজিপ্রতি ১৬০ টাকা এবং যেকোনো সাধারণ সবজি কিনতে গেলেও কেজিপ্রতি অন্তত ৮০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এক সময় গরিবের প্রোটিনের উৎস হিসেবে পরিচিত ডিমের ডজন এখন ১৫৫ টাকা। মাছ-মাংস কেনা এখন সাধারণ মানুষের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এক কেজি গরুর মাংসের জন্য গুণতে হচ্ছে ৮০০ টাকারও বেশি, আর খাসির মাংসের দাম ছাড়িয়েছে ১২০০ টাকা। সাধারণ মানুষের মাছ হিসেবে পরিচিত পাঙাশ বা তেলাপিয়ার কেজিও এখন ২০০ থেকে ২৫০ টাকার নিচে মিলছে না। রান্নার কাজে ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম গত তিন মাসে প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়ে ১৯৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা সাধারণ গৃহস্থালির বাজেটে বড় ধরনের আঘাত।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, বাজারে ক্রেতাদের নাজেহাল অবস্থা চরমে পৌঁছেছে। তদারকি সংস্থাগুলোর নীরবতা অসাধু ব্যবসায়ীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় মানুষ ক্রমাগত দরিদ্র হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, তাদের কোনো সঞ্চয় বা ঋণ পাওয়ার সুযোগ না থাকায় তারা চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও নজরদারির কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জনবল সংকটের কথা জানানো হলেও, সাধারণ মানুষ চায় বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং সিন্ডিকেট নির্মূলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ। মাসুমের মতো লাখো মানুষের সংসার এখন কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬
কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা মাসুমের মাসিক আয় ৪২ হাজার টাকা। আপাতদৃষ্টিতে এই অঙ্কটি সম্মানজনক মনে হলেও বাস্তবতার কষাঘাতে পাঁচজনের সংসার চালাতে গিয়ে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাস শেষে সব খরচ মিটিয়ে হাতে থাকে মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা, যা দিয়ে অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসা আর সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতি মাসেই তাকে ঋণের জালে জড়াতে হচ্ছে। মাসুমের এই করুণ জীবনকাহিনি এখন দেশের লাখো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রতিচ্ছবি। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে রান্নার গ্যাস—প্রতিটি জিনিসের দাম এখন সাধারণের নাগালের বাইরে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশে, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় হু-হু করে বাড়ায় মাসের শুরুতেই হিসাব মেলাতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন ভোক্তারা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকেই বেঁচে থাকার তাগিদে খাবারের তালিকা থেকে পুষ্টিকর খাবার বাদ দিচ্ছেন অথবা তিল তিল করে জমানো সঞ্চয় ভেঙে খরচ মেটাচ্ছেন। বাজার তদারকিতে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এক শ্রেণির অসাধু চক্র মুনাফার পাহাড় গড়ছে, আর তার মাশুল দিচ্ছে সাধারণ কর্মজীবী মানুষ।
রাজধানীর খুচরা বাজারে বর্তমানে চালের কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকায় ঠেকেছে। ডালের দাম কেজিপ্রতি ১৬০ টাকা এবং যেকোনো সাধারণ সবজি কিনতে গেলেও কেজিপ্রতি অন্তত ৮০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এক সময় গরিবের প্রোটিনের উৎস হিসেবে পরিচিত ডিমের ডজন এখন ১৫৫ টাকা। মাছ-মাংস কেনা এখন সাধারণ মানুষের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এক কেজি গরুর মাংসের জন্য গুণতে হচ্ছে ৮০০ টাকারও বেশি, আর খাসির মাংসের দাম ছাড়িয়েছে ১২০০ টাকা। সাধারণ মানুষের মাছ হিসেবে পরিচিত পাঙাশ বা তেলাপিয়ার কেজিও এখন ২০০ থেকে ২৫০ টাকার নিচে মিলছে না। রান্নার কাজে ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম গত তিন মাসে প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়ে ১৯৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা সাধারণ গৃহস্থালির বাজেটে বড় ধরনের আঘাত।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, বাজারে ক্রেতাদের নাজেহাল অবস্থা চরমে পৌঁছেছে। তদারকি সংস্থাগুলোর নীরবতা অসাধু ব্যবসায়ীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় মানুষ ক্রমাগত দরিদ্র হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, তাদের কোনো সঞ্চয় বা ঋণ পাওয়ার সুযোগ না থাকায় তারা চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও নজরদারির কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জনবল সংকটের কথা জানানো হলেও, সাধারণ মানুষ চায় বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং সিন্ডিকেট নির্মূলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ। মাসুমের মতো লাখো মানুষের সংসার এখন কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন