দিকপাল

লাইসেন্সহীন অটোরিকশার ‘মরণফাঁদ’: সড়কে থামছে না বিশৃঙ্খলা


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬ | ১১:৪৭ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

লাইসেন্সহীন অটোরিকশার ‘মরণফাঁদ’: সড়কে থামছে না বিশৃঙ্খলা

রাজধানীর অলিগলি ছাড়িয়ে এখন প্রধান সড়কগুলোতেও ত্রাস সৃষ্টি করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ কিংবা আইনি বৈধতা—কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই ঢাকার রাজপথে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় ১০ লাখের বেশি এই তিন চাকার বাহন। চালকদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকলেও গতির নেশায় তারা আজ রাস্তার একচ্ছত্র অধিপতিতে পরিণত হয়েছে। মূলত স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই যানের দৌরাত্ম্যে রাজধানী এখন তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনার এক বড় কারখানায় রূপ নিয়েছে। জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছানোয় এই বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় আগামী ১৪ মে দুই সিটি করপোরেশন ও ডিএমপির কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানীতে প্রায় ১৩ হাজার গ্যারেজে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এসব রিকশা প্রতিদিন দেশের বিদ্যুৎ খাত থেকে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করছে। আঁতকে ওঠার মতো তথ্য হলো, এই বিশাল বিদ্যুৎ চাহিদার সিংহভাগই মেটানো হচ্ছে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ও চোরাই লাইনের মাধ্যমে। রাজধানীর হাজার হাজার গ্যারেজের বিপরীতে বৈধ চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েক হাজার মাত্র। আবাসিক মিটার কিংবা সরাসরি খুঁটি থেকে বিদ্যুৎ চুরি করে রিকশা চার্জ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর তদারকি নেই বললেই চলে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎ বিভাগের নিচুতলার কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই বিশাল চুরির চক্র সচল রয়েছে।

গ্যারেজ মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এবং এই খাত থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেন হওয়ায় এর শেকড় অনেক গভীরে। রাজধানীর মানিকনগর, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর এবং তেজগাঁওয়ের মতো এলাকাগুলোতে ফুটপাত দখল করে শত শত গ্যারেজ গড়ে তোলা হয়েছে। গ্রাম থেকে আসা অদক্ষ চালকদের হাতে মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে রিকশা তুলে দিচ্ছেন মালিকরা। এসব চালক যেমন জানেন না ট্রাফিক সংকেত, তেমনি তাদের নেই সড়কের কোনো অভিজ্ঞতা। সাধারণ যাত্রীদের মতে, এই রিকশাগুলো এখন রাজধানীর প্রধান মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। দ্রুতগতির কারণে প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যাচ্ছে রিকশা, যার শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশুসহ সাধারণ পথচারীরা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই যানজট ও বিশৃঙ্খলা নিরসনে তারা বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যে ডিএমপি ও ট্রাফিক বিভাগের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্ন হওয়া হচ্ছে। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিষয়টি যতটা সহজ মনে হচ্ছে আসলে ততটা নয়। গত কয়েক বছরে এই খাতের সাথে জড়িত মানুষের সংখ্যা এতই বেড়েছে যে, এখন তাদের হুট করে বন্ধ করতে গেলে আন্দোলনের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। তাই শক্তি প্রয়োগের চেয়ে দ্রুত একটি বিজ্ঞানসম্মত নীতিমালা করে এদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনা জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন। অন্যথায় এই বিশৃঙ্খলা নগরবাসীকে আরও বড় কোনো সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।

পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য নিয়মিত অভিযানের কথা দাবি করা হচ্ছে। প্রধান সড়কে উঠলেই রিকশার গদি জব্দ করা কিংবা চাকা ফুটো করে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরদিনই রিকশাগুলো আবারও নতুন চেহারায় রাস্তায় ফিরে আসছে। গ্যারেজ মালিকদের দাবি, সরকার যেন তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে দেয় যাতে তারা বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যে বাহনটি আইনগতভাবে নিষিদ্ধ এবং যা প্রতিদিন রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরি করছে, তাকে নীতিমালার আওতায় এনে কতটুকু সুফল পাওয়া যাবে। ঢাকার রাজপথকে আধুনিক ও নিরাপদ করতে হলে এই অনিবন্ধিত বাহনের রাশ টেনে ধরা ছাড়া বর্তমানে বিকল্প কোনো পথ নেই বলেই মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ১৩ মে ২০২৬


লাইসেন্সহীন অটোরিকশার ‘মরণফাঁদ’: সড়কে থামছে না বিশৃঙ্খলা

প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬

featured Image

রাজধানীর অলিগলি ছাড়িয়ে এখন প্রধান সড়কগুলোতেও ত্রাস সৃষ্টি করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ কিংবা আইনি বৈধতা—কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই ঢাকার রাজপথে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় ১০ লাখের বেশি এই তিন চাকার বাহন। চালকদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকলেও গতির নেশায় তারা আজ রাস্তার একচ্ছত্র অধিপতিতে পরিণত হয়েছে। মূলত স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই যানের দৌরাত্ম্যে রাজধানী এখন তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনার এক বড় কারখানায় রূপ নিয়েছে। জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছানোয় এই বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় আগামী ১৪ মে দুই সিটি করপোরেশন ও ডিএমপির কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানীতে প্রায় ১৩ হাজার গ্যারেজে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এসব রিকশা প্রতিদিন দেশের বিদ্যুৎ খাত থেকে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করছে। আঁতকে ওঠার মতো তথ্য হলো, এই বিশাল বিদ্যুৎ চাহিদার সিংহভাগই মেটানো হচ্ছে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ও চোরাই লাইনের মাধ্যমে। রাজধানীর হাজার হাজার গ্যারেজের বিপরীতে বৈধ চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েক হাজার মাত্র। আবাসিক মিটার কিংবা সরাসরি খুঁটি থেকে বিদ্যুৎ চুরি করে রিকশা চার্জ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর তদারকি নেই বললেই চলে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎ বিভাগের নিচুতলার কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই বিশাল চুরির চক্র সচল রয়েছে।

গ্যারেজ মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এবং এই খাত থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেন হওয়ায় এর শেকড় অনেক গভীরে। রাজধানীর মানিকনগর, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর এবং তেজগাঁওয়ের মতো এলাকাগুলোতে ফুটপাত দখল করে শত শত গ্যারেজ গড়ে তোলা হয়েছে। গ্রাম থেকে আসা অদক্ষ চালকদের হাতে মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে রিকশা তুলে দিচ্ছেন মালিকরা। এসব চালক যেমন জানেন না ট্রাফিক সংকেত, তেমনি তাদের নেই সড়কের কোনো অভিজ্ঞতা। সাধারণ যাত্রীদের মতে, এই রিকশাগুলো এখন রাজধানীর প্রধান মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। দ্রুতগতির কারণে প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যাচ্ছে রিকশা, যার শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশুসহ সাধারণ পথচারীরা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই যানজট ও বিশৃঙ্খলা নিরসনে তারা বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যে ডিএমপি ও ট্রাফিক বিভাগের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করা হয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্ন হওয়া হচ্ছে। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিষয়টি যতটা সহজ মনে হচ্ছে আসলে ততটা নয়। গত কয়েক বছরে এই খাতের সাথে জড়িত মানুষের সংখ্যা এতই বেড়েছে যে, এখন তাদের হুট করে বন্ধ করতে গেলে আন্দোলনের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। তাই শক্তি প্রয়োগের চেয়ে দ্রুত একটি বিজ্ঞানসম্মত নীতিমালা করে এদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনা জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন। অন্যথায় এই বিশৃঙ্খলা নগরবাসীকে আরও বড় কোনো সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।

পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য নিয়মিত অভিযানের কথা দাবি করা হচ্ছে। প্রধান সড়কে উঠলেই রিকশার গদি জব্দ করা কিংবা চাকা ফুটো করে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরদিনই রিকশাগুলো আবারও নতুন চেহারায় রাস্তায় ফিরে আসছে। গ্যারেজ মালিকদের দাবি, সরকার যেন তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে দেয় যাতে তারা বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যে বাহনটি আইনগতভাবে নিষিদ্ধ এবং যা প্রতিদিন রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরি করছে, তাকে নীতিমালার আওতায় এনে কতটুকু সুফল পাওয়া যাবে। ঢাকার রাজপথকে আধুনিক ও নিরাপদ করতে হলে এই অনিবন্ধিত বাহনের রাশ টেনে ধরা ছাড়া বর্তমানে বিকল্প কোনো পথ নেই বলেই মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল