দিকপাল

হামের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যয়, নিউমোনিয়ায় মৃত্যুঝুঁকি আরও বেশি


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শনিবার, ১৬ মে ২০২৬ | ১০:৫৯ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

হামের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যয়, নিউমোনিয়ায় মৃত্যুঝুঁকি আরও বেশি

বাংলাদেশে বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব এক চরম উদ্বেগজনক ও সংঙ্কটপূর্ণ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। বিগত আড়াই দশকের সমস্ত রেকর্ড লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গত দুই মাসে দেশজুড়ে হাম এবং এই রোগের লক্ষণযুক্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে দুই হাজার সালের পর থেকে দেশের কোনো বছরেই হামের বার্ষিক সংক্রমণ ৫০ হাজারের ঘর স্পর্শ করতে পারেনি। সরকারের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত দুই মাসের ব্যবধানে দেশজুড়ে সর্বমোট ৪৫১ জন নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই ঘাতক ব্যাধি। মৃত্যুর এই মিছিল প্রতিনিয়তই দীর্ঘ হচ্ছে, যার প্রমাণ মেলে গত চব্বিশ ঘণ্টায় আরও ১২ জন শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

জাতীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যায়, গত চব্বিশ ঘণ্টায় মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে চারজনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল এবং বাকি আটজনের শরীরের অন্যান্য উপসর্গের পাশাপাশি এই রোগের স্পষ্ট লক্ষণ ছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই মাসে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৭৪ জন এবং এই রোগের তীব্র লক্ষণ নিয়ে আরও ৩৭৭ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনার দিক থেকে দেশের ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে একাই ১৫০ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এর পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৮ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। শুধু শেষ এক দিনেই নতুন করে ১১১ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্তের পাশাপাশি এক হাজার ১৯২ জন লক্ষণযুক্ত শিশু চিকিৎসার জন্য দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে, যাদের মধ্যে এক হাজার ১৬ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার হাসপাতালগুলোতেই এক দিনে সর্বোচ্চ ৪২২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন, আর সবচেয়ে কম রোগী আসার খবর মিলেছে রংপুর থেকে। সামগ্রিকভাবে দুই মাসে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৬১১ জনে, যার মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় সাত হাজার ৪২১ জনের শরীরে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বিগত আড়াই দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৯৩৪ জন হামের রোগী পাওয়া গিয়েছিল। এরপর থেকে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির ফলে এই সংক্রমণ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে এবং গত বছর এই সংখ্যা মাত্র ১৩২ জনে নেমে এসেছিল। এমনকি ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরেও এই রোগীর সংখ্যা ছিল নামমাত্র। কিন্তু এবারের এই আকস্মিক ও বিশাল উল্লম্ফন দেশে একটি বড় ধরনের মহামারি ও প্রাদুর্ভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সংগৃহীত ৬০ জন মৃত শিশুর বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এক ভয়াবহ সত্য সামনে এসেছে; মৃত শিশুদের একটি বড় অংশই আসলে প্রথম ডোজের টিকা পাওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। এর মধ্যে তিন থেকে আট মাস বয়সী ২৯ জন শিশু রয়েছে, যাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী টিকা পাওয়ার ন্যূনতম বয়সই হয়নি। এ ছাড়া ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী ২১ জন এবং ১৬ মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৯টি শিশুর মৃত্যু নথিভুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এই বিপুল সংখ্যক শিশুর অকাল মৃত্যুর পেছনে প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন। চিকিৎসকদের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা ও গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুরা মূলত হামের পরবর্তী জটিলতা হিসেবে তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং শ্বাসকষ্টের কারণে মারা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিশুদের মারাত্মক শারীরিক অপুষ্টি। অনেক মায়ের নিজের শরীরে পুষ্টির অভাব থাকায় জন্ম নেওয়া শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল থাকে, যার ফলে হামের ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর শিশুরা তা প্রতিরোধ করতে পারছে না। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে হামের চিকিৎসার নীতিমালায় জরুরি পরিবর্তন এনেছে। আগে যেখানে প্রথম ডোজের বয়স ৯ মাস নির্ধারিত ছিল, এখন ছোট শিশুদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে সেই বয়সসীমা কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। একই সঙ্গে সব অভিভাবককে তাদের শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের বাইরেও চলমান বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় আবারও হাম ও রুবেলার প্রতিষেধক দেওয়ার জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৫ থেকে ৮ শতাংশই পরবর্তীতে মারাত্মক নিউমোনিয়ায় ভুগছে। তবে আশার কথা হলো, লক্ষণ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই যদি শিশুকে সঠিক ও উন্নত চিকিৎসার আওতায় আনা যায়, তবে শতকরা ৯৯ ভাগ রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। চিকিৎসকদের মতে, হাম মূলত শিশুর শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে একবারে ভেঙে দেয়, যার ফলে অন্য যেকোনো সাধারণ রোগও শিশুর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। এই রোগপ্রবণতা বাড়ার পেছনে শিশুদের সঠিক খাদ্যাভ্যাসের অভাব এবং মায়ের বুকের দুধ না পাওয়াকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখছেন পুষ্টিবিদরা। বর্তমানে দেশে মাত্র ৫৬ শতাংশ শিশু নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ পায়, আর বাকি শিশুদের প্যাকেটজাত বা কৃত্রিম খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে তুলছে। এই ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবিলায় দেশব্যাপী প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিশেষ জ্বর ও হামের জন্য পৃথক বুথ চালু করা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া এবং গ্রামীণ অঞ্চলে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। এই সংকটের মাঝেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আরও এক শিশুর মৃত্যুর বেদনাদায়ক খবর পাওয়া গেছে। তারাকান্দা উপজেলার ৯ মাস বয়সী ওই শিশুটিকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তির পর সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নিউমোনিয়া এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়েই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। গত দুই মাসে এই একটি হাসপাতালেই এক হাজার ৩৪০ জন হামের রোগী ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে এক হাজার ২০৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও শেষ রক্ষা হয়নি ৩৩ জন শিশুর।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


হামের প্রাদুর্ভাবে বিপর্যয়, নিউমোনিয়ায় মৃত্যুঝুঁকি আরও বেশি

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশে বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব এক চরম উদ্বেগজনক ও সংঙ্কটপূর্ণ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। বিগত আড়াই দশকের সমস্ত রেকর্ড লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গত দুই মাসে দেশজুড়ে হাম এবং এই রোগের লক্ষণযুক্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে দুই হাজার সালের পর থেকে দেশের কোনো বছরেই হামের বার্ষিক সংক্রমণ ৫০ হাজারের ঘর স্পর্শ করতে পারেনি। সরকারের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত দুই মাসের ব্যবধানে দেশজুড়ে সর্বমোট ৪৫১ জন নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই ঘাতক ব্যাধি। মৃত্যুর এই মিছিল প্রতিনিয়তই দীর্ঘ হচ্ছে, যার প্রমাণ মেলে গত চব্বিশ ঘণ্টায় আরও ১২ জন শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

জাতীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যায়, গত চব্বিশ ঘণ্টায় মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে চারজনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল এবং বাকি আটজনের শরীরের অন্যান্য উপসর্গের পাশাপাশি এই রোগের স্পষ্ট লক্ষণ ছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই মাসে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৭৪ জন এবং এই রোগের তীব্র লক্ষণ নিয়ে আরও ৩৭৭ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনার দিক থেকে দেশের ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে একাই ১৫০ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এর পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৮ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। শুধু শেষ এক দিনেই নতুন করে ১১১ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্তের পাশাপাশি এক হাজার ১৯২ জন লক্ষণযুক্ত শিশু চিকিৎসার জন্য দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে, যাদের মধ্যে এক হাজার ১৬ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার হাসপাতালগুলোতেই এক দিনে সর্বোচ্চ ৪২২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন, আর সবচেয়ে কম রোগী আসার খবর মিলেছে রংপুর থেকে। সামগ্রিকভাবে দুই মাসে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৬১১ জনে, যার মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় সাত হাজার ৪২১ জনের শরীরে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বিগত আড়াই দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৯৩৪ জন হামের রোগী পাওয়া গিয়েছিল। এরপর থেকে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির ফলে এই সংক্রমণ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে এবং গত বছর এই সংখ্যা মাত্র ১৩২ জনে নেমে এসেছিল। এমনকি ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরেও এই রোগীর সংখ্যা ছিল নামমাত্র। কিন্তু এবারের এই আকস্মিক ও বিশাল উল্লম্ফন দেশে একটি বড় ধরনের মহামারি ও প্রাদুর্ভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সংগৃহীত ৬০ জন মৃত শিশুর বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এক ভয়াবহ সত্য সামনে এসেছে; মৃত শিশুদের একটি বড় অংশই আসলে প্রথম ডোজের টিকা পাওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। এর মধ্যে তিন থেকে আট মাস বয়সী ২৯ জন শিশু রয়েছে, যাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী টিকা পাওয়ার ন্যূনতম বয়সই হয়নি। এ ছাড়া ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী ২১ জন এবং ১৬ মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৯টি শিশুর মৃত্যু নথিভুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এই বিপুল সংখ্যক শিশুর অকাল মৃত্যুর পেছনে প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন। চিকিৎসকদের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা ও গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুরা মূলত হামের পরবর্তী জটিলতা হিসেবে তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং শ্বাসকষ্টের কারণে মারা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিশুদের মারাত্মক শারীরিক অপুষ্টি। অনেক মায়ের নিজের শরীরে পুষ্টির অভাব থাকায় জন্ম নেওয়া শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল থাকে, যার ফলে হামের ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর শিশুরা তা প্রতিরোধ করতে পারছে না। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে হামের চিকিৎসার নীতিমালায় জরুরি পরিবর্তন এনেছে। আগে যেখানে প্রথম ডোজের বয়স ৯ মাস নির্ধারিত ছিল, এখন ছোট শিশুদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে সেই বয়সসীমা কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। একই সঙ্গে সব অভিভাবককে তাদের শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের বাইরেও চলমান বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় আবারও হাম ও রুবেলার প্রতিষেধক দেওয়ার জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৫ থেকে ৮ শতাংশই পরবর্তীতে মারাত্মক নিউমোনিয়ায় ভুগছে। তবে আশার কথা হলো, লক্ষণ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই যদি শিশুকে সঠিক ও উন্নত চিকিৎসার আওতায় আনা যায়, তবে শতকরা ৯৯ ভাগ রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। চিকিৎসকদের মতে, হাম মূলত শিশুর শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে একবারে ভেঙে দেয়, যার ফলে অন্য যেকোনো সাধারণ রোগও শিশুর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। এই রোগপ্রবণতা বাড়ার পেছনে শিশুদের সঠিক খাদ্যাভ্যাসের অভাব এবং মায়ের বুকের দুধ না পাওয়াকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখছেন পুষ্টিবিদরা। বর্তমানে দেশে মাত্র ৫৬ শতাংশ শিশু নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ পায়, আর বাকি শিশুদের প্যাকেটজাত বা কৃত্রিম খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে তুলছে। এই ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবিলায় দেশব্যাপী প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিশেষ জ্বর ও হামের জন্য পৃথক বুথ চালু করা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া এবং গ্রামীণ অঞ্চলে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। এই সংকটের মাঝেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আরও এক শিশুর মৃত্যুর বেদনাদায়ক খবর পাওয়া গেছে। তারাকান্দা উপজেলার ৯ মাস বয়সী ওই শিশুটিকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তির পর সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নিউমোনিয়া এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়েই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। গত দুই মাসে এই একটি হাসপাতালেই এক হাজার ৩৪০ জন হামের রোগী ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে এক হাজার ২০৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও শেষ রক্ষা হয়নি ৩৩ জন শিশুর।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল