দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কাটিয়ে তুলতে এবং পুঁজিবাজারসহ সামগ্রিক আর্থিক খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর তীব্র জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ করে দেশের পেশাদার হিসাববিদদের নৈতিক সততা বজায় রেখে প্রতিটি বাণিজ্যিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল কর্তৃক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস এবং কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টসদের যৌথ সহযোগিতায় আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব দিকনির্দেশনা দেন। এবারের সম্মেলনের মূল লক্ষ্যই ছিল নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা।
বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বিগত বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, অতীতে দেশের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, তদারকি ব্যবস্থা ও ওয়াচডগ বডিগুলোকে প্রায় পুরোপুরি অকার্যকর করে ফেলা হয়েছিল। যার ফলে পুরো আর্থিক খাতে এক ধরণের নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম জেঁকে বসে। অনেক দুর্বল ও নামসর্বস্ব কোম্পানি ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন ও মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যেমন প্রতারিত হয়েছেন, তেমনি দেশের ভালো ও মৌলিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার এমন একটি টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর যেখানে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা থাকবে না। দেশের প্রধান প্রধান হিসাববিদ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতার ওপরই বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তিনি উল্লেখ করেন, কোনো রাষ্ট্রীয় রেগুলেটরি বডির পক্ষেই প্রতিদিন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভুলত্রুটি ধরা বা তদারকি করা সম্ভব নয়। তাই হিসাববিদদের নিজেদের এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে সবার আগে স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণের কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। অতীতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা টেনে তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের ওপর বিশ্বাস রেখে অতীতে যেভাবে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংগঠনকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল এবং তারা সফল হয়েছিল; ঠিক তেমনি দেশের হিসাববিদদের শীর্ষ সংগঠনগুলোকে কেবল বার্ষিক সাধারণ সভা বা নৈশভোজের আয়োজক হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাদের সদস্যরা সঠিকভাবে অডিট করছে কি না—তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে।
একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতি তৈরি হওয়া নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সারা বিশ্বের বড় বড় তহবিল ব্যবস্থাপক এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এখন বাংলাদেশের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তাদের পুঁজি বিনিয়োগ করতে উন্মুখ হয়ে আছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হংকং ও লন্ডনে বাংলাদেশভিত্তিক বিশেষ তহবিল চালু করার পরিকল্পনা করছে সরকার, পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারকেও শক্তিশালী করা হচ্ছে। তবে এই বিশাল বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রধান এবং একমাত্র শর্তই হলো নির্ভরযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানের আর্থিক প্রতিবেদন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি এ দেশের অডিট রিপোর্টের ওপর আস্থা না পায়, তবে কোনো সংস্কারই সুফল বয়ে আনবে না। তাই স্বল্পমেয়াদী সুবিধার চিন্তা বাদ দিয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একটি বৈশ্বিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে আর্থিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য পুঁজিবাজার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আর্থিক খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বিশিষ্ট সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের সম্মানিত চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কাটিয়ে তুলতে এবং পুঁজিবাজারসহ সামগ্রিক আর্থিক খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর তীব্র জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ করে দেশের পেশাদার হিসাববিদদের নৈতিক সততা বজায় রেখে প্রতিটি বাণিজ্যিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল কর্তৃক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস এবং কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টসদের যৌথ সহযোগিতায় আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব দিকনির্দেশনা দেন। এবারের সম্মেলনের মূল লক্ষ্যই ছিল নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা।
বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বিগত বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, অতীতে দেশের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, তদারকি ব্যবস্থা ও ওয়াচডগ বডিগুলোকে প্রায় পুরোপুরি অকার্যকর করে ফেলা হয়েছিল। যার ফলে পুরো আর্থিক খাতে এক ধরণের নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম জেঁকে বসে। অনেক দুর্বল ও নামসর্বস্ব কোম্পানি ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন ও মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যেমন প্রতারিত হয়েছেন, তেমনি দেশের ভালো ও মৌলিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার এমন একটি টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর যেখানে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা থাকবে না। দেশের প্রধান প্রধান হিসাববিদ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতার ওপরই বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তিনি উল্লেখ করেন, কোনো রাষ্ট্রীয় রেগুলেটরি বডির পক্ষেই প্রতিদিন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভুলত্রুটি ধরা বা তদারকি করা সম্ভব নয়। তাই হিসাববিদদের নিজেদের এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে সবার আগে স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণের কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। অতীতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা টেনে তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের ওপর বিশ্বাস রেখে অতীতে যেভাবে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংগঠনকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল এবং তারা সফল হয়েছিল; ঠিক তেমনি দেশের হিসাববিদদের শীর্ষ সংগঠনগুলোকে কেবল বার্ষিক সাধারণ সভা বা নৈশভোজের আয়োজক হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাদের সদস্যরা সঠিকভাবে অডিট করছে কি না—তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে।
একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতি তৈরি হওয়া নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সারা বিশ্বের বড় বড় তহবিল ব্যবস্থাপক এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এখন বাংলাদেশের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তাদের পুঁজি বিনিয়োগ করতে উন্মুখ হয়ে আছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হংকং ও লন্ডনে বাংলাদেশভিত্তিক বিশেষ তহবিল চালু করার পরিকল্পনা করছে সরকার, পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারকেও শক্তিশালী করা হচ্ছে। তবে এই বিশাল বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রধান এবং একমাত্র শর্তই হলো নির্ভরযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানের আর্থিক প্রতিবেদন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি এ দেশের অডিট রিপোর্টের ওপর আস্থা না পায়, তবে কোনো সংস্কারই সুফল বয়ে আনবে না। তাই স্বল্পমেয়াদী সুবিধার চিন্তা বাদ দিয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একটি বৈশ্বিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে আর্থিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য পুঁজিবাজার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আর্থিক খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বিশিষ্ট সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের সম্মানিত চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া।

আপনার মতামত লিখুন