দিকপাল

রাশিয়া-ইরান সামরিক সহযোগিতা ঘিরে ট্রাম্পের মন্তব্যে তীব্র বিতর্ক, উত্তপ্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গন


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বুধবার, ২০ মে ২০২৬ | ০৪:৩৯ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

রাশিয়া-ইরান সামরিক সহযোগিতা ঘিরে ট্রাম্পের মন্তব্যে তীব্র বিতর্ক, উত্তপ্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গন

রাশিয়া ও ইরানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতার গভীরতা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বেশ হালকাভাবেই বলেছিলেন যে, রাশিয়া হয়তো ইরানকে ‘কিছুটা সহায়তা’ করছে। তবে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষক এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, ট্রাম্পের এই মন্তব্য বাস্তব পরিস্থিতিকে আড়াল করার একটি চতুর প্রয়াস মাত্র। বাস্তবে মস্কো ও তেহরানের সামরিক ও কৌশলগত পার্টনারশিপ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ট্রাম্পের বলা ‘সামান্য সাহায্য’ শব্দের চেয়ে অনেক বেশি গভীর এবং বিপজ্জনক। দুই দেশের এই গোপন বোঝাপড়া কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সামগ্রিক বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সমীকরণকে ওলটপালট করে দিচ্ছে।

গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, উচ্চপ্রযুক্তির স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, ড্রোনের আধুনিকায়ন এবং ভারী অস্ত্র সরবরাহ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সমন্বয় গড়ে উঠেছে। ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের পরদিনই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান যে, মস্কোর সঙ্গে তেহরানের সামরিক সম্পর্ক এখন স্মরণকালের সবচেয়ে চমৎকার অবস্থায় রয়েছে। এর পরপরই পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো কিছু চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা নথি ফাঁস করে। সেখানে দেখা যায়, রাশিয়া আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক বিমানগুলোর রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক অবস্থানসংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল স্যাটেলাইট তথ্য ইরানের কাছে হস্তান্তর করছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই মহামূল্যবান তথ্যগুলোর মূল উৎস হলো রাশিয়ার নিজস্ব সামরিক গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ‘লিয়ানা’। এই বিশেষ প্রযুক্তিটি মূলত মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরীগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল, যা এখন মার্কিন বাহিনীকে কাউন্টার করার জন্য ইরানের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

এই যৌথ স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সুবিধা নিয়েই কিছুদিন আগে ইরান দাবি করেছিল যে, তারা ভারত মহাসাগরে মার্কিন ডেস্ট্রয়ার এবং বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে লক্ষ্য করে সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন কৌশলগত কারণে এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে, তবে সমুদ্রের বুকে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে এই দুঃসাহস দেখানোর পেছনে রাশিয়ার দেওয়া নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের অবদান রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইরানের নিজস্ব মহাকাশ কর্মসূচির পেছনেও ক্রেমলিনের বড় অবদান রয়েছে। রাশিয়ার মহাকাশ কেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা ইরানের ‘খাইয়াম’ স্যাটেলাইটটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ছবি তুলতে সক্ষম, যার ডেটা অ্যানালাইসিস করে রাশিয়া সরাসরি তেহরানের সামরিক কমান্ডের সাথে শেয়ার করছে। রাশিয়া বছরের পর বছর ধরে ইরানকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার এবং সাঁজোয়া যান সরবরাহ করে আসছে, যার মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, এই সামরিক অংশীদারিত্ব কিন্তু একতরফা নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে ইরানের তৈরি সস্তা কিন্তু বিধ্বংসী ‘শাহেদ’ কামিকাজে ড্রোন। রাশিয়া ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে এই ড্রোনগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। সময়ের সাথে সাথে রাশিয়া এই ইরানি ড্রোনে নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অত্যাধুনিক নেভিগেশন মডিউল যুক্ত করেছে, যা ড্রোনের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাশিয়ার উন্নত করা এই ড্রোন প্রযুক্তির কিছু অংশ এখন আবার হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি সংগঠনগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসছে। লেবাননে ব্যবহৃত কিছু ড্রোনে রাশিয়ার জ্যামিং-প্রতিরোধী প্রযুক্তির উপস্থিতি এর প্রমাণ।

তবে এই গভীর সম্পর্কের মধ্যেও কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা ও নিজস্ব স্বার্থের খেলা রয়েছে। বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই, যার কারণে রাশিয়া সরাসরি ইরানের পক্ষে যুদ্ধে নামবে না। তাছাড়া, রাশিয়া হয়তো পুরোপুরি ইরানের চূড়ান্ত বিজয়ও চায় না। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এবং হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বজায় থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ে। আর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি ইউক্রেন যুদ্ধের বিপুল ব্যয়ভার বহন করা রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য পরম আশীর্বাদ স্বরূপ। ফলে রাশিয়া ইরানকে এমন এক মাত্রায় সাহায্য করছে যাতে তারা পুরোপুরি ভেঙেও না পড়ে, আবার মার্কিন-ইসরাইল অক্ষের জন্য চিরস্থায়ী মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘সামান্য সাহায্য’ করার থিওরির আড়ালে আসলে এক দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল প্রক্সি ওয়ারের ছক কাজ করছে।


মূল সূত্র: ফক্স নিউজ

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


রাশিয়া-ইরান সামরিক সহযোগিতা ঘিরে ট্রাম্পের মন্তব্যে তীব্র বিতর্ক, উত্তপ্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গন

প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬

featured Image

রাশিয়া ও ইরানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতার গভীরতা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বেশ হালকাভাবেই বলেছিলেন যে, রাশিয়া হয়তো ইরানকে ‘কিছুটা সহায়তা’ করছে। তবে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষক এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, ট্রাম্পের এই মন্তব্য বাস্তব পরিস্থিতিকে আড়াল করার একটি চতুর প্রয়াস মাত্র। বাস্তবে মস্কো ও তেহরানের সামরিক ও কৌশলগত পার্টনারশিপ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ট্রাম্পের বলা ‘সামান্য সাহায্য’ শব্দের চেয়ে অনেক বেশি গভীর এবং বিপজ্জনক। দুই দেশের এই গোপন বোঝাপড়া কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সামগ্রিক বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সমীকরণকে ওলটপালট করে দিচ্ছে।

গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, উচ্চপ্রযুক্তির স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, ড্রোনের আধুনিকায়ন এবং ভারী অস্ত্র সরবরাহ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সমন্বয় গড়ে উঠেছে। ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের পরদিনই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান যে, মস্কোর সঙ্গে তেহরানের সামরিক সম্পর্ক এখন স্মরণকালের সবচেয়ে চমৎকার অবস্থায় রয়েছে। এর পরপরই পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো কিছু চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা নথি ফাঁস করে। সেখানে দেখা যায়, রাশিয়া আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক বিমানগুলোর রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক অবস্থানসংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল স্যাটেলাইট তথ্য ইরানের কাছে হস্তান্তর করছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই মহামূল্যবান তথ্যগুলোর মূল উৎস হলো রাশিয়ার নিজস্ব সামরিক গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ‘লিয়ানা’। এই বিশেষ প্রযুক্তিটি মূলত মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরীগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল, যা এখন মার্কিন বাহিনীকে কাউন্টার করার জন্য ইরানের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

এই যৌথ স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সুবিধা নিয়েই কিছুদিন আগে ইরান দাবি করেছিল যে, তারা ভারত মহাসাগরে মার্কিন ডেস্ট্রয়ার এবং বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে লক্ষ্য করে সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন কৌশলগত কারণে এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে, তবে সমুদ্রের বুকে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে এই দুঃসাহস দেখানোর পেছনে রাশিয়ার দেওয়া নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের অবদান রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইরানের নিজস্ব মহাকাশ কর্মসূচির পেছনেও ক্রেমলিনের বড় অবদান রয়েছে। রাশিয়ার মহাকাশ কেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা ইরানের ‘খাইয়াম’ স্যাটেলাইটটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ছবি তুলতে সক্ষম, যার ডেটা অ্যানালাইসিস করে রাশিয়া সরাসরি তেহরানের সামরিক কমান্ডের সাথে শেয়ার করছে। রাশিয়া বছরের পর বছর ধরে ইরানকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার এবং সাঁজোয়া যান সরবরাহ করে আসছে, যার মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, এই সামরিক অংশীদারিত্ব কিন্তু একতরফা নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে ইরানের তৈরি সস্তা কিন্তু বিধ্বংসী ‘শাহেদ’ কামিকাজে ড্রোন। রাশিয়া ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে এই ড্রোনগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। সময়ের সাথে সাথে রাশিয়া এই ইরানি ড্রোনে নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অত্যাধুনিক নেভিগেশন মডিউল যুক্ত করেছে, যা ড্রোনের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাশিয়ার উন্নত করা এই ড্রোন প্রযুক্তির কিছু অংশ এখন আবার হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি সংগঠনগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসছে। লেবাননে ব্যবহৃত কিছু ড্রোনে রাশিয়ার জ্যামিং-প্রতিরোধী প্রযুক্তির উপস্থিতি এর প্রমাণ।

তবে এই গভীর সম্পর্কের মধ্যেও কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা ও নিজস্ব স্বার্থের খেলা রয়েছে। বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই, যার কারণে রাশিয়া সরাসরি ইরানের পক্ষে যুদ্ধে নামবে না। তাছাড়া, রাশিয়া হয়তো পুরোপুরি ইরানের চূড়ান্ত বিজয়ও চায় না। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এবং হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বজায় থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ে। আর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি ইউক্রেন যুদ্ধের বিপুল ব্যয়ভার বহন করা রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য পরম আশীর্বাদ স্বরূপ। ফলে রাশিয়া ইরানকে এমন এক মাত্রায় সাহায্য করছে যাতে তারা পুরোপুরি ভেঙেও না পড়ে, আবার মার্কিন-ইসরাইল অক্ষের জন্য চিরস্থায়ী মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘সামান্য সাহায্য’ করার থিওরির আড়ালে আসলে এক দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল প্রক্সি ওয়ারের ছক কাজ করছে।


মূল সূত্র: ফক্স নিউজ


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল