দিকপাল

গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় ট্রাম্প প্রশাসনের গোপন আলোচনা


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬ | ১২:১৯ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় ট্রাম্প প্রশাসনের গোপন আলোচনা

ইরানের সাথে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির রেশ পুরোপুরি কাটতে না কাটতেই এবার সম্পূর্ণ নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসনের দিকে মনোযোগ দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। বরফে ঢাকা বিশাল দ্বীপ রাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য পর্দার আড়ালে এক নজিরবিহীন ও চরম গোপন তৎপরতা শুরু করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক রোমহর্ষক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত প্রায় চার মাস ধরে ওয়াশিংটনের বদ্ধ ঘরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিনল্যান্ড এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনাকারী দেশ ডেনমার্কের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের মধ্যে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয় আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিপূর্বে গ্রিনল্যান্ড সামরিকভাবে দখল করার যে খোলাখুলি হুমকি দিয়েছিলেন, তা থেকে তাকে বিরত রাখতে এবং পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভাঙন ঠেকাতেই মূলত ডেনমার্ক এই আলোচনার সূত্রপাত করেছিল। তবে ওয়াশিংটনের বৈঠকে আমেরিকার পক্ষ থেকে যেসব কঠোর ও একপেশে শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাতে গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তারা চরম উদ্বেগের সাথে আশঙ্কা করছেন, ইরানের সাথে সংঘাতের মাত্রা কিছুটা কমে এলেই ট্রাম্প হয়তো তার পুরো শক্তি ও মনোযোগ নিয়ে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন। পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক যে, গ্রিনল্যান্ডের কিছু শীর্ষ রাজনীতিক আগামী ১৪ জুন ট্রাম্পের জন্মদিনকে দেশের জন্য একটি সম্ভাব্য ‘বিপদ বা সতর্কতার দিন’ হিসেবে নিজেদের ক্যালেন্ডারে লাল কালিতে দাগিয়ে রেখেছেন।

তিন দেশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার দেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া এই প্রতিবেদনে আমেরিকার কিছু সুদূরপ্রসারী ও ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। প্রথমত, মার্কিন প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডের সাথে ১৯৫১ সালের একটি পুরনো প্রতিরক্ষা চুক্তি সংশোধন করতে চাইছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সেখানে একটি চিরস্থায়ী ধারা যুক্ত করা, যার ফলে গ্রিনল্যান্ড ভবিষ্যতে কখনো ডেনমার্কের কাছ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করলেও মার্কিন সেনারা সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করার আইনি অধিকার পাবে। গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ নাগরিক ও স্বাধীনতাকামী নেতারা এই দাসত্বমূলক ধারাটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত, কেবল সামরিক খাতেই নয়, মার্কিন প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডের যেকোনো বড় অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ চুক্তিতে একচেটিয়া ভেটো বা বাতিলের ক্ষমতা দাবি করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিশ্ব বাজারে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া ও চীনকে এই অঞ্চলে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে রাখা। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড উভয় পক্ষই আমেরিকার এই অন্যায্য দাবিতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ায় সেখানে খনিজ সম্পদ আহরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বরফের নিচে যুগ যুগ ধরে চাপা পড়ে থাকা গ্রিনল্যান্ডের বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল, ইউরেনিয়াম এবং অত্যন্ত দুর্লভ সব খনিজ সম্পদ যৌথভাবে উত্তোলনের জন্য গ্রিনল্যান্ডকে বাধ্য করতে চাইছে ওয়াশিংটন। ইতিমধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন এই দ্বীপে তাদের সামরিক ঘাঁটি সম্প্রসারণের কাজ শুরু করে দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমলের পুরনো বিমানবন্দর, সমুদ্র বন্দর এবং মার্কিন সেনাদের আবাসন ব্যবস্থা নতুন করে গড়ে তোলার জন্য মার্কিন মেরিন কোরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গোপনে ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় নেতাদের মতে, আমেরিকার এই আগ্রাসী দাবিগুলো তাদের সার্বভৌমত্বের বুলেটের মতো আঘাত করছে। মার্কিন ও ডেনিশ কর্মকর্তারা জনসমক্ষে মুখে বলছেন যে গ্রিনল্যান্ডের মাত্র ৫৭ হাজার মানুষের ভবিষ্যৎ তাদের নিজেদের হাতেই থাকবে, কিন্তু পর্দার পেছনের চুক্তিগুলো মূলত আগামী কয়েক প্রজন্মের জন্য তাদের হাত-পা বেঁধে ফেলার চক্রান্ত। গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্ট সদস্য জাস্টাস হ্যানসেন অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন, মার্কিনীরা যা চাইছে তার সব পেয়ে গেলে গ্রিনল্যান্ড কোনোদিনও প্রকৃত স্বাধীনতা বা মুক্তির স্বাদ পাবে না। এদিকে ওয়াশিংটনে এই আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শীর্ষ উপদেষ্টা মাইকেল নিডহ্যাম। পেন্টাগনের নর্দার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল গ্রেগরি এম গুইলোট স্পষ্ট করেছেন যে, বরফ গলে মেরু অঞ্চলে নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হওয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বহুগুণ বেড়েছে। তাই আলাস্কা ও কানাডার পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডকেও মার্কিন রাডার স্টেশন ও সামরিক ঘাঁটির একটি শক্তিশালী শৃঙ্খলে যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এই জন্য আমেরিকার সেখানে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর এবং বিশেষ কমান্ডো বাহিনীর প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ ঘাঁটি প্রয়োজন। গ্রিনল্যান্ডের নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা কোনোভাবেই আমেরিকার অংশ হতে চান না, তবে আরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েনে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু অর্থনীতি ও খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার জন্য তাদের ওপর ওয়াশিংটন থেকে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান পিপালুক লিঙ্গে অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন, এটি মোটেও ন্যায্য কোনো আলোচনা নয়। মনে হচ্ছে আমাদের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেওয়া হবে, নয়তো কিছুই দেওয়া হবে না। গ্রিনল্যান্ডের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য ভিভিয়ান মোটজফেল্ড আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি একটু শান্ত হলেই গ্রিনল্যান্ডের জন্য বড় বিপদ নেমে আসবে। ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মেতে উঠবেন এবং রাশিয়াও তাদের কৌশলগত এলাকা আর্কটিকের দিকে মনোযোগ দেবে, যার বলী হবে গ্রিনল্যান্ড।

প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে মার্কিনীদের এই অতি আগ্রহের কারণে গ্রিনল্যান্ডের কঠোর পরিবেশগত আইন শিথিল করার জন্য চাপ আসতে পারে বলে অনেকে ভয় পাচ্ছেন। তবে গ্রিনল্যান্ডের তরুণ প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন তার কার্যালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, তারা ব্যবসা করতে রাজি আছেন, কিন্তু তাদের পরিবেশগত নিয়ম অত্যন্ত কঠোর এবং এটি তেমনই থাকবে। গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা এবং ডেনমার্কের সাথে তাদের সম্পর্ক সম্পূর্ণ নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়, এখানে আমেরিকান বা অন্য কারো নাক গলানো উচিত নয়। পর্দার আড়ালের তথ্যমতে, রাশিয়া বা চীন যেন গ্রিনল্যান্ডের কোনো খনিজ সম্পদ বা অবকাঠামো নির্মাণের চুক্তি না পায়, তা নিশ্চিত করতে আমেরিকা একটি কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা চাইছে। এর আগে ২০১৮ সালে একটি চীনা রাষ্ট্রীয় কোম্পানি গ্রিনল্যান্ডে নতুন বিমানবন্দর তৈরির দৌড়ে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড চাপে ডেনমার্ক সরকার তাতে হস্তক্ষেপ করে এবং পরে একটি ডেনিশ কোম্পানিকে সেই কাজ দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ডেনমার্কের কাছ থেকে ক্রমান্বয়ে স্বায়ত্তশাসন পাওয়া গ্রিনল্যান্ড পূর্ণ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখলেও, বেইজিং বা মস্কোর মতো পরাশক্তিদের বিনিয়োগের পেছনে কোনো গোপন উদ্দেশ্য আছে কি না, তা যাচাই করার মতো নিজস্ব কোনো আধুনিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বা প্রযুক্তি তাদের নেই। এই সুযোগে কোপেনহেগেন ডেনমার্কের মাধ্যমেই এই নজরদারি চালাতে চায় এবং সেখানে আমেরিকার সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকবে— এমন একটি দাসত্বমূলক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। এর ফলে গ্রিনল্যান্ডের স্বাধিকার বা সার্বভৌমত্ব বাড়ার বদলে ডেনমার্ক ও আমেরিকার যৌথ নিয়ন্ত্রণ আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। প্রধানমন্ত্রী নিলসেন এ বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও জোর দিয়ে বলেছেন, শেষ পর্যন্ত কার সাথে ব্যবসা করা হবে আর কার সাথে করা হবে না, সেই চূড়ান্ত কথা বলার অধিকার একমাত্র গ্রিনল্যান্ডের জনগণেরই থাকা উচিত।


তথ্যের মূল উৎস:   দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস 

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ২০ মে ২০২৬


গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় ট্রাম্প প্রশাসনের গোপন আলোচনা

প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬

featured Image

ইরানের সাথে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির রেশ পুরোপুরি কাটতে না কাটতেই এবার সম্পূর্ণ নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসনের দিকে মনোযোগ দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। বরফে ঢাকা বিশাল দ্বীপ রাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য পর্দার আড়ালে এক নজিরবিহীন ও চরম গোপন তৎপরতা শুরু করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক রোমহর্ষক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত প্রায় চার মাস ধরে ওয়াশিংটনের বদ্ধ ঘরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিনল্যান্ড এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনাকারী দেশ ডেনমার্কের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের মধ্যে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয় আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিপূর্বে গ্রিনল্যান্ড সামরিকভাবে দখল করার যে খোলাখুলি হুমকি দিয়েছিলেন, তা থেকে তাকে বিরত রাখতে এবং পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভাঙন ঠেকাতেই মূলত ডেনমার্ক এই আলোচনার সূত্রপাত করেছিল। তবে ওয়াশিংটনের বৈঠকে আমেরিকার পক্ষ থেকে যেসব কঠোর ও একপেশে শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাতে গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তারা চরম উদ্বেগের সাথে আশঙ্কা করছেন, ইরানের সাথে সংঘাতের মাত্রা কিছুটা কমে এলেই ট্রাম্প হয়তো তার পুরো শক্তি ও মনোযোগ নিয়ে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন। পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক যে, গ্রিনল্যান্ডের কিছু শীর্ষ রাজনীতিক আগামী ১৪ জুন ট্রাম্পের জন্মদিনকে দেশের জন্য একটি সম্ভাব্য ‘বিপদ বা সতর্কতার দিন’ হিসেবে নিজেদের ক্যালেন্ডারে লাল কালিতে দাগিয়ে রেখেছেন।

তিন দেশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার দেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া এই প্রতিবেদনে আমেরিকার কিছু সুদূরপ্রসারী ও ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। প্রথমত, মার্কিন প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডের সাথে ১৯৫১ সালের একটি পুরনো প্রতিরক্ষা চুক্তি সংশোধন করতে চাইছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সেখানে একটি চিরস্থায়ী ধারা যুক্ত করা, যার ফলে গ্রিনল্যান্ড ভবিষ্যতে কখনো ডেনমার্কের কাছ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করলেও মার্কিন সেনারা সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করার আইনি অধিকার পাবে। গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ নাগরিক ও স্বাধীনতাকামী নেতারা এই দাসত্বমূলক ধারাটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত, কেবল সামরিক খাতেই নয়, মার্কিন প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডের যেকোনো বড় অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ চুক্তিতে একচেটিয়া ভেটো বা বাতিলের ক্ষমতা দাবি করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিশ্ব বাজারে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া ও চীনকে এই অঞ্চলে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে রাখা। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড উভয় পক্ষই আমেরিকার এই অন্যায্য দাবিতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ায় সেখানে খনিজ সম্পদ আহরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বরফের নিচে যুগ যুগ ধরে চাপা পড়ে থাকা গ্রিনল্যান্ডের বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল, ইউরেনিয়াম এবং অত্যন্ত দুর্লভ সব খনিজ সম্পদ যৌথভাবে উত্তোলনের জন্য গ্রিনল্যান্ডকে বাধ্য করতে চাইছে ওয়াশিংটন। ইতিমধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন এই দ্বীপে তাদের সামরিক ঘাঁটি সম্প্রসারণের কাজ শুরু করে দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমলের পুরনো বিমানবন্দর, সমুদ্র বন্দর এবং মার্কিন সেনাদের আবাসন ব্যবস্থা নতুন করে গড়ে তোলার জন্য মার্কিন মেরিন কোরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গোপনে ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় নেতাদের মতে, আমেরিকার এই আগ্রাসী দাবিগুলো তাদের সার্বভৌমত্বের বুলেটের মতো আঘাত করছে। মার্কিন ও ডেনিশ কর্মকর্তারা জনসমক্ষে মুখে বলছেন যে গ্রিনল্যান্ডের মাত্র ৫৭ হাজার মানুষের ভবিষ্যৎ তাদের নিজেদের হাতেই থাকবে, কিন্তু পর্দার পেছনের চুক্তিগুলো মূলত আগামী কয়েক প্রজন্মের জন্য তাদের হাত-পা বেঁধে ফেলার চক্রান্ত। গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্ট সদস্য জাস্টাস হ্যানসেন অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন, মার্কিনীরা যা চাইছে তার সব পেয়ে গেলে গ্রিনল্যান্ড কোনোদিনও প্রকৃত স্বাধীনতা বা মুক্তির স্বাদ পাবে না। এদিকে ওয়াশিংটনে এই আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শীর্ষ উপদেষ্টা মাইকেল নিডহ্যাম। পেন্টাগনের নর্দার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল গ্রেগরি এম গুইলোট স্পষ্ট করেছেন যে, বরফ গলে মেরু অঞ্চলে নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হওয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বহুগুণ বেড়েছে। তাই আলাস্কা ও কানাডার পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডকেও মার্কিন রাডার স্টেশন ও সামরিক ঘাঁটির একটি শক্তিশালী শৃঙ্খলে যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এই জন্য আমেরিকার সেখানে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর এবং বিশেষ কমান্ডো বাহিনীর প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ ঘাঁটি প্রয়োজন। গ্রিনল্যান্ডের নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা কোনোভাবেই আমেরিকার অংশ হতে চান না, তবে আরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েনে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু অর্থনীতি ও খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার জন্য তাদের ওপর ওয়াশিংটন থেকে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান পিপালুক লিঙ্গে অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন, এটি মোটেও ন্যায্য কোনো আলোচনা নয়। মনে হচ্ছে আমাদের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেওয়া হবে, নয়তো কিছুই দেওয়া হবে না। গ্রিনল্যান্ডের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য ভিভিয়ান মোটজফেল্ড আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি একটু শান্ত হলেই গ্রিনল্যান্ডের জন্য বড় বিপদ নেমে আসবে। ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মেতে উঠবেন এবং রাশিয়াও তাদের কৌশলগত এলাকা আর্কটিকের দিকে মনোযোগ দেবে, যার বলী হবে গ্রিনল্যান্ড।

প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে মার্কিনীদের এই অতি আগ্রহের কারণে গ্রিনল্যান্ডের কঠোর পরিবেশগত আইন শিথিল করার জন্য চাপ আসতে পারে বলে অনেকে ভয় পাচ্ছেন। তবে গ্রিনল্যান্ডের তরুণ প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন তার কার্যালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, তারা ব্যবসা করতে রাজি আছেন, কিন্তু তাদের পরিবেশগত নিয়ম অত্যন্ত কঠোর এবং এটি তেমনই থাকবে। গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা এবং ডেনমার্কের সাথে তাদের সম্পর্ক সম্পূর্ণ নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়, এখানে আমেরিকান বা অন্য কারো নাক গলানো উচিত নয়। পর্দার আড়ালের তথ্যমতে, রাশিয়া বা চীন যেন গ্রিনল্যান্ডের কোনো খনিজ সম্পদ বা অবকাঠামো নির্মাণের চুক্তি না পায়, তা নিশ্চিত করতে আমেরিকা একটি কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা চাইছে। এর আগে ২০১৮ সালে একটি চীনা রাষ্ট্রীয় কোম্পানি গ্রিনল্যান্ডে নতুন বিমানবন্দর তৈরির দৌড়ে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড চাপে ডেনমার্ক সরকার তাতে হস্তক্ষেপ করে এবং পরে একটি ডেনিশ কোম্পানিকে সেই কাজ দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ডেনমার্কের কাছ থেকে ক্রমান্বয়ে স্বায়ত্তশাসন পাওয়া গ্রিনল্যান্ড পূর্ণ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখলেও, বেইজিং বা মস্কোর মতো পরাশক্তিদের বিনিয়োগের পেছনে কোনো গোপন উদ্দেশ্য আছে কি না, তা যাচাই করার মতো নিজস্ব কোনো আধুনিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বা প্রযুক্তি তাদের নেই। এই সুযোগে কোপেনহেগেন ডেনমার্কের মাধ্যমেই এই নজরদারি চালাতে চায় এবং সেখানে আমেরিকার সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকবে— এমন একটি দাসত্বমূলক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। এর ফলে গ্রিনল্যান্ডের স্বাধিকার বা সার্বভৌমত্ব বাড়ার বদলে ডেনমার্ক ও আমেরিকার যৌথ নিয়ন্ত্রণ আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। প্রধানমন্ত্রী নিলসেন এ বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও জোর দিয়ে বলেছেন, শেষ পর্যন্ত কার সাথে ব্যবসা করা হবে আর কার সাথে করা হবে না, সেই চূড়ান্ত কথা বলার অধিকার একমাত্র গ্রিনল্যান্ডের জনগণেরই থাকা উচিত।


তথ্যের মূল উৎস:   দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস 


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল