দিকপাল

রুশ জাহাজডুবি ঘিরে পারমাণবিক গোপন মিশনের গুঞ্জন!


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : বুধবার, ১৩ মে ২০২৬ | ১০:১২ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

রুশ জাহাজডুবি ঘিরে পারমাণবিক গোপন মিশনের গুঞ্জন!

ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির নিচে তলিয়ে যাওয়া একটি রুশ মালবাহী জাহাজকে কেন্দ্র করে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্যকর রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। উরসা মেজর নামক এই জাহাজটির সলিলসমাধি কেবল একটি সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা সম্ভাব্য পারমাণবিক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সিএনএনের একটি গভীর অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই জাহাজটি সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ কর্মসূচির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের যন্ত্রাংশ বহন করছিল। ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর স্পেন উপকূল থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি শুরু থেকেই চরম গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা ছিল। বিশেষ করে রাশিয়া ও স্পেনের মতো শক্তিশালী দেশগুলোর রহস্যজনক নীরবতা এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে যে, সমুদ্রের তলদেশে এমন কিছু লুকানো আছে যা প্রকাশিত হলে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাহাজটির যাত্রাপথ ও কার্গো নিয়ে শুরু থেকেই নানা অসংগতি ছিল। রাশিয়ার উস্ত লুগা বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করা এই জাহাজটির আনুষ্ঠানিক গন্তব্য ছিল ভ্লাদিভস্তক। তবে সমর বিশেষজ্ঞদের মনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এর রুট নিয়ে। সাধারণত এই ধরনের কার্গো পরিবহনের জন্য রেলপথ অনেক বেশি নিরাপদ ও দ্রুততর হওয়া সত্ত্বেও কেন দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নেওয়া হলো, তার কোনো সদুত্তর মেলেনি। স্প্যানিশ তদন্তকারীদের মতে, জাহাজটির প্রকৃত গন্তব্য ছিল উত্তর কোরিয়ার রাসন বন্দর। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ সামরিক আঁতাত এই সন্দেহকে আরও জোরালো ভিত্তি দিয়েছে। অনেকের ধারণা, মস্কো হয়তো পিয়ংইয়ংকে তাদের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করার চেষ্টা করছে, যার অংশ ছিল এই বিতর্কিত জাহাজটি।

দুর্ঘটনার দিন জাহাজটি যখন স্প্যানিশ জলসীমায় প্রবেশ করে, তখন থেকেই অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করা যায়। হঠাৎ করে এর গতি কমিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠানো হয়। উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই ইঞ্জিন কক্ষের কাছাকাছি এলাকায় পরপর তিনটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। এতে প্রাণ হারান দুই নাবিক এবং জাহাজটি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। উদ্ধার হওয়া ১৪ জন নাবিকের জীবন রক্ষা পেলেও জাহাজের অভ্যন্তরে আসলে কী ঘটছিল, তা নিয়ে রয়ে গেছে ধোঁয়াশা। উদ্ধারকাজ চলাকালীন রুশ সামরিক জাহাজ ইভান গ্রেনের আকস্মিক উপস্থিতি এবং অন্য জাহাজগুলোকে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ আন্তর্জাতিক মহলে সন্দেহের দানা আরও মজবুত করেছে। এমনকি জাহাজটি ডোবার দেড় ঘণ্টা আগে যখন সমুদ্রে লাল ফ্লেয়ার ছোড়া হয়, ঠিক তখনই ভূকম্পন মাপক যন্ত্রে পানির নিচে বিশাল কম্পন ধরা পড়ে, যা ইঙ্গিত দেয় যে জাহাজটিকে হয়তো পরিকল্পিতভাবে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই রহস্যময় ঘটনার রেশ এখানেই শেষ হয়নি। আকাশপথেও দেখা গেছে অদ্ভুত তৎপরতা। তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ওই নির্দিষ্ট এলাকার ওপর দিয়ে অন্তত দুবার আমেরিকার পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা শনাক্তকারী বিশেষ বিমান উড়ে গেছে। জাহাজটি তলিয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর সেখানে রাশিয়ার রহস্যময় গবেষণা জাহাজ ইয়ানতারের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে ইয়ানতারকে সমুদ্রের তলদেশে গোপন গুপ্তচরবৃত্তির কাজে নিয়োজিত জাহাজ হিসেবে সন্দেহ করে আসছে। এই জাহাজটি ওই এলাকায় অবস্থানকালে পুনরায় চারটি রহস্যময় বিস্ফোরণের শব্দ শনাক্ত করা হয়। স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের কাছে জাহাজের রুশ ক্যাপ্টেন স্বীকার করেছেন যে, সেখানে সাবমেরিনে ব্যবহৃত রিঅ্যাক্টরের মতো যন্ত্রাংশ ছিল, যদিও তাতে তেজস্ক্রিয় জ্বালানি ছিল কি না সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

বর্তমানে উরসা মেজরের ধ্বংসাবশেষ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই হাজার মিটার গভীরে পড়ে রয়েছে। রুশ মালিকপক্ষ এই ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা বলে দাবি করলেও স্প্যানিশ তদন্তকারীরা ভিন্ন পথে হাঁটছেন। তারা খতিয়ে দেখছেন এটি কোনো সুপারক্যাভিটেটিং টর্পেডো বা বিশেষ ধরনের মাইনের আঘাত কি না। এই গভীর সমুদ্রের অন্ধকারেই সম্ভবত চাপা পড়ে আছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উত্তর কোরিয়ার কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তি পাচারের এক ভয়াবহ সত্য। যতক্ষণ পর্যন্ত জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব না হচ্ছে, ততক্ষণ এই ভূমধ্যসাগরীয় রহস্য কেবল রাশিয়ার অস্বস্তিই বাড়াবে না, বরং বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।

মূল উৎস: সিএনএন।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ১৩ মে ২০২৬


রুশ জাহাজডুবি ঘিরে পারমাণবিক গোপন মিশনের গুঞ্জন!

প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬

featured Image

ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির নিচে তলিয়ে যাওয়া একটি রুশ মালবাহী জাহাজকে কেন্দ্র করে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্যকর রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। উরসা মেজর নামক এই জাহাজটির সলিলসমাধি কেবল একটি সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা সম্ভাব্য পারমাণবিক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সিএনএনের একটি গভীর অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই জাহাজটি সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ কর্মসূচির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের যন্ত্রাংশ বহন করছিল। ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর স্পেন উপকূল থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি শুরু থেকেই চরম গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা ছিল। বিশেষ করে রাশিয়া ও স্পেনের মতো শক্তিশালী দেশগুলোর রহস্যজনক নীরবতা এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে যে, সমুদ্রের তলদেশে এমন কিছু লুকানো আছে যা প্রকাশিত হলে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাহাজটির যাত্রাপথ ও কার্গো নিয়ে শুরু থেকেই নানা অসংগতি ছিল। রাশিয়ার উস্ত লুগা বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করা এই জাহাজটির আনুষ্ঠানিক গন্তব্য ছিল ভ্লাদিভস্তক। তবে সমর বিশেষজ্ঞদের মনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এর রুট নিয়ে। সাধারণত এই ধরনের কার্গো পরিবহনের জন্য রেলপথ অনেক বেশি নিরাপদ ও দ্রুততর হওয়া সত্ত্বেও কেন দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নেওয়া হলো, তার কোনো সদুত্তর মেলেনি। স্প্যানিশ তদন্তকারীদের মতে, জাহাজটির প্রকৃত গন্তব্য ছিল উত্তর কোরিয়ার রাসন বন্দর। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ সামরিক আঁতাত এই সন্দেহকে আরও জোরালো ভিত্তি দিয়েছে। অনেকের ধারণা, মস্কো হয়তো পিয়ংইয়ংকে তাদের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করার চেষ্টা করছে, যার অংশ ছিল এই বিতর্কিত জাহাজটি।

দুর্ঘটনার দিন জাহাজটি যখন স্প্যানিশ জলসীমায় প্রবেশ করে, তখন থেকেই অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করা যায়। হঠাৎ করে এর গতি কমিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠানো হয়। উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই ইঞ্জিন কক্ষের কাছাকাছি এলাকায় পরপর তিনটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। এতে প্রাণ হারান দুই নাবিক এবং জাহাজটি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। উদ্ধার হওয়া ১৪ জন নাবিকের জীবন রক্ষা পেলেও জাহাজের অভ্যন্তরে আসলে কী ঘটছিল, তা নিয়ে রয়ে গেছে ধোঁয়াশা। উদ্ধারকাজ চলাকালীন রুশ সামরিক জাহাজ ইভান গ্রেনের আকস্মিক উপস্থিতি এবং অন্য জাহাজগুলোকে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ আন্তর্জাতিক মহলে সন্দেহের দানা আরও মজবুত করেছে। এমনকি জাহাজটি ডোবার দেড় ঘণ্টা আগে যখন সমুদ্রে লাল ফ্লেয়ার ছোড়া হয়, ঠিক তখনই ভূকম্পন মাপক যন্ত্রে পানির নিচে বিশাল কম্পন ধরা পড়ে, যা ইঙ্গিত দেয় যে জাহাজটিকে হয়তো পরিকল্পিতভাবে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই রহস্যময় ঘটনার রেশ এখানেই শেষ হয়নি। আকাশপথেও দেখা গেছে অদ্ভুত তৎপরতা। তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ওই নির্দিষ্ট এলাকার ওপর দিয়ে অন্তত দুবার আমেরিকার পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা শনাক্তকারী বিশেষ বিমান উড়ে গেছে। জাহাজটি তলিয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর সেখানে রাশিয়ার রহস্যময় গবেষণা জাহাজ ইয়ানতারের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে ইয়ানতারকে সমুদ্রের তলদেশে গোপন গুপ্তচরবৃত্তির কাজে নিয়োজিত জাহাজ হিসেবে সন্দেহ করে আসছে। এই জাহাজটি ওই এলাকায় অবস্থানকালে পুনরায় চারটি রহস্যময় বিস্ফোরণের শব্দ শনাক্ত করা হয়। স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের কাছে জাহাজের রুশ ক্যাপ্টেন স্বীকার করেছেন যে, সেখানে সাবমেরিনে ব্যবহৃত রিঅ্যাক্টরের মতো যন্ত্রাংশ ছিল, যদিও তাতে তেজস্ক্রিয় জ্বালানি ছিল কি না সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

বর্তমানে উরসা মেজরের ধ্বংসাবশেষ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই হাজার মিটার গভীরে পড়ে রয়েছে। রুশ মালিকপক্ষ এই ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা বলে দাবি করলেও স্প্যানিশ তদন্তকারীরা ভিন্ন পথে হাঁটছেন। তারা খতিয়ে দেখছেন এটি কোনো সুপারক্যাভিটেটিং টর্পেডো বা বিশেষ ধরনের মাইনের আঘাত কি না। এই গভীর সমুদ্রের অন্ধকারেই সম্ভবত চাপা পড়ে আছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উত্তর কোরিয়ার কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তি পাচারের এক ভয়াবহ সত্য। যতক্ষণ পর্যন্ত জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব না হচ্ছে, ততক্ষণ এই ভূমধ্যসাগরীয় রহস্য কেবল রাশিয়ার অস্বস্তিই বাড়াবে না, বরং বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।

মূল উৎস: সিএনএন।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল