দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটির কর্তৃত্ব নিয়ে জলঘোলা হচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। তবে এবার সেই আলোচনার পরিধি ছাড়িয়ে বন্দরের আরও দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সচল স্থাপনা জেনারেল কার্গো বার্থ বা জিসিবি এবং চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল বা সিসিটি-র নিয়ন্ত্রণ নিতে দেশি-বিদেশি বড় বড় করপোরেট ও বৈশ্বিক অপারেটরদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এই লাভজনক ও সচল টার্মিনালগুলোর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব পেতে মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি থেকে শুরু করে দেশের নামী শিল্পগোষ্ঠী এবং বর্তমান পরিচালনাকারীদের জোট এখন প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। বন্দর সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বে টার্মিনালের মতো নতুন ও বিশাল কোনো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করে আয়ের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করার চেয়ে বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানিগুলো এখন বিদ্যমান ও সচল টার্মিনালগুলোকে বেশি পছন্দ করছে, কারণ এখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত ও বিপুল রাজস্ব আয় সম্ভব।
চট্টগ্রাম বন্দরের পুরো পরিচালন ব্যবস্থা মূলত চারটি প্রধান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো হলো জিসিবি, সিসিটি, এনসিটি এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বা পিসিটি। বর্তমান চিত্র অনুযায়ী, সদ্য নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালটি বাদে বাকি সবকটি টার্মিনালই দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। পিসিটি পরিচালনার দায়িত্বটি ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশ্ববিখ্যাত বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড গত এপ্রিল মাসে দুবাইতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও দুবাইয়ের মধ্যকার যৌথ অর্থনৈতিক ফোরামের এক শীর্ষ বৈঠকে সিসিটি টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য জোরালো আগ্রহ দেখায়। এর আগে থেকেই বন্দরের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ততম অংশ এনসিটি ইজারা নেওয়ার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সরকারের উচ্চপর্যায়ে কয়েক বছর ধরে দরকষাকষি চলছিল। নথিপত্র অনুযায়ী, দুবাই ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত সিসিটি ও এনসিটি এই দুটি প্রধান টার্মিনালকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একটি সমন্বিত ও একক শক্তিশালী বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চাচ্ছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের এই তোড়জোড়ের মাঝেই আসরে নেমেছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালও। তারা সিসিটি এবং জিসিবি এই দুটি টার্মিনালকেই আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি নিজেদের ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে কেবল বিদেশি প্রতিষ্ঠানই নয়, এই দৌড়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপও শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এর আগে সিসিটি টার্মিনাল একাই পরিচালনার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও, সম্প্রতি তারা সিসিটি এবং এনসিটি উভয় টার্মিনাল একসাথে পরিচালনার জন্য একটি বড় ধরনের বাণিজ্যিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। অন্যদিকে, জিসিবি টার্মিনালটি বর্তমানে যে বারোটি দেশীয় বার্থ অপারেটর কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, তারাও বসে নেই। এই দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে একটি শক্তিশালী জোট বা কনসোর্টিয়াম গঠন করে যৌথভাবে জিসিবি টার্মিনালটিকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার এবং পরিচালনার প্রস্তাব পেশ করেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, সচল টার্মিনালগুলোর আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগের জন্য ইদানীং দেশি-বিদেশি অনেক নামী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একের পর এক বড় বড় প্রস্তাব আসছে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বোঝা যায় কেন এই টার্মিনালগুলোর প্রতি সবার এতো লোভাতুর দৃষ্টি। বন্দরের চারটি প্রধান টার্মিনালের মধ্যে তিনটিই শুধুমাত্র কনটেইনারবাহী জাহাজের মালামাল ওঠানো-নামানোর জন্য সুনির্দিষ্ট। কেবল জিসিবি টার্মিনালটিতে কনটেইনারের পাশাপাশি খোলা পণ্য বা বাল্ক কার্গো এবং সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজও ভেড়ানো যায়। বিগত ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং বা খালাস-বোঝাই করা হয়েছে। এর সিংহভাগই এসেছে এনসিটি থেকে, যার পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ২১ হাজার একক। এছাড়া জিসিবি একাই ১০ লাখ ৮৩ হাজার একক, সিসিটি ৪ লাখ ৮৩ হাজার একক এবং নতুন চালু হওয়া পিসিটি ১ লাখ ৫৩ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, আগে বিদেশি কোম্পানিগুলো সমুদ্রতীরে নতুন গ্রিনফিল্ড বা শূন্য থেকে শুরু করা প্রকল্পে আগ্রহী ছিল। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তারা নতুন করে মাটি ভরাট বা জেটি বানানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় না গিয়ে তাৎক্ষণিক আয়ের পথ খুঁজছে, যার জন্য তৈরি ও সচল জেটিগুলোর কোনো বিকল্প নেই।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সরকারের পালাবদলের মধ্যেও এই দরকষাকষি থেমে থাকেনি। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই এনসিটি টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও এই প্রক্রিয়া সচল রাখা হয়। তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগে আগে স্থানীয় বন্দর শ্রমিক ও কর্মচারীদের তীব্র আন্দোলন এবং ধর্মঘটের মুখে পুরো প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সেই পুরনো প্রস্তাবটি নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা ও মূল্যায়ন করছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও দুবাইয়ের যৌথ উন্নয়ন এজেন্ডায় সিসিটি টার্মিনালটিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আগামী দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে একটি স্বতন্ত্র ও বড় প্রকল্প হিসেবে গুরুত্ব পেতে পারে।
এদিকে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল জিসিবি ও সিসিটি টার্মিনাল দুটিকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর করার জন্য প্রায় ৬০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের একটি বিশদ মহাপরিকল্পনা সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তাদের এই বড় বিনিয়োগের প্রস্তাবটি প্রাথমিক স্তরে থাকলেও সরকার সবুজ সংকেত দিলে তারা দ্রুত কাজ শুরু করতে প্রস্তুত। এর বিপরীতে দেশীয় জায়ান্ট এমজিএইচ গ্রুপ গত বছর প্রথম দফায় সিসিটি টার্মিনালের জন্য ৩০ কোটি ডলারের প্রস্তাব দিলেও, সম্প্রতি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনার জন্য একটি বড় চমক দেখিয়েছে। তারা প্রতি কনটেইনার থেকে আয়ের একটি বড় অংশ সরাসরি বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বিদেশি ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত রাজস্বের চেয়েও বেশি। এমজিএইচ গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের দেওয়া ১৫ বছরের এই ব্যবসায়িক মডেলে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ১ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করতে পারবে। দেশীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তাদের প্রশাসনিক ও অর্থায়ন ব্যয় কম, যার ফলে তারা সরকারকে বেশি লভ্যাংশ দিয়েও নিজেরা ভালো মুনাফা ঘরে তুলতে পারবে।
অন্যদিকে, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জিসিবি টার্মিনাল পরিচালনাকারী ১২টি বার্থ অপারেটরের সংগঠনও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের আওতায় এই কার্গো টার্মিনালটির ভৌত অবকাঠামো পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। তাদের জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশি ও বিদেশি অংশীদারদের সমন্বয়ে তারা প্রায় ৬২ কোটি ৭০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তারা জিসিবির জেটি, কনটেইনার ইয়ার্ড, শেড এবং বড় বড় গুদামগুলোকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট ছক তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের এই সচল সম্পদগুলোর নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাবে, তা নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটির কর্তৃত্ব নিয়ে জলঘোলা হচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। তবে এবার সেই আলোচনার পরিধি ছাড়িয়ে বন্দরের আরও দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সচল স্থাপনা জেনারেল কার্গো বার্থ বা জিসিবি এবং চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল বা সিসিটি-র নিয়ন্ত্রণ নিতে দেশি-বিদেশি বড় বড় করপোরেট ও বৈশ্বিক অপারেটরদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এই লাভজনক ও সচল টার্মিনালগুলোর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব পেতে মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি থেকে শুরু করে দেশের নামী শিল্পগোষ্ঠী এবং বর্তমান পরিচালনাকারীদের জোট এখন প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। বন্দর সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বে টার্মিনালের মতো নতুন ও বিশাল কোনো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করে আয়ের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করার চেয়ে বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানিগুলো এখন বিদ্যমান ও সচল টার্মিনালগুলোকে বেশি পছন্দ করছে, কারণ এখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত ও বিপুল রাজস্ব আয় সম্ভব।
চট্টগ্রাম বন্দরের পুরো পরিচালন ব্যবস্থা মূলত চারটি প্রধান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো হলো জিসিবি, সিসিটি, এনসিটি এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বা পিসিটি। বর্তমান চিত্র অনুযায়ী, সদ্য নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালটি বাদে বাকি সবকটি টার্মিনালই দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। পিসিটি পরিচালনার দায়িত্বটি ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশ্ববিখ্যাত বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড গত এপ্রিল মাসে দুবাইতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও দুবাইয়ের মধ্যকার যৌথ অর্থনৈতিক ফোরামের এক শীর্ষ বৈঠকে সিসিটি টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য জোরালো আগ্রহ দেখায়। এর আগে থেকেই বন্দরের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ততম অংশ এনসিটি ইজারা নেওয়ার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সরকারের উচ্চপর্যায়ে কয়েক বছর ধরে দরকষাকষি চলছিল। নথিপত্র অনুযায়ী, দুবাই ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত সিসিটি ও এনসিটি এই দুটি প্রধান টার্মিনালকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একটি সমন্বিত ও একক শক্তিশালী বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চাচ্ছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের এই তোড়জোড়ের মাঝেই আসরে নেমেছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালও। তারা সিসিটি এবং জিসিবি এই দুটি টার্মিনালকেই আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি নিজেদের ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে কেবল বিদেশি প্রতিষ্ঠানই নয়, এই দৌড়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপও শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এর আগে সিসিটি টার্মিনাল একাই পরিচালনার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও, সম্প্রতি তারা সিসিটি এবং এনসিটি উভয় টার্মিনাল একসাথে পরিচালনার জন্য একটি বড় ধরনের বাণিজ্যিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। অন্যদিকে, জিসিবি টার্মিনালটি বর্তমানে যে বারোটি দেশীয় বার্থ অপারেটর কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, তারাও বসে নেই। এই দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে একটি শক্তিশালী জোট বা কনসোর্টিয়াম গঠন করে যৌথভাবে জিসিবি টার্মিনালটিকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার এবং পরিচালনার প্রস্তাব পেশ করেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, সচল টার্মিনালগুলোর আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগের জন্য ইদানীং দেশি-বিদেশি অনেক নামী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একের পর এক বড় বড় প্রস্তাব আসছে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বোঝা যায় কেন এই টার্মিনালগুলোর প্রতি সবার এতো লোভাতুর দৃষ্টি। বন্দরের চারটি প্রধান টার্মিনালের মধ্যে তিনটিই শুধুমাত্র কনটেইনারবাহী জাহাজের মালামাল ওঠানো-নামানোর জন্য সুনির্দিষ্ট। কেবল জিসিবি টার্মিনালটিতে কনটেইনারের পাশাপাশি খোলা পণ্য বা বাল্ক কার্গো এবং সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজও ভেড়ানো যায়। বিগত ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং বা খালাস-বোঝাই করা হয়েছে। এর সিংহভাগই এসেছে এনসিটি থেকে, যার পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ২১ হাজার একক। এছাড়া জিসিবি একাই ১০ লাখ ৮৩ হাজার একক, সিসিটি ৪ লাখ ৮৩ হাজার একক এবং নতুন চালু হওয়া পিসিটি ১ লাখ ৫৩ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, আগে বিদেশি কোম্পানিগুলো সমুদ্রতীরে নতুন গ্রিনফিল্ড বা শূন্য থেকে শুরু করা প্রকল্পে আগ্রহী ছিল। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তারা নতুন করে মাটি ভরাট বা জেটি বানানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় না গিয়ে তাৎক্ষণিক আয়ের পথ খুঁজছে, যার জন্য তৈরি ও সচল জেটিগুলোর কোনো বিকল্প নেই।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সরকারের পালাবদলের মধ্যেও এই দরকষাকষি থেমে থাকেনি। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই এনসিটি টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও এই প্রক্রিয়া সচল রাখা হয়। তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগে আগে স্থানীয় বন্দর শ্রমিক ও কর্মচারীদের তীব্র আন্দোলন এবং ধর্মঘটের মুখে পুরো প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সেই পুরনো প্রস্তাবটি নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা ও মূল্যায়ন করছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও দুবাইয়ের যৌথ উন্নয়ন এজেন্ডায় সিসিটি টার্মিনালটিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আগামী দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে একটি স্বতন্ত্র ও বড় প্রকল্প হিসেবে গুরুত্ব পেতে পারে।
এদিকে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল জিসিবি ও সিসিটি টার্মিনাল দুটিকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর করার জন্য প্রায় ৬০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের একটি বিশদ মহাপরিকল্পনা সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তাদের এই বড় বিনিয়োগের প্রস্তাবটি প্রাথমিক স্তরে থাকলেও সরকার সবুজ সংকেত দিলে তারা দ্রুত কাজ শুরু করতে প্রস্তুত। এর বিপরীতে দেশীয় জায়ান্ট এমজিএইচ গ্রুপ গত বছর প্রথম দফায় সিসিটি টার্মিনালের জন্য ৩০ কোটি ডলারের প্রস্তাব দিলেও, সম্প্রতি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনার জন্য একটি বড় চমক দেখিয়েছে। তারা প্রতি কনটেইনার থেকে আয়ের একটি বড় অংশ সরাসরি বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বিদেশি ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত রাজস্বের চেয়েও বেশি। এমজিএইচ গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের দেওয়া ১৫ বছরের এই ব্যবসায়িক মডেলে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ১ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করতে পারবে। দেশীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তাদের প্রশাসনিক ও অর্থায়ন ব্যয় কম, যার ফলে তারা সরকারকে বেশি লভ্যাংশ দিয়েও নিজেরা ভালো মুনাফা ঘরে তুলতে পারবে।
অন্যদিকে, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জিসিবি টার্মিনাল পরিচালনাকারী ১২টি বার্থ অপারেটরের সংগঠনও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের আওতায় এই কার্গো টার্মিনালটির ভৌত অবকাঠামো পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। তাদের জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশি ও বিদেশি অংশীদারদের সমন্বয়ে তারা প্রায় ৬২ কোটি ৭০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তারা জিসিবির জেটি, কনটেইনার ইয়ার্ড, শেড এবং বড় বড় গুদামগুলোকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট ছক তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের এই সচল সম্পদগুলোর নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাবে, তা নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

আপনার মতামত লিখুন