দিকপাল

পিবিআই তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য: ২৩ শতাংশ হত্যা মামলায় মেলেনি প্রমাণ


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ | ১০:৩৭ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

পিবিআই তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য: ২৩ শতাংশ হত্যা মামলায় মেলেনি প্রমাণ

দেশে খুনের মতো মারাত্মক অপরাধের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য হারে সাজানো ও বানোয়াট মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটছে। মূলত ব্যক্তিগত শত্রুতায় কাউকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা, চরম হয়রানি, অবৈধ অর্থ আদায় কিংবা রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এই ধরনের ভিত্তিহীন মামলা করা হয়ে থাকে, যা সমাজে 'মামলা বাণিজ্য' নামে পরিচিত। দেশের প্রচলিত আইনে বানোয়াট মামলা এবং আদালতে অসত্য সাক্ষ্য দেওয়া—দুটিই গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য। এই ধরনের অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির আইনি বিধান থাকলেও বাস্তবে এই কুৎসিত প্রবণতা বন্ধ করা যাচ্ছে না। এর বিপরীত দিকে, অনেক মানুষ আবার নিজের স্বজনের খুনের প্রকৃত বিচার পাওয়ার আশায় মামলা করেও যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বস্তুগত আলামতের অভাবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

সম্প্রতি পুলিশ সপ্তাহের সমাপনী দিনে আয়োজিত অপরাধ বিষয়ক একটি বিশেষ সম্মেলনে বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের বা পিবিআই-এর গত দশ বছরের হত্যা মামলা তদন্তের একটি চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে পিবিআই মোট সাত হাজার চারশত সাতাশটি হত্যা মামলার নিখুঁত তদন্ত সম্পন্ন করেছে, যেগুলোর এজাহার বা প্রাথমিক তথ্য বিবরণী সরাসরি থানায় দায়ের করা হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্ত শেষে দেখা গেছে, সংস্থাটির হাতে থাকা মোট হত্যা মামলার প্রায় বাইশ দশমিক একাত্তর শতাংশ ঘটনার কোনো সত্যতা বা প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে এর বিপরীতে, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলায় চার হাজার একশত পঁচাত্তরটি মামলায় দণ্ডবিধির তিনশত দুই ধারা মোতাবেক আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র বা চার্জশিট জমা দিয়েছে পিবিআই।

বিগত জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট বিশেষ পরিস্থিতিতেও দেশের বিভিন্ন স্থানে হতাহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা বহু মামলায় ব্যাপক হারে নিরীহ মানুষকে আসামি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। একেকটি মামলায় শত শত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। এমন এক জটিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ফৌজদারি কার্যবিধিতে একটি নতুন ধারা সংযোজন করে বিশেষ পরিপত্র জারি করে। এর ফলে, হয়রানির উদ্দেশ্যে যদি কোনো ব্যক্তির নাম মামলার প্রাথমিক বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করাও হয়, তবে তদন্ত কর্মকর্তা একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন এবং আদালত তা বিবেচনা করে তদন্ত চলাকালীন সময়েই ওই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মামলা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার আইনি ক্ষমতা লাভ করেছে।

পিবিআই-এর গত এক দশকের নথিপত্র গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত তদন্ত হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে বড় একটি অংশে সরাসরি হত্যাকাণ্ডের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তবে ভুল তথ্য দেওয়া, আইনগত অসারতা কিংবা পুরোপুরি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে করা মামলার সংখ্যাও কম নয়। দেশের ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ প্রবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে পাঁচ ধরনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারে। তদন্তে ঘটনা সত্য প্রমাণিত হলেও পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকলে কিংবা খুনিকে কোনোভাবেই শনাক্ত করা না গেলে 'চূড়ান্ত প্রতিবেদন সত্য' দেওয়া হয়। এর একটি বড় উদাহরণ হলো দেশ কাঁপানো সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহরুন রুনি হত্যা মামলা, যেটির তদন্ত বর্তমানে পিবিআই করছে এবং খুনি শনাক্ত না হলে আইন অনুযায়ী এই ধরনের প্রতিবেদনই দাখিল করতে হবে। এছাড়া সম্পূর্ণ বানোয়াট মামলার ক্ষেত্রে 'চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিথ্যা' এবং তথ্যের গড়মিল থাকলে 'চূড়ান্ত প্রতিবেদন তথ্যগত ভুল' হিসেবে আদালতে পেশ করা হয়।

এই প্রসঙ্গে পিবিআই-এর প্রধান এবং পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মোস্তফা কামাল সমকালকে জানিয়েছেন যে, মামলার তদন্ত মূলত একটি সূক্ষ্ম শিল্পের মতো। তাড়াহুড়ো করে কিংবা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে কোনো স্পর্শকাতর মামলার সঠিক রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব নয়। এর জন্য তদন্ত কর্মকর্তার সর্বোচ্চ সততা, একাগ্রতা ও পেশাদারিত্বের প্রয়োজন হয়। তিনি আরও স্বীকার করেন যে, অনেকেই ব্যক্তিগত ও সামাজিক নানা কারণে আসল অপরাধীদের আড়াল করতে কিংবা তাদের সাথে নিরীহ মানুষদের ফাঁসাতে সাজানো মামলা করেন। অন্যদিকে পৃথিবীর কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই শতভাগ হত্যা মামলার রহস্য ভেদ করতে পারে না। বাংলাদেশেও ঘটনার সত্যতা থাকার পরও প্রায় দেড় হাজার মামলার কোনো কূলকিনারা বা অকাট্য প্রমাণ খুঁজে পায়নি পিবিআই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

এদিকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই হয়রানিমূলক মামলার বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে আইনমন্ত্রীর কাছে এক প্রশ্নের জবাবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে জানান, মামলার এজাহারে সাধারণত কোনো আসামির রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয় উল্লেখ থাকে না। ফলে কোন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কতগুলো রাজনৈতিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা হয়েছে, তার নিখুঁত পরিসংখ্যান সরকারিভাবে বের করা বেশ কঠিন। তবে পিবিআই-এর অপর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের হওয়া একশত পঁচানব্বইটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, মোট সাত হাজার ছয়শত চুয়ান্ন জন আসামির মধ্যে প্রায় চার হাজার সাতশত পঁচানব্বই জনের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, মোট অভিযুক্তদের মধ্যে প্রায় বাষট্টি দশমিক পঁয়ষট্টি শতাংশ মানুষই ছিলেন সম্পূর্ণ নির্দোষ, যা দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চিন্তার বিষয়।

একটি আদর্শ ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় বানোয়াট মামলার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে আইনের কঠোর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। দেশের প্রচলিত আইনে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট যদি নিশ্চিত হন যে মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক, তবে তিনি বাদীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা করাসহ ক্ষতিগ্রস্ত আসামিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন। এছাড়া আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে কিংবা বানোয়াট অভিযোগ দায়ের করলে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী অপরাধীর সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং মোটা অঙ্কের অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এমনকি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনেও বানোয়াট মামলা দায়েরকারীর জন্য সাত বছরের কারাদণ্ডের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের মানুষের মৌলিক ও আইনি অধিকার রক্ষা করতে হলে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।


আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

রোববার, ১৭ মে ২০২৬


পিবিআই তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য: ২৩ শতাংশ হত্যা মামলায় মেলেনি প্রমাণ

প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬

featured Image

দেশে খুনের মতো মারাত্মক অপরাধের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য হারে সাজানো ও বানোয়াট মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটছে। মূলত ব্যক্তিগত শত্রুতায় কাউকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা, চরম হয়রানি, অবৈধ অর্থ আদায় কিংবা রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এই ধরনের ভিত্তিহীন মামলা করা হয়ে থাকে, যা সমাজে 'মামলা বাণিজ্য' নামে পরিচিত। দেশের প্রচলিত আইনে বানোয়াট মামলা এবং আদালতে অসত্য সাক্ষ্য দেওয়া—দুটিই গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য। এই ধরনের অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির আইনি বিধান থাকলেও বাস্তবে এই কুৎসিত প্রবণতা বন্ধ করা যাচ্ছে না। এর বিপরীত দিকে, অনেক মানুষ আবার নিজের স্বজনের খুনের প্রকৃত বিচার পাওয়ার আশায় মামলা করেও যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বস্তুগত আলামতের অভাবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

সম্প্রতি পুলিশ সপ্তাহের সমাপনী দিনে আয়োজিত অপরাধ বিষয়ক একটি বিশেষ সম্মেলনে বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের বা পিবিআই-এর গত দশ বছরের হত্যা মামলা তদন্তের একটি চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে পিবিআই মোট সাত হাজার চারশত সাতাশটি হত্যা মামলার নিখুঁত তদন্ত সম্পন্ন করেছে, যেগুলোর এজাহার বা প্রাথমিক তথ্য বিবরণী সরাসরি থানায় দায়ের করা হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্ত শেষে দেখা গেছে, সংস্থাটির হাতে থাকা মোট হত্যা মামলার প্রায় বাইশ দশমিক একাত্তর শতাংশ ঘটনার কোনো সত্যতা বা প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে এর বিপরীতে, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলায় চার হাজার একশত পঁচাত্তরটি মামলায় দণ্ডবিধির তিনশত দুই ধারা মোতাবেক আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র বা চার্জশিট জমা দিয়েছে পিবিআই।

বিগত জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট বিশেষ পরিস্থিতিতেও দেশের বিভিন্ন স্থানে হতাহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা বহু মামলায় ব্যাপক হারে নিরীহ মানুষকে আসামি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। একেকটি মামলায় শত শত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। এমন এক জটিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ফৌজদারি কার্যবিধিতে একটি নতুন ধারা সংযোজন করে বিশেষ পরিপত্র জারি করে। এর ফলে, হয়রানির উদ্দেশ্যে যদি কোনো ব্যক্তির নাম মামলার প্রাথমিক বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করাও হয়, তবে তদন্ত কর্মকর্তা একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন এবং আদালত তা বিবেচনা করে তদন্ত চলাকালীন সময়েই ওই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মামলা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার আইনি ক্ষমতা লাভ করেছে।

পিবিআই-এর গত এক দশকের নথিপত্র গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত তদন্ত হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে বড় একটি অংশে সরাসরি হত্যাকাণ্ডের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তবে ভুল তথ্য দেওয়া, আইনগত অসারতা কিংবা পুরোপুরি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে করা মামলার সংখ্যাও কম নয়। দেশের ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ প্রবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে পাঁচ ধরনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারে। তদন্তে ঘটনা সত্য প্রমাণিত হলেও পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকলে কিংবা খুনিকে কোনোভাবেই শনাক্ত করা না গেলে 'চূড়ান্ত প্রতিবেদন সত্য' দেওয়া হয়। এর একটি বড় উদাহরণ হলো দেশ কাঁপানো সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহরুন রুনি হত্যা মামলা, যেটির তদন্ত বর্তমানে পিবিআই করছে এবং খুনি শনাক্ত না হলে আইন অনুযায়ী এই ধরনের প্রতিবেদনই দাখিল করতে হবে। এছাড়া সম্পূর্ণ বানোয়াট মামলার ক্ষেত্রে 'চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিথ্যা' এবং তথ্যের গড়মিল থাকলে 'চূড়ান্ত প্রতিবেদন তথ্যগত ভুল' হিসেবে আদালতে পেশ করা হয়।

এই প্রসঙ্গে পিবিআই-এর প্রধান এবং পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মোস্তফা কামাল সমকালকে জানিয়েছেন যে, মামলার তদন্ত মূলত একটি সূক্ষ্ম শিল্পের মতো। তাড়াহুড়ো করে কিংবা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে কোনো স্পর্শকাতর মামলার সঠিক রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব নয়। এর জন্য তদন্ত কর্মকর্তার সর্বোচ্চ সততা, একাগ্রতা ও পেশাদারিত্বের প্রয়োজন হয়। তিনি আরও স্বীকার করেন যে, অনেকেই ব্যক্তিগত ও সামাজিক নানা কারণে আসল অপরাধীদের আড়াল করতে কিংবা তাদের সাথে নিরীহ মানুষদের ফাঁসাতে সাজানো মামলা করেন। অন্যদিকে পৃথিবীর কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই শতভাগ হত্যা মামলার রহস্য ভেদ করতে পারে না। বাংলাদেশেও ঘটনার সত্যতা থাকার পরও প্রায় দেড় হাজার মামলার কোনো কূলকিনারা বা অকাট্য প্রমাণ খুঁজে পায়নি পিবিআই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

এদিকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই হয়রানিমূলক মামলার বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে আইনমন্ত্রীর কাছে এক প্রশ্নের জবাবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে জানান, মামলার এজাহারে সাধারণত কোনো আসামির রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয় উল্লেখ থাকে না। ফলে কোন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কতগুলো রাজনৈতিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা হয়েছে, তার নিখুঁত পরিসংখ্যান সরকারিভাবে বের করা বেশ কঠিন। তবে পিবিআই-এর অপর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের হওয়া একশত পঁচানব্বইটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, মোট সাত হাজার ছয়শত চুয়ান্ন জন আসামির মধ্যে প্রায় চার হাজার সাতশত পঁচানব্বই জনের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, মোট অভিযুক্তদের মধ্যে প্রায় বাষট্টি দশমিক পঁয়ষট্টি শতাংশ মানুষই ছিলেন সম্পূর্ণ নির্দোষ, যা দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চিন্তার বিষয়।

একটি আদর্শ ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় বানোয়াট মামলার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে আইনের কঠোর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। দেশের প্রচলিত আইনে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট যদি নিশ্চিত হন যে মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক, তবে তিনি বাদীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা করাসহ ক্ষতিগ্রস্ত আসামিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারেন। এছাড়া আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে কিংবা বানোয়াট অভিযোগ দায়ের করলে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী অপরাধীর সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং মোটা অঙ্কের অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এমনকি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনেও বানোয়াট মামলা দায়েরকারীর জন্য সাত বছরের কারাদণ্ডের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের মানুষের মৌলিক ও আইনি অধিকার রক্ষা করতে হলে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।



দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল