আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশে প্রতিবছরই নতুন নোটের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তবে এবারের চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন এবং বেশ উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান বা টাঁকশালের কাছে ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোটের চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও জোগানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। টাঁকশাল কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, কাঁচামাল অর্থাৎ কাগজ ও কালির তীব্র সংকটের কারণে তারা বড়জোর আট হাজার কোটি টাকার নতুন নোট সরবরাহ করতে সক্ষম হবে। ফলে চাহিদার তুলনায় অর্ধেক পরিমাণ নতুন টাকা বাজারে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা আসন্ন ঈদের কেনাকাটা ও লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে এবং সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংবলিত প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার পুরোনো নকশার নোট মজুদ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ টাকা বাজারে ছেড়ে সংকট সামাল দিতে পারত। কিন্তু পটপরিবর্তনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতি অনুযায়ী আপাতত বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত নোট বাজারে না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলেই মূলত নতুন নকশার নোট মুদ্রণে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে এবং কাঁচামালের সংকটে মুদ্রণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান বাজারে ছাপানো টাকার এই টানাটানি আর তারল্য সংকট—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বর্তমানে দেশে মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা, যার বিপরীতে ছাপানো টাকার চাহিদা থাকে প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার থেকে তিন লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছর ঈদের সময় মানুষ কেনাকাটা ও সালামি দেওয়ার জন্য নতুন নোটের প্রতি বেশি আগ্রহী থাকে, যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বোচ্চ পরিমাণ নতুন টাকা বাজারে ছাড়ে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সব মূল্যমানের নোটের নকশা একযোগে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ায় এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট নোটের নকশা বদলাতে ১০ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে এবং আগে একটি একটি করে নোটের নকশা বদল করা হতো। এবার একসঙ্গে সব নোটের ভোল পাল্টানোর চেষ্টা করায় চাহিদাও জোগানের মধ্যে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বিগত দুটি ঈদেও বাজারে আশানুরূপ নতুন নোট ছাড়া সম্ভব হয়নি।
ব্যাংকিং খাতের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের ভল্টে রাখা ছেঁড়া-ফাটা বা পুরোনো নোটগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিয়ে সমমূল্যের নতুন বা ফ্রেশ নোট সংগ্রহ করে। কিন্তু পর্যাপ্ত নতুন নোটের সরবরাহ না থাকায় ব্যাংকগুলো এখন গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা দিতে পারছে না। ফলে সাধারণ মানুষের হাতে হাতে এখন প্রচুর ময়লাযুক্ত এবং ছেঁড়া-ফাটা নোট ঘুরছে। ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা এই নোটগুলো নিতে অনীহা প্রকাশ করায় ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদিও 'ক্লিন নোট পলিসি' বা পরিচ্ছন্ন নোট নীতিমালা গ্রহণ করেছে, তবুও নতুন টাকার সংকটে এই নীতি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি গত বছরের নভেম্বর থেকে সাধারণ গ্রাহকদের সরাসরি ব্যাংক থেকে সরাসরি টাকা বদলানোর সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
টাঁকশাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংকট মোকাবিলায় তারা বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে আকাশপথে বিদেশ থেকে কাগজ ও কালি আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। বাড়তি খরচ করে কাঁচামাল আনা হলেও ঈদের আগে পর্যাপ্ত নোট ছাপিয়ে বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে খোদ ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন যে, দ্রুতই ব্যাংকগুলোকে নতুন টাকা দেওয়া শুরু হবে এবং সংকট কেটে যাবে। তবে বাস্তবতা বলছে, চাহিদার তুলনায় জোগানের এই ঘাটতি ঈদের বাজারে সাধারণ মানুষের উৎসবের আমেজকে কিছুটা হলেও ম্লান করে দিতে পারে।

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশে প্রতিবছরই নতুন নোটের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তবে এবারের চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন এবং বেশ উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান বা টাঁকশালের কাছে ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোটের চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও জোগানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। টাঁকশাল কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, কাঁচামাল অর্থাৎ কাগজ ও কালির তীব্র সংকটের কারণে তারা বড়জোর আট হাজার কোটি টাকার নতুন নোট সরবরাহ করতে সক্ষম হবে। ফলে চাহিদার তুলনায় অর্ধেক পরিমাণ নতুন টাকা বাজারে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা আসন্ন ঈদের কেনাকাটা ও লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে এবং সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংবলিত প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার পুরোনো নকশার নোট মজুদ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ টাকা বাজারে ছেড়ে সংকট সামাল দিতে পারত। কিন্তু পটপরিবর্তনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতি অনুযায়ী আপাতত বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত নোট বাজারে না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলেই মূলত নতুন নকশার নোট মুদ্রণে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে এবং কাঁচামালের সংকটে মুদ্রণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান বাজারে ছাপানো টাকার এই টানাটানি আর তারল্য সংকট—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বর্তমানে দেশে মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা, যার বিপরীতে ছাপানো টাকার চাহিদা থাকে প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার থেকে তিন লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছর ঈদের সময় মানুষ কেনাকাটা ও সালামি দেওয়ার জন্য নতুন নোটের প্রতি বেশি আগ্রহী থাকে, যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বোচ্চ পরিমাণ নতুন টাকা বাজারে ছাড়ে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সব মূল্যমানের নোটের নকশা একযোগে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ায় এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট নোটের নকশা বদলাতে ১০ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে এবং আগে একটি একটি করে নোটের নকশা বদল করা হতো। এবার একসঙ্গে সব নোটের ভোল পাল্টানোর চেষ্টা করায় চাহিদাও জোগানের মধ্যে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বিগত দুটি ঈদেও বাজারে আশানুরূপ নতুন নোট ছাড়া সম্ভব হয়নি।
ব্যাংকিং খাতের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের ভল্টে রাখা ছেঁড়া-ফাটা বা পুরোনো নোটগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিয়ে সমমূল্যের নতুন বা ফ্রেশ নোট সংগ্রহ করে। কিন্তু পর্যাপ্ত নতুন নোটের সরবরাহ না থাকায় ব্যাংকগুলো এখন গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা দিতে পারছে না। ফলে সাধারণ মানুষের হাতে হাতে এখন প্রচুর ময়লাযুক্ত এবং ছেঁড়া-ফাটা নোট ঘুরছে। ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা এই নোটগুলো নিতে অনীহা প্রকাশ করায় ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদিও 'ক্লিন নোট পলিসি' বা পরিচ্ছন্ন নোট নীতিমালা গ্রহণ করেছে, তবুও নতুন টাকার সংকটে এই নীতি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি গত বছরের নভেম্বর থেকে সাধারণ গ্রাহকদের সরাসরি ব্যাংক থেকে সরাসরি টাকা বদলানোর সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
টাঁকশাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংকট মোকাবিলায় তারা বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে আকাশপথে বিদেশ থেকে কাগজ ও কালি আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। বাড়তি খরচ করে কাঁচামাল আনা হলেও ঈদের আগে পর্যাপ্ত নোট ছাপিয়ে বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে খোদ ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন যে, দ্রুতই ব্যাংকগুলোকে নতুন টাকা দেওয়া শুরু হবে এবং সংকট কেটে যাবে। তবে বাস্তবতা বলছে, চাহিদার তুলনায় জোগানের এই ঘাটতি ঈদের বাজারে সাধারণ মানুষের উৎসবের আমেজকে কিছুটা হলেও ম্লান করে দিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন