জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে গত ৪ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর বাংলামটরে আন্দোলনের সময় বেলাল হোসেন রাব্বি নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার দিন পর তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের মা জেসমিন আক্তার বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়েছিল। মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঘটনার গভীরে নেমে এজাহারভুক্ত ১০ জন আসামির এই হত্যাকাণ্ডের সাথে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা খুঁজে পায়নি। তবে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে এজাহারভুক্ত বাকি ১২ জনের পাশাপাশি নতুন করে আরও ছয়জন অপরাধীকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় সংস্থাটি। ফলে শেষ পর্যন্ত মোট ১৮ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আদালতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করে পিবিআই।
কেবল এই একটি মামলাই নয়, দেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট অসংখ্য মামলার তদন্তে নেমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জানতে পেরেছে যে, প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে সম্পূর্ণ হয়রানিমূলকভাবে এসব মামলায় আসামি করা হয়েছিল। নিরপরাধ এই মানুষদের আইনি হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে ইতোমধ্যে ৭৯৮টি মামলায় মোট ৫ হাজার ৭৪ জন নাগরিককে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। এর পাশাপাশি ঘটনার সত্যতা না থাকায় কিংবা মামলাগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় অন্তত ৪০টি মামলায় আদালতে চূড়ান্ত বা ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছে। সাধারণত পুলিশ কোনো মামলার তদন্ত শেষ করে যদি ঘটনার সপক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না পায়, তবে আদালতে এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এ ছাড়া গত ১৬ মে পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে জুলাইয়ের ঘটনা-সংশ্লিষ্ট ১৭৫টি মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে, যাতে মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮২৪ জন।
পুলিশ সদরদপ্তরের সংগৃহীত ও সংরক্ষিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশজুড়ে হওয়া সব ধরনের সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের থানাগুলোতে ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাই রয়েছে ৭৯৯টি, আর বাকি ১ হাজার ৫৬টি মামলা দায়ের হয়েছে হত্যাচেষ্টাসহ দণ্ডবিধির অন্যান্য ধারায়। অভিযোগপত্র জমা পড়া মামলাগুলোর মধ্যে ৪৯টি হলো সরাসরি মার্ডার বা হত্যা মামলা, যেখানে মোট ৪ হাজার ৭২৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই আসামিদের মধ্যে ৩ হাজার ২৭১ জনের নাম মূল এজাহারে উল্লেখ ছিল এবং বাকি ১ হাজার ৪৫২ জনের নাম পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্তে পরবর্তী সময়ে বেরিয়ে আসে। অন্যদিকে হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারায় রুজু হওয়া ১২৬টি মামলার অভিযোগপত্রও আদালতে দাখিল করা হয়েছে, যাতে মোট আসামির সংখ্যা ৯ হাজার ১০১ জন। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৭৪ জন এজাহারনামীয় এবং তদন্তের মাধ্যমে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৯২৭ জন।
দেশের প্রচলিত ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে আরও বেশি সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য, জনবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত করার মহান উদ্দেশ্যে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ফৌজদারি কার্যবিধি বা কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮ এর মধ্যে ১৭৩ (এ) নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারা সংযুক্ত করে। এই যুগান্তকারী আইনি সংস্কারের মূল কথা হলো, যদি কোনো নাগরিকের নাম কোনো মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বা এজাহারে কেবল রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাবশত কিংবা হয়রানিমূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে, তবে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে একটি অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন। আদালত সেই প্রতিবেদনের সারবত্তা বিবেচনা করে নির্দোষ ব্যক্তিকে মামলা থেকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি দিতে পারবেন। এই বিশেষ ধারার সদ্ব্যবহার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বা ডিএমপির বিভিন্ন থানায় দায়ের করা ৩৫৪টি মামলায় ৩ হাজার ৮৪৯ জন নিরীহ মানুষকে মামলা থেকে পুরোপুরি রেহাই দেওয়ার জন্য আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে।
একই আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সিলেট মহানগর পুলিশের আওতাধীন বিভিন্ন থানার ৩৯টি মামলায় ১৪৪ জন, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ১৯টি মামলায় ৫২ জন, গাজীপুরে ১২টি মামলায় ২১ জন, রাজশাহীতে ১০টি মামলায় ২৫ জন, বরিশালে ৩টি মামলায় ৬ জন, খুলনায় ১টি মামলায় ৫ জন এবং রংপুরে ২টি মামলায় ৬ জনকে অব্যাহতির জোর সুপারিশ করে আদালতে বিশেষ প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এর বাইরেও ঢাকা রেঞ্জের অধীনে থাকা ৯টি জেলার ২১১টি মামলায় ৪৮৫ জন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ৬টি জেলার ৩৪টি মামলায় Bound ৮৫ জন, খুলনা রেঞ্জের ৮টি জেলার ২৮টি মামলায় ৫৮ জন, রংপুর রেঞ্জের ৪ জেলার ৫টি মামলায় ৮ জন, রাজশাহী রেঞ্জের ৩ জেলার ১২ মামলায় Readiness জন, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ৪ জেলার ১৮টি মামলায় ৬০ জন, বরিশাল রেঞ্জের ২ জেলার ২ মামলায় ১৭ জন এবং সিলেট রেঞ্জের ৩ জেলার ২০টি মামলায় ১৪০ জন নিরপরাধ মানুষকে অব্যাহতি দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে পুলিশ।
পুলিশ সদরদপ্তরের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এএইচএম শাহাদাত হোসাইন এই সামগ্রিক বিষয়ে জানিয়েছেন যে, জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক মামলাগুলোর তদন্ত অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও ধারাবাহিক অগ্রগতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় তথ্য বিশ্লেষণ এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। একই সাথে ফৌজদারি কার্যবিধির নতুন ১৭৩ (এ) ধারার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে কোনোভাবেই কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি আইনি হয়রানির শিকার না হন এবং তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
এদিকে পিবিআইয়ের সংগৃহীত তথ্যে একটি চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তদন্ত করা মামলাগুলোতে দেখা গেছে যে, প্রায় ৬১ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো বাস্তব প্রমাণ মেলেনি। দেশের বিভিন্ন থানার মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলার মধ্যে ৭৭টির তদন্তভার দেওয়া হয়েছিল পিবিআইকে। এর পাশাপাশি আদালতের সরাসরি আদেশে আরও ১৯৫টি মামলার তদন্তভার তাদের কাঁধে আসে। সব মিলিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের মোট ২৭২টি স্পর্শকাতর মামলার তদন্ত শুরু করে এই বিশেষ সংস্থাটি। এর মধ্যে হত্যা মামলা ছিল ৮৪টি এবং অন্যান্য ধারার মামলা ১৮৮টি। গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে ১৬৫টি মামলার তদন্ত পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে, যার ৪২টি হত্যা মামলা এবং ১২৩টি অন্যান্য বিষয়ের। বর্তমানে আরও ১০৭টি মামলা তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
পিবিআইয়ের তদন্তে শেষ হওয়া ১৬৫টি মামলার মধ্যে ১১১টিতে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা বা প্রমাণ মিলেছে, যার শতকরা হার দাঁড়ায় ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এই প্রমাণিত মামলাগুলোর মধ্যে ১৯টি হত্যা এবং ৯২টি অন্য ধারার মামলা হিসেবে আদালতে চার্জশিটভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ৩১টি মামলার অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি মামলাকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পেছনে বাদীপক্ষের আদালতে অনুপস্থিতি, একই ঘটনা নিয়ে একাধিক মামলার জটিলতা বা সম্পূর্ণ অসত্য তথ্য দিয়ে মামলা করার মতো বিষয়গুলো জড়িত ছিল। এ ছাড়া ২৩টি মামলা বাদীর নিজস্ব অনীহা বা অন্য কোনো বিশেষ কারণে আদালত থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রমাণিত হওয়া ১১১টি মামলায় এজাহারভুক্ত মোট ৯ হাজার ৬৯১ জন আসামির মধ্যে প্রায় ৬১ দশমিক ১ শতাংশের বিরুদ্ধেই অপরাধের কোনো ন্যূনতম প্রমাণ মেলেনি। ফলে তাদের খালাস বা অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে এবং মাত্র ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ব্যক্তিগত শত্রুতা, পুরোনো সামাজিক বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে অনেক মানুষের নাম এসব মামলার এজাহারে জোরপূর্বক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যারা ঘটনার সময় দুর্ঘটনাস্থল থেকে শত মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন।
এই ধরনের হয়রানিমূলক মামলার আরেকটি বাস্তব উদাহরণ হলো মুদি দোকানদার মো. জামালের ঘটনা। তিনি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেওয়ার সময় তিনি আকস্মিকভাবে গুলিবিদ্ধ হন। পরবর্তী সময়ে এই হত্যাচেষ্টার ঘটনায় তিনি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের একপর্যায়ে জামাল গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর বাঁচানো সম্ভব হয়। জামাল তাঁর মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক সোতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ১৯৭ জনকে আসামি করেন। পিবিআই ঘটনাটির তদন্ত হাতে নিয়ে হামলার মূল সত্যতা খুঁজে পেলেও দেখতে পায় যে, অভিযুক্ত ১৯৭ জনের মধ্যে মাত্র ৩৮ জনের এই অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। বাকি ১৫৯ জনের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ কাল্পনিক ও অসত্য প্রমাণিত হওয়ায় তদন্ত সংস্থাটি কেবল প্রকৃত দোষী ওই ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। পিবিআইয়ের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, বর্তমানে তদন্তাধীন থাকা বাকি মামলাগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ কাজই সম্পন্ন হয়ে গেছে। বাকি থাকা ১০ শতাংশ কাজের মধ্যে বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতি বা মেডিকেল সার্টিফিকেটের মতো কিছু দাপ্তরিক কাগজপত্রের অপেক্ষায় সামান্য বিলম্ব হচ্ছে, যা খুব দ্রুতই সমাধান করে আদালতে পেশ করা হবে।

মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে গত ৪ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর বাংলামটরে আন্দোলনের সময় বেলাল হোসেন রাব্বি নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার দিন পর তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের মা জেসমিন আক্তার বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়েছিল। মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঘটনার গভীরে নেমে এজাহারভুক্ত ১০ জন আসামির এই হত্যাকাণ্ডের সাথে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা খুঁজে পায়নি। তবে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে এজাহারভুক্ত বাকি ১২ জনের পাশাপাশি নতুন করে আরও ছয়জন অপরাধীকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় সংস্থাটি। ফলে শেষ পর্যন্ত মোট ১৮ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আদালতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করে পিবিআই।
কেবল এই একটি মামলাই নয়, দেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট অসংখ্য মামলার তদন্তে নেমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জানতে পেরেছে যে, প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে সম্পূর্ণ হয়রানিমূলকভাবে এসব মামলায় আসামি করা হয়েছিল। নিরপরাধ এই মানুষদের আইনি হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে ইতোমধ্যে ৭৯৮টি মামলায় মোট ৫ হাজার ৭৪ জন নাগরিককে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। এর পাশাপাশি ঘটনার সত্যতা না থাকায় কিংবা মামলাগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় অন্তত ৪০টি মামলায় আদালতে চূড়ান্ত বা ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছে। সাধারণত পুলিশ কোনো মামলার তদন্ত শেষ করে যদি ঘটনার সপক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না পায়, তবে আদালতে এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এ ছাড়া গত ১৬ মে পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে জুলাইয়ের ঘটনা-সংশ্লিষ্ট ১৭৫টি মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে, যাতে মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮২৪ জন।
পুলিশ সদরদপ্তরের সংগৃহীত ও সংরক্ষিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশজুড়ে হওয়া সব ধরনের সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের থানাগুলোতে ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাই রয়েছে ৭৯৯টি, আর বাকি ১ হাজার ৫৬টি মামলা দায়ের হয়েছে হত্যাচেষ্টাসহ দণ্ডবিধির অন্যান্য ধারায়। অভিযোগপত্র জমা পড়া মামলাগুলোর মধ্যে ৪৯টি হলো সরাসরি মার্ডার বা হত্যা মামলা, যেখানে মোট ৪ হাজার ৭২৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই আসামিদের মধ্যে ৩ হাজার ২৭১ জনের নাম মূল এজাহারে উল্লেখ ছিল এবং বাকি ১ হাজার ৪৫২ জনের নাম পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্তে পরবর্তী সময়ে বেরিয়ে আসে। অন্যদিকে হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারায় রুজু হওয়া ১২৬টি মামলার অভিযোগপত্রও আদালতে দাখিল করা হয়েছে, যাতে মোট আসামির সংখ্যা ৯ হাজার ১০১ জন। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৭৪ জন এজাহারনামীয় এবং তদন্তের মাধ্যমে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৯২৭ জন।
দেশের প্রচলিত ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে আরও বেশি সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য, জনবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত করার মহান উদ্দেশ্যে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ফৌজদারি কার্যবিধি বা কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮ এর মধ্যে ১৭৩ (এ) নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারা সংযুক্ত করে। এই যুগান্তকারী আইনি সংস্কারের মূল কথা হলো, যদি কোনো নাগরিকের নাম কোনো মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বা এজাহারে কেবল রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাবশত কিংবা হয়রানিমূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে, তবে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে একটি অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন। আদালত সেই প্রতিবেদনের সারবত্তা বিবেচনা করে নির্দোষ ব্যক্তিকে মামলা থেকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি দিতে পারবেন। এই বিশেষ ধারার সদ্ব্যবহার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বা ডিএমপির বিভিন্ন থানায় দায়ের করা ৩৫৪টি মামলায় ৩ হাজার ৮৪৯ জন নিরীহ মানুষকে মামলা থেকে পুরোপুরি রেহাই দেওয়ার জন্য আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে।
একই আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সিলেট মহানগর পুলিশের আওতাধীন বিভিন্ন থানার ৩৯টি মামলায় ১৪৪ জন, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ১৯টি মামলায় ৫২ জন, গাজীপুরে ১২টি মামলায় ২১ জন, রাজশাহীতে ১০টি মামলায় ২৫ জন, বরিশালে ৩টি মামলায় ৬ জন, খুলনায় ১টি মামলায় ৫ জন এবং রংপুরে ২টি মামলায় ৬ জনকে অব্যাহতির জোর সুপারিশ করে আদালতে বিশেষ প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এর বাইরেও ঢাকা রেঞ্জের অধীনে থাকা ৯টি জেলার ২১১টি মামলায় ৪৮৫ জন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ৬টি জেলার ৩৪টি মামলায় Bound ৮৫ জন, খুলনা রেঞ্জের ৮টি জেলার ২৮টি মামলায় ৫৮ জন, রংপুর রেঞ্জের ৪ জেলার ৫টি মামলায় ৮ জন, রাজশাহী রেঞ্জের ৩ জেলার ১২ মামলায় Readiness জন, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ৪ জেলার ১৮টি মামলায় ৬০ জন, বরিশাল রেঞ্জের ২ জেলার ২ মামলায় ১৭ জন এবং সিলেট রেঞ্জের ৩ জেলার ২০টি মামলায় ১৪০ জন নিরপরাধ মানুষকে অব্যাহতি দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে পুলিশ।
পুলিশ সদরদপ্তরের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এএইচএম শাহাদাত হোসাইন এই সামগ্রিক বিষয়ে জানিয়েছেন যে, জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক মামলাগুলোর তদন্ত অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও ধারাবাহিক অগ্রগতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় তথ্য বিশ্লেষণ এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। একই সাথে ফৌজদারি কার্যবিধির নতুন ১৭৩ (এ) ধারার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে কোনোভাবেই কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি আইনি হয়রানির শিকার না হন এবং তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
এদিকে পিবিআইয়ের সংগৃহীত তথ্যে একটি চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তদন্ত করা মামলাগুলোতে দেখা গেছে যে, প্রায় ৬১ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো বাস্তব প্রমাণ মেলেনি। দেশের বিভিন্ন থানার মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলার মধ্যে ৭৭টির তদন্তভার দেওয়া হয়েছিল পিবিআইকে। এর পাশাপাশি আদালতের সরাসরি আদেশে আরও ১৯৫টি মামলার তদন্তভার তাদের কাঁধে আসে। সব মিলিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের মোট ২৭২টি স্পর্শকাতর মামলার তদন্ত শুরু করে এই বিশেষ সংস্থাটি। এর মধ্যে হত্যা মামলা ছিল ৮৪টি এবং অন্যান্য ধারার মামলা ১৮৮টি। গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে ১৬৫টি মামলার তদন্ত পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে, যার ৪২টি হত্যা মামলা এবং ১২৩টি অন্যান্য বিষয়ের। বর্তমানে আরও ১০৭টি মামলা তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
পিবিআইয়ের তদন্তে শেষ হওয়া ১৬৫টি মামলার মধ্যে ১১১টিতে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা বা প্রমাণ মিলেছে, যার শতকরা হার দাঁড়ায় ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এই প্রমাণিত মামলাগুলোর মধ্যে ১৯টি হত্যা এবং ৯২টি অন্য ধারার মামলা হিসেবে আদালতে চার্জশিটভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ৩১টি মামলার অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি মামলাকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পেছনে বাদীপক্ষের আদালতে অনুপস্থিতি, একই ঘটনা নিয়ে একাধিক মামলার জটিলতা বা সম্পূর্ণ অসত্য তথ্য দিয়ে মামলা করার মতো বিষয়গুলো জড়িত ছিল। এ ছাড়া ২৩টি মামলা বাদীর নিজস্ব অনীহা বা অন্য কোনো বিশেষ কারণে আদালত থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রমাণিত হওয়া ১১১টি মামলায় এজাহারভুক্ত মোট ৯ হাজার ৬৯১ জন আসামির মধ্যে প্রায় ৬১ দশমিক ১ শতাংশের বিরুদ্ধেই অপরাধের কোনো ন্যূনতম প্রমাণ মেলেনি। ফলে তাদের খালাস বা অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে এবং মাত্র ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ব্যক্তিগত শত্রুতা, পুরোনো সামাজিক বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে অনেক মানুষের নাম এসব মামলার এজাহারে জোরপূর্বক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যারা ঘটনার সময় দুর্ঘটনাস্থল থেকে শত মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন।
এই ধরনের হয়রানিমূলক মামলার আরেকটি বাস্তব উদাহরণ হলো মুদি দোকানদার মো. জামালের ঘটনা। তিনি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেওয়ার সময় তিনি আকস্মিকভাবে গুলিবিদ্ধ হন। পরবর্তী সময়ে এই হত্যাচেষ্টার ঘটনায় তিনি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের একপর্যায়ে জামাল গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর বাঁচানো সম্ভব হয়। জামাল তাঁর মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক সোতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ১৯৭ জনকে আসামি করেন। পিবিআই ঘটনাটির তদন্ত হাতে নিয়ে হামলার মূল সত্যতা খুঁজে পেলেও দেখতে পায় যে, অভিযুক্ত ১৯৭ জনের মধ্যে মাত্র ৩৮ জনের এই অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। বাকি ১৫৯ জনের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ কাল্পনিক ও অসত্য প্রমাণিত হওয়ায় তদন্ত সংস্থাটি কেবল প্রকৃত দোষী ওই ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। পিবিআইয়ের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, বর্তমানে তদন্তাধীন থাকা বাকি মামলাগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ কাজই সম্পন্ন হয়ে গেছে। বাকি থাকা ১০ শতাংশ কাজের মধ্যে বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতি বা মেডিকেল সার্টিফিকেটের মতো কিছু দাপ্তরিক কাগজপত্রের অপেক্ষায় সামান্য বিলম্ব হচ্ছে, যা খুব দ্রুতই সমাধান করে আদালতে পেশ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন