বর্তমান বিশ্ব এক চরম অস্থির, ঝুঁকিপূর্ণ ও বিভাজনমূলক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংঘাত, অর্থনৈতিক মন্দা আর জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকটের মাঝে নতুন করে জেঁকে বসেছে প্রাণঘাতী রোগব্যাধির আতঙ্ক। সম্প্রতি ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে নতুন করে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান টেড্রস আধানম গেব্রেয়েসুস সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। জেনেভায় আয়োজিত সংস্থার বার্ষিক নীতিনির্ধারণী সভার উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি বলেন, ইবোলা এবং বিরল হান্টা ভাইরাসের আক্রমণ আমাদের এই অশান্ত পৃথিবীর চলমান সংকটেরই নতুনতম সংস্করণ। কঙ্গোর ইবোলা পরিস্থিতিকে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের একটি প্রমোদতরীতে বিরল হান্টা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ডব্লিউএইচও প্রধান স্পষ্ট করে বলেন যে, আমরা এখন এক অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারস্পরিক সহযোগিতা কমে আসছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক ধাক্কায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে জনস্বাস্থ্য খাত। সপ্তাহব্যাপী চলতে থাকা এই বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে তিনি আগামী দিনগুলোতে এসব বৈশ্বিক ঝুঁকির বিষয়ে আরও বিস্তারিত রূপরেখা ও ব্যাখ্যা তুলে ধরবেন বলে জানান। এই সম্মেলনে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও তার বক্তব্য পেশ করেন। তিনি জানান, আক্রান্ত প্রমোদতরীটিকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি নোঙর করার অনুমতি দিয়ে আরোহীদের উদ্ধার করা ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মানবিক সিদ্ধান্ত। তার মতে, অন্যকে সুরক্ষিত রাখার মাধ্যমেই মূলত নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব, কারণ কোনো রাষ্ট্রই এককভাবে নিজেকে পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে পারে না। তার এই দূরদর্শী ও মানবিক বক্তব্য উপস্থিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে বিপুল করতালি ও প্রশংসা কুড়ায়।
তবে এবারের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আর্থিক অনুদান প্রত্যাহারের ঘোষণা এবং বড় ধরনের তহবিল সংকুচিত হওয়ার কারণে সংস্থাটি এখন অনেকটাই দুর্বল ও কোণঠাসা। সুইজারল্যান্ডের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এলিসাবেথ বাউমে-শ্নাইডার এই সংকটের চিত্র তুলে ধরে জানান যে, সংস্থার বাজেট প্রায় ২১ শতাংশ বা ১ বিলিয়ন ডলারের মতো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে শত শত কর্মীকে চাকরিচ্যুত করতে হয়েছে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য কর্মসূচি বন্ধ বা সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে সংস্থাটি। অবশ্য এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও ডব্লিউএইচও কিছু বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার করতে পেরেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল হেলথ সেন্টারের সহ-পরিচালক সুয়েরি মুন এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, হান্টা ভাইরাসের মতো আকস্মিক সংকটগুলোই বারবার প্রমাণ করে যে পৃথিবীর সুরক্ষার জন্য একটি কার্যকর, নিরপেক্ষ এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নে পুষ্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কতটা অপরিহার্য।
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও এই সম্মেলনকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। সম্মেলনের প্রথম দিনেই তাইওয়ানকে পর্যবেক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার একটি বিতর্কিত প্রস্তাব দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করায় এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে, যদিও তাইওয়ান ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই মর্যাদা ভোগ করেছিল। তাইওয়ান ইস্যু ছাড়াও ইউক্রেন যুদ্ধ, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মানবিক বিপর্যয় এবং ইরান পরিস্থিতি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ ও বিতর্কের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। একই সাথে ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যকার তীব্র মতবিরোধের কারণে ২০২৫ সালের বহুল প্রতীক্ষিত বৈশ্বিক মহামারি চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদনও আটকে রয়েছে। সব মিলিয়ে চরম অর্থসংকট, রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব আর রাজনৈতিক বিভাজনের এক অন্ধকার সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বমানবতার স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপায় খুঁজছেন বিশ্বনেতারা।
সূত্র: এএফপি।

বুধবার, ২০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬
বর্তমান বিশ্ব এক চরম অস্থির, ঝুঁকিপূর্ণ ও বিভাজনমূলক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংঘাত, অর্থনৈতিক মন্দা আর জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকটের মাঝে নতুন করে জেঁকে বসেছে প্রাণঘাতী রোগব্যাধির আতঙ্ক। সম্প্রতি ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে নতুন করে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান টেড্রস আধানম গেব্রেয়েসুস সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। জেনেভায় আয়োজিত সংস্থার বার্ষিক নীতিনির্ধারণী সভার উদ্বোধনী অধিবেশনে তিনি বলেন, ইবোলা এবং বিরল হান্টা ভাইরাসের আক্রমণ আমাদের এই অশান্ত পৃথিবীর চলমান সংকটেরই নতুনতম সংস্করণ। কঙ্গোর ইবোলা পরিস্থিতিকে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের একটি প্রমোদতরীতে বিরল হান্টা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ডব্লিউএইচও প্রধান স্পষ্ট করে বলেন যে, আমরা এখন এক অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারস্পরিক সহযোগিতা কমে আসছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক ধাক্কায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে জনস্বাস্থ্য খাত। সপ্তাহব্যাপী চলতে থাকা এই বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে তিনি আগামী দিনগুলোতে এসব বৈশ্বিক ঝুঁকির বিষয়ে আরও বিস্তারিত রূপরেখা ও ব্যাখ্যা তুলে ধরবেন বলে জানান। এই সম্মেলনে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও তার বক্তব্য পেশ করেন। তিনি জানান, আক্রান্ত প্রমোদতরীটিকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি নোঙর করার অনুমতি দিয়ে আরোহীদের উদ্ধার করা ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মানবিক সিদ্ধান্ত। তার মতে, অন্যকে সুরক্ষিত রাখার মাধ্যমেই মূলত নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব, কারণ কোনো রাষ্ট্রই এককভাবে নিজেকে পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে পারে না। তার এই দূরদর্শী ও মানবিক বক্তব্য উপস্থিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে বিপুল করতালি ও প্রশংসা কুড়ায়।
তবে এবারের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আর্থিক অনুদান প্রত্যাহারের ঘোষণা এবং বড় ধরনের তহবিল সংকুচিত হওয়ার কারণে সংস্থাটি এখন অনেকটাই দুর্বল ও কোণঠাসা। সুইজারল্যান্ডের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এলিসাবেথ বাউমে-শ্নাইডার এই সংকটের চিত্র তুলে ধরে জানান যে, সংস্থার বাজেট প্রায় ২১ শতাংশ বা ১ বিলিয়ন ডলারের মতো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে শত শত কর্মীকে চাকরিচ্যুত করতে হয়েছে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য কর্মসূচি বন্ধ বা সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে সংস্থাটি। অবশ্য এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও ডব্লিউএইচও কিছু বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার করতে পেরেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল হেলথ সেন্টারের সহ-পরিচালক সুয়েরি মুন এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, হান্টা ভাইরাসের মতো আকস্মিক সংকটগুলোই বারবার প্রমাণ করে যে পৃথিবীর সুরক্ষার জন্য একটি কার্যকর, নিরপেক্ষ এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নে পুষ্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কতটা অপরিহার্য।
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও এই সম্মেলনকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। সম্মেলনের প্রথম দিনেই তাইওয়ানকে পর্যবেক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার একটি বিতর্কিত প্রস্তাব দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করায় এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে, যদিও তাইওয়ান ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই মর্যাদা ভোগ করেছিল। তাইওয়ান ইস্যু ছাড়াও ইউক্রেন যুদ্ধ, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মানবিক বিপর্যয় এবং ইরান পরিস্থিতি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ ও বিতর্কের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। একই সাথে ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যকার তীব্র মতবিরোধের কারণে ২০২৫ সালের বহুল প্রতীক্ষিত বৈশ্বিক মহামারি চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদনও আটকে রয়েছে। সব মিলিয়ে চরম অর্থসংকট, রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব আর রাজনৈতিক বিভাজনের এক অন্ধকার সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বমানবতার স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপায় খুঁজছেন বিশ্বনেতারা।
সূত্র: এএফপি।

আপনার মতামত লিখুন