দিকপাল

কঙ্গোতে ইবোলা মহামারিতে প্রাণহানি, বিশ্বজুড়ে জরুরি সতর্কতা জারি ডব্লিউএইচও’র


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ | ১২:২০ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

কঙ্গোতে ইবোলা মহামারিতে প্রাণহানি, বিশ্বজুড়ে জরুরি সতর্কতা জারি ডব্লিউএইচও’র

মধ্য আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) আবারও হানা দিয়েছে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস। অত্যন্ত সংক্রামক ও রক্তক্ষরণজনিত এই জ্বরের নতুন প্রাদুর্ভাবে ইতিমধ্যেই ৮০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। দিন দিন পরিস্থিতি যেভাবে অবনতির দিকে যাচ্ছে, তাতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধির আওতায় বিষয়টিকে 'আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা' হিসেবে ঘোষণা করেছে সংস্থাটি, যা তাদের সতর্কতার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে বিবেচিত হয়। আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা এবং এই ভাইরাসের ভৌগোলিক বিস্তার ঠিক কতদূর পর্যন্ত ছড়িয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০২৪ সালে প্রবর্তিত সর্বোচ্চ সতর্কতা তথা 'মহামারি অবস্থা' এখনও জারি করা হয়নি।

আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোতে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ জনে। এর পাশাপাশি আরও অন্তত ৩৩৬ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এবারের প্রাদুর্ভাবটি ইবোলার 'বুন্ডিবুগিও' ধরনের কারণে ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছে জেনেভাভিত্তিক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এই ধরনটি নিয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি, কারণ জাইর ধরনের ইবোলার জন্য প্রতিষেধক টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকলেও বুন্ডিবুগিও ধরনের জন্য এখনও কোনো কার্যকর টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই নির্দিষ্ট ধরনের ইবোলায় আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ২০০৭ সালে প্রথম শনাক্ত হওয়া এই ধরনটি এবার কেবল কঙ্গোতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও হানা দিয়েছে। উগান্ডায় ইতিমধ্যেই এক কঙ্গোলিজ নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন কর্মকর্তারা।

কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে এই ভাইরাসের সর্বশেষ প্রাদুর্ভাবটি শনাক্ত করা হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় ভাইরাসের আঞ্চলিক বিস্তারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে ওই অঞ্চলে একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছেন। আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে রাখার বা চিকিৎসার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় রোগীরা নিজ বাড়িতেই মারা যাচ্ছেন। ফলে অসচেতনতার কারণে পরিবারের সদস্যরা মৃতদেহ স্পর্শ করছেন এবং অত্যন্ত সহজেই এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে পড়ছেন। জানা গেছে, এবারের প্রাদুর্ভাবে প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন একজন সেবিকা। গত এপ্রিল মাসের শেষের দিকে ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইবোলার উপসর্গ নিয়ে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন। সাধারণত ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তীব্র জ্বর, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ এবং বমির মতো মারাত্মক উপসর্গ দেখা দেয়। সংক্রামিত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থ বা রক্তের সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস দ্রুত সুস্থ মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর সুপ্তিকাল সর্বোচ্চ ২১ দিন পর্যন্ত হতে পারে।

এদিকে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস এই দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়াকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে বড় পরিসরে জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কঙ্গোর বিশাল আয়তন এবং অত্যন্ত দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কর্মী পাঠানো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির ইতিহাসে এটি ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব। এর আগে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের প্রাদুর্ভাবে দেশটিতে প্রায় ২৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। মূলত বাদুড় থেকে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসটি মানুষের অঙ্গ বিকল করে দেয় এবং গত অর্ধশতকের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে এর মৃত্যুহার ২৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

রোববার, ১৭ মে ২০২৬


কঙ্গোতে ইবোলা মহামারিতে প্রাণহানি, বিশ্বজুড়ে জরুরি সতর্কতা জারি ডব্লিউএইচও’র

প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬

featured Image

মধ্য আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) আবারও হানা দিয়েছে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস। অত্যন্ত সংক্রামক ও রক্তক্ষরণজনিত এই জ্বরের নতুন প্রাদুর্ভাবে ইতিমধ্যেই ৮০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। দিন দিন পরিস্থিতি যেভাবে অবনতির দিকে যাচ্ছে, তাতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধির আওতায় বিষয়টিকে 'আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা' হিসেবে ঘোষণা করেছে সংস্থাটি, যা তাদের সতর্কতার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে বিবেচিত হয়। আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা এবং এই ভাইরাসের ভৌগোলিক বিস্তার ঠিক কতদূর পর্যন্ত ছড়িয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০২৪ সালে প্রবর্তিত সর্বোচ্চ সতর্কতা তথা 'মহামারি অবস্থা' এখনও জারি করা হয়নি।

আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোতে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ জনে। এর পাশাপাশি আরও অন্তত ৩৩৬ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এবারের প্রাদুর্ভাবটি ইবোলার 'বুন্ডিবুগিও' ধরনের কারণে ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছে জেনেভাভিত্তিক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এই ধরনটি নিয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি, কারণ জাইর ধরনের ইবোলার জন্য প্রতিষেধক টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকলেও বুন্ডিবুগিও ধরনের জন্য এখনও কোনো কার্যকর টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই নির্দিষ্ট ধরনের ইবোলায় আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ২০০৭ সালে প্রথম শনাক্ত হওয়া এই ধরনটি এবার কেবল কঙ্গোতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও হানা দিয়েছে। উগান্ডায় ইতিমধ্যেই এক কঙ্গোলিজ নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন কর্মকর্তারা।

কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে এই ভাইরাসের সর্বশেষ প্রাদুর্ভাবটি শনাক্ত করা হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় ভাইরাসের আঞ্চলিক বিস্তারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে ওই অঞ্চলে একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছেন। আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে রাখার বা চিকিৎসার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় রোগীরা নিজ বাড়িতেই মারা যাচ্ছেন। ফলে অসচেতনতার কারণে পরিবারের সদস্যরা মৃতদেহ স্পর্শ করছেন এবং অত্যন্ত সহজেই এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে পড়ছেন। জানা গেছে, এবারের প্রাদুর্ভাবে প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন একজন সেবিকা। গত এপ্রিল মাসের শেষের দিকে ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইবোলার উপসর্গ নিয়ে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন। সাধারণত ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তীব্র জ্বর, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ এবং বমির মতো মারাত্মক উপসর্গ দেখা দেয়। সংক্রামিত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থ বা রক্তের সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস দ্রুত সুস্থ মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর সুপ্তিকাল সর্বোচ্চ ২১ দিন পর্যন্ত হতে পারে।

এদিকে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস এই দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়াকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে বড় পরিসরে জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কঙ্গোর বিশাল আয়তন এবং অত্যন্ত দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কর্মী পাঠানো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির ইতিহাসে এটি ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব। এর আগে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের প্রাদুর্ভাবে দেশটিতে প্রায় ২৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। মূলত বাদুড় থেকে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসটি মানুষের অঙ্গ বিকল করে দেয় এবং গত অর্ধশতকের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে এর মৃত্যুহার ২৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল